রাজস্থানী মহিলাদের বিকল্প সংস্থান

0

রাজস্থান বীরগাঁথার দেশ। নারী আর পুরুষের বিভাজিকা রেখাটা এখানে স্পষ্ট। এতটাই স্পষ্ট যে তা পুরুষতান্ত্রিক এবং লিঙ্গ সচেতন অঞ্চল হিসেবে পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে বারবার। শোনা যায় এই তল্লাটে প্রথমে কন্যা সন্তান জন্মালে পুত্রার্থে তাকে কুঁয়োয় ফেলে দেওয়ার রীতি ছিল। আঁতকে উঠলেন নাকি? এখনও মেয়েদের অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। আর সেই নির্যাতিতা মহিলাদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে এসেছে বিকল্প সংস্থান।

বিকল্প মানে কোনো কিছুর বদলে অন্য কিছু একটা। সংস্থান মানে জোগাড়। 'বিকল্প সংস্থান' আসলে কয়েকজন রাজস্থানী তরুণদের নিয়ে গড়া একটি সমাজসেবী সংস্থা। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত। এঁরা লড়াই করছেন সমাজের লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে। মেয়েদের সমতার লড়াইয়ে তাই আগে তাঁরা শিশুকন্যাদের শিক্ষিত করার ব্রত নিয়েছেন। বাল্যবিবাহ রুখতে চাইছেন। মেয়েদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধের দাবিতে লড়াই করছেন। অসাম্য, অমর্যাদা ও কুসংস্কার দূর করে মেয়েদের বেঁচে থাকার এক বিকল্প পথের সন্ধান দিতে চেষ্টা করছেন ওঁরা।

বিকল্প সংস্থান সমাজের নানান স্তরে কাজ করছে। মহিলাদের অধিকার সংক্রান্ত জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তাঁরা জায়গায় জায়গায় ক্যাম্পেন ও মিটিং করছেন। বিকল্প সংস্থানের প্রোগ্রাম ম্যানেজার যোগেশ বৈষ্ণব আমাদের জানান, তাঁরা গ্রামে গিয়ে দল গঠন করে কথা বলছেন। আগে মানুষের কথা শোনেন। এরপর সেইসব ব্যক্তিদের বেছে নেন যাঁরা মহিলাদের অধিকার বিষয়ে আগ্রহী। তখন এঁদের শিক্ষা দেওয়া হয় যাতে এঁরা নিজের কমিউনিটির ভিতর বদল আনতে পারেন। যোগেশ জানালেন তাঁরা একদম গ্রাসরুট লেবেলে কাজ করছেন। যাঁদের তাঁরা শিক্ষিত করছেন, তাঁরাই আরও যুবকদের দলে টেনে আনছেন।

রাজস্থান ধারাবাহিক ভাবেই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বিশ্বাসী। অমূলক প্রথা ও সংস্কার আজও অন্ধের মতো আঁকড়ে আছে। তাই মহিলাদের প্রতি অসাম্য করা হয়। রাজস্থানে বাল্যবিবাহ, বিধবাদের ওপর অত্যাচার, বধূ নির্যাতন, পণপ্রথা এমন অনেক সামাজিক কুপ্রথার খবর পাওয়া যায়। বিকল্প সংস্থান এমন এক সমাজ তৈরি করতে আগ্রহী যেখানে নারী পুরুষের সমানাধিকার থাকবে। একটা খুব কার্যকরী উপায় বের করা হয়েছে। যোগেশ বললেন বাড়ির তরুণ ছেলেদের তাঁরা নিজেদের প্রোগ্রাম ও ক্যাম্পেনে যুক্ত করছেন। যুবকরা তুলনায় বেশি সমাজ সচেতন। একটি একটি করে পরিবারে পরিবর্তন এলে বৃহত্তর অর্থে সামাজিক পরিবর্তন আসতে বাধ্য। এই সংস্থা বিভিন্ন এলাকায় Our Daughters’ Rights, Send Our Daughters To School, Smiling Daughters, We Can End All Violence Against Women এর মতো দুর্দান্ত সব ক্যাম্পেন করেছে।

সমাজে মেয়েদের ওপর অত্যাচারের অনেক প্রকারভেদ আছে। বর্তমানে বধূ নির্যাতন, পণের দাবীতে খুন এবং ধর্ষণ বীভৎস রূপ নিয়েছে। যোগেশরা মেয়েদের ওপর সব রকমের অত্যাচার বন্ধ করাবার জন্য লড়াই করছেন। তাঁদের সেন্টারে অত্যাচারিত মেয়েদের কাউন্সেলিং হয়। মেয়েরা নিরাপত্তা পান। প্রয়োজনে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। বিকল্প সংস্থান নারীদের নিজেদের অধিকার বিষয়ে সচেতন করে তোলে। দৃঢ়চিত্তে অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শেখায়। যোগেশ হেসে বলেন," আমরা মেয়েদের নিজেকে ভালোবাসতে ও সম্মান করতে শেখাই।" এক ডাকেই তাঁদের পাশে পাবেন, এমন আশ্বাস দেয় বিকল্প সংস্থান।

