২,৫০০ মহিলার জীবনে একা সবিতাই টার্নিংপয়েন্ট

0

সবিতা দাস। সাদামাঠা গ্রাম্য বধূ। শ্বশুরবাড়ির চৌকাঠে যেদিন পা রাখলেন সেদিন থেকেই বুঝে গিয়েছিলেন দায়িত্ব নিতে হবে।পাঁচ ভাইয়ের বড় সংসার। বাড়ির বড় বউ। দায়িত্বও তাই বেশি। সংসার আগলে রাখার দায়িত্ব। অভাবের সংসারের হাল ধরার দায়িত্ব। সকলের মুখে অন্য, জল তুলে দেওয়ার, ঠোঁটে হাসি ফোটানোর বিচিত্র সব দায়িত্ব নিতে নিতে কখন যেন গোটা তল্লাটের আড়াই হাজার মহিলাকে স্বনির্ভর করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন শান্ত এই পল্লীবধূ। 

স্রোতের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই। অভাবের বিরুদ্ধে, সাংসারিক অসহযোগিতার বিরুদ্ধে, সামাজিক টিটকিরির বিরুদ্ধে কঠিন একটা লড়াই  লড়ে ফেলেছেন শান্তিপুরের সবিতা। এখন আড়াই হাজার মহিলা মানে আড়াই হাজার পরিবার তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে। বিয়ের পর থেকেই বুঝতে পারেন দারিদ্রের একটা ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে যাচ্ছেন। আশপাশের প্রতিবেশিরাও খুবই গরিব। কিন্তু অসাধারণ হাতের কাজ। গ্রামের মেয়েদের হাতের কাজ এতটাই ভাল যে  তাঁর মনে হয়েছিল তাদের ঠিকমতো প্রশিক্ষণ দিলে তাঁতের শাড়ির বাইরে আরও একটা পরিচয় তৈরি হতে পারে। মনে হয়েছিল এলাকার দারিদ্রকে একাই দশ গোল দিতে পারেন সবিতা। গ্রামের মেয়েদের একথা বুঝিয়ে ২০০২ সালে স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করেন। শান্তিপুরের ফুলিয়াপাড়ার বাসিন্দা সবিতা দাস। 

শ্রীমা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ব্যানারে ১০জন মহিলাকে নিয়ে শুরু হয় নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রথম লড়াই। সাড়ে তিন লাখ টাকা ধার নিয়ে শুরু হয় বাটিকের শাড়ি, চুড়িদার তৈরির কাজ। এর জন্য বিরাটি থেকে প্রশিক্ষণ নেন শ্রীমার সদস্যারা। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে শাড়ি তৈরি হওয়ায় ছোট থেকেই একটা সহজাত জ্ঞান ছিল গোষ্ঠীর মেয়েদের। এর সঙ্গে প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর সবিতা দাসের মেয়েদের হাত থেকে বের হতে থাকে নিত্য নতুন নকশার খাদির কাপড়। কাপড়ের নকশার সৃজনশীল ছোঁয়া, দ্রুত ক্রেতাদের মন কেড়ে নেয়। ক্লিক করে যায় ব্যবসা। ব্যাকফুটে চলে যেতে থাকে দারিদ্র।

তাঁতের দেশ শান্তিপুরে খাদি নিয়ে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা দারুণ হিট হয়ে যায়। বছর তিনেকের মধ্যে ধার মিটিয়ে নিজেদের তাঁত, চরকা, ড্রাম বানিয়ে ফেলেন জোৎস্না, অজন্তারা। এখন তাঁদের খাদির শাড়ি, চুড়িদারের জন্য অপেক্ষা করে থাকে দিল্লি, ভুবনেশ্বর। প্রায় আড়াই হাজার মহিলাকে নিয়ে সবিতা দাসের এই ‘টিম’ নদিয়া জেলায় খাদি শাড়ির অন্যতম যোগানদার।

বলছিলেন, "১০ জন মহিলাকে নিয়ে শুরু করার পর কাজের নেশা আরও চেপে যায়।" সাধারণ এক বধূর এই উদ্যম দেখে স্থানীয় বেলগড়িয়া পঞ্চায়েত সবিতাকে আরও দায়িত্ব দেয়। সব দায়িত্ব সফলভাবে সামলানোর সুবাদে ওই পঞ্চায়েতের আওতায় থাকা ১৫০টি স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও স্বর্ণজয়ন্তী স্বরোজগার যোজনার ৮৩টি গোষ্ঠী এখন দেখেন সবিতা দাস। প্রায় আড়াই হাজার মহিলার বিশাল টিম সামলাচ্ছেন। বাড়িতে গোষ্ঠীর মেয়েদের সুতো দিতে দিতে সবিতা বলেন, "ওদের সঙ্গে থাকলে আমার মন ভাল থাকে। কীভাবে সময় কেটে যায়।" মেয়েদের তৈরি খাদির কাজ বিক্রির জন্য রাজ্যের নানা প্রান্ত ছাড়াও রাজ্যের বাইরেও যেতে হয় সবিতাকে। কলকাতার কয়েকটা জায়গায় ধরা খদ্দের আছে। পাশাপাশি বিভিন্ন মেলা, প্রদর্শনীতে যাওয়ার সুবাদে যে যোগাযোগ তৈরি হয় সেখান থেকে আরও ব্যবসার জায়গা পেয়ে যান সবিতারা। এই সুনামের জন্য কাজের সঙ্গে কোনওরকম সমঝোতা করেননি তিনি। 

কেউ ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়নি, এমনও হয়েছে। অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অনেক সময়ই হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। বাড়ির বউ কেন এত বাইরের মেয়েদের সঙ্গে মিশবে। শুরুর দিকে এমন প্রশ্নের মুখেও জর্জরিত হতে হয়েছে সবিতাকে। কিন্তু এতটুকু দমেননি। কাজ দিয়েই গোটা দুনিয়াকে বুঝিয়ে দিয়েছেন পরিশ্রম আর নিষ্ঠার কোনও বিকল্প হয়না। একটা সাধারণ তাঁত শাড়ি বুনে যেখানে ৬০টাকা দৈনিক পাওয়া যেত, সেখানে খাদির শাড়ি তৈরি করে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা দৈনিক রোজগার করেন জোৎস্না দাসরা। বিধবা অজন্তা দাস সুতো গুটিয়ে ৫০ টাকার বেশি রোজগার করতে পারতেন না। এখন কম করে ১০০ টাকা দৈনিক আয় হয়। 

সবিতার কথায়, "মেয়েদের মোটা ভাত, কাপড়ের ব্যবস্থা হয়েছে। ওদের সন্তানরাও এখন পড়াশোনা করতে পারছে। এগুলোই তৃপ্তি দেয়। তখন লড়াই, হোঁচট, আক্রমণ কোনও কিছুই গায়ে লাগে না। আরও এগনোর সাহস পাই।" খাদির শাড়ি, চুড়িদারের আরও কী কী নতুন দিক ধরা যায় তার চেষ্টাতেই আজকাল বেশি মনোনিবেশ করেছেন সবিতারা। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সংসারের জোয়াল টানতে শিখে গেছে সবিতার প্রমিলা বাহিনি। আর তাই সমালোচকরাও আর ট্যাঁ ফুঁ করে না। বরং কেউ কেউ তো তাঁদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।