খরচ বাঁচাতে বাড়ির মেয়েদের স্কুলে পাঠানো হয়না। গৃহকর্তা মনে করেন মেয়েটি ঘরে থাকবে,পরিজনের যত্ন করবে। যোগেশরা পরিবারের সদস্যদের বোঝাচ্ছেন একজন শিক্ষিত মেয়ে পরিবারের সম্পদ। শুধু আর্থিক নিরাপত্তাই নয়, সেই মেয়েটি পরিবারে সুস্বাস্থ্য ও সচেতনতা নিয়ে আসেন। যোগেশ জানিয়েছেন তাঁদের Our Daughters’ Rights, Send Our Daughters To School এবং Smiling Daughters ক্যাম্পেন ভীষণ সফল। স্থানীয় স্কুল,কমিউনিটি ও পরিবারদের এই কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যাঁদের শিক্ষা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে বিকল্প সংস্থান তাঁদের জন্য বিশেষ enrolment program করছে, এতে তাঁরা লেখাপড়া সম্পূর্ণ করতে পারবেন। ৫,২০০ রাজস্থানী নারীর বিজয়গাঁথার কৃতিত্বের পালক এখন বিকল্প সংস্থানের মুকুটে।

বাল্যবিবাহ এক অভিশাপ

ছেলেমেয়ে উভয়ের জীবনেই বিশেষত মেয়েদের জন্য বাল্যবিবাহ এক অভিশাপ। বাল্যবিবাহ একজন নারীর সঠিক ভাবে বড় হয়ে ওঠার সব পথ বন্ধ করে দেয়। শিক্ষা অসমাপ্ত থাকে। মানসিক বিকাশ বাধা পায়। জোর করে দ্রুত মা হওয়া একজন নারীর স্বাস্থ্যহানীও করে। আর্থিক পরাধীনতা ও গৃহ অশান্তি বৃদ্ধি পায়। ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েটির বিচার ক্ষমতাও অক্ষম হয়ে যায়। কারণ জীবনটাকে ভালো করে চিনে ওঠার আগেই নাবালক মেয়েকে জুরে দেওয়া হয় সাংসারিক জোয়ালে। সামাজিক নিরীক্ষণ বলছে নারীশিক্ষার বিস্তার বাল্যবিবাহের মতো কুপ্রথাকে মুছে ফেলতে কার্যকরী পন্থা। বিকল্প সংস্থানের উদ্দেশ্য বেশি সংখ্যক মানুষের ভিতর নারীর শিক্ষার প্রয়োজন বোধ জাগিয়ে তোলা। মেয়েরা নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছেন এবং অন্তত মাধ্যমিক স্তর অবধি পড়াশোনা করছেন,যোগেশরা নিজেদের প্রতিটি মিটিং ও প্রচারে এটা নিশ্চিত করেন। তাঁরা এখনো অবধি ৮৭৫টি শিশুকন্যাকে বাল্যবিবাহের হাতে বলি হওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন।

প্রয়োজন দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন

বিকল্প সংস্থান একটা স্থায়ী সামাজিক পরিবর্তন আনতে আগ্রহী। সেই চেষ্টা সার্থক করার জন্য তাঁরা যোগাযোগ করছেন সমাজের নানান স্তরের মানুষের সঙ্গে। বাড়ির তরুণ ও প্রবীণ, ধর্মগুরু,মন্দিরের পুরোহিত এমনকি পুলিশ,সরকারী কর্মচারী সবার সঙ্গে কথা বলছেন। মানুষের টনক নড়াতে তাঁরা সবরকমে প্রস্তুত। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে নাটক করছেন,পোস্টার লাগাচ্ছেন, ক্যাম্পেন ও ওয়ার্কশপ করছেন। আলোচনা সভা বসাচ্ছেন। যোগেশ বললেন তাঁরা মনপ্রাণ ঢেলেছেন এই আন্দোলনে। আসুন বিকল্প সংস্থানের পাশে, অবহেলিত মেয়েদের পাশে আমরাও দাঁড়াই। কাল নতুন সূর্য উঠবে। পরিবর্তন আসতে বাধ্য হবে।