আশুতোষ উবাচ - "অর্থনীতির রাশ ধরতে আরও বাস্তববাদী হোন মি.মোদি"

0

অ্যানাটোলে কালেতস্কি, বিশ্বের অন্যতম অর্থনীতিবিদ। ২০১০ এ ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, নতুন এক অর্থনীতি আসছে যেটায় বাজারের গোঁড়ামি থাকবে না, আবার সরকারের দখলে থাকবে সবকিছু এমনও নয়। ২০০৮ সাল, সারা বিশ্বে তখন মন্দার ঢেউ আছড়ে পড়েছে। সেই সময়ও তিনি ভভিষ্যৎবাণী করেছিলেন, অর্থনীতির তিন অবস্থা ইতিমধ্যে আমরা দেখে ফেলেছি, চতুর্থ ধারা সবে শুরু হয়েছে। কালেতস্কি লিখছেন, ‘উনিশ শতকের গোড়া থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত ছিল খোলা বাজার অর্থনীতির যুগ। সেই সময় সরকারকে বাজারে নাক গলানোর সুযোগ দেওয়া হত না। তারপর মন্দা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে বামপন্থী অভিজ্ঞতা পশ্চিমী দুনিয়ার মানসিকতাই বদলে দেয়। বাজারকে নিজের ইচ্ছেমতো চলতে দেওয়া যায় না-এমন এক নতুন ধারণা তৈরি হতে থাকে। স্টেটকে আরও দায়িত্ব নিতে হবে, ওয়েলফেয়ার স্টেট হতে হবে’।

সেটাই ছিল নতুন তত্ব, নিউ ডিল থিওরি, অর্থনৈতিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়ার রুজভেল্ট অ্যাপ্রোচ। হঠাৎ বিশ্ব অর্থনীতির ‘সবজান্তা দাদা’ হয়ে উঠল স্টেট। কিন্তু সত্তরের তেল সঙ্কট চিন্তাবিদ এবং পলিসি মেকারদের বাজার বুঝে নতুন করে ভাবতে বসতে বাধ্য করল। রোনাল্ড রেগ্যান, মার্গারেট থ্যাচাররা হয়ে উঠলেন নতুন অর্থনীতির মসিহা। একসময় বাজারে গুরুত্ব হারাল স্টেট। আপন খেয়ালে বাজার চলার সেই পুরনো পন্থা আবার ফিরে এল। অর্থনীতির দ্বিতীয় পর্বের মতো স্টেটের সেই ক্ষমতার বদলে, বাজারকে আবার খোলা অর্থনীতির হাতেই ছাড়া হল। যুক্তি ছিল, অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য স্টেট আর চার্চের ছাড়াছাড়ির মতো অর্থনীতি ও স্টেটের ছাড়াছাড়িও জরুরি। কিন্তু ২০০৮ এর মন্দা নতুন এই যুক্তিরও ফাঁক খুঁজে পেল। এবং অর্থনীতির নতুন দিক খুঁজে বের করার চেষ্টায় নেমে পড়লেন চিন্তাবিদরা।

নতুন ধারণাও কোনও পথ দেখাতে না পারায় বর্তমানের এই সঙ্কট আরও জটিল এবং ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখন বিশ্বের ইতিহাসে এই প্রথম ভারত বিশ্ব অর্থনীতিতে অন্যতম অংশীদার এবং অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন অনেকটা আমাদের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু কেন্দ্রের সরকারের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না, আর সেটাই সবচাইতে ভয়ের। নরেন্দ্র মোদি দারুণ সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সেই সময় মনে হচ্ছিল অর্থনীতিতে নতুন জোয়ার আনবে মোদি সরকার। দুর্ভাগ্য,তার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।

সেনসেক্সের গ্রাফই বুঝিয়ে দিচ্ছে অর্থনীতির ব্যারোমিটার দ্রুত নিন্মগামী। মোদি যখন শপথ নেন তখন সেনসেক্স ছিল ২৭,০০০ এর আশেপাশে। এখন পড়তে পড়তে ২৪,০০০ এ আটকে আছে। নট নড়ং চড়ং। অর্থমন্ত্রীর জন্য যা চিন্তার বিষয়। ডলারের দাম ৭০ ছুঁতে চলেছে। প্রতিদিনই দেশের অর্থনীতি দূর্বল হচ্ছে। হিন্দুর রিপোর্ট, ‘শিল্প উৎপাদন গতবছর অক্টোবরে ৯.৮ শতাংশে পৌঁছানোর পর নভেম্বরে ৩.২ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১১ র পর এত খারাপ অবস্থা এই প্রথম’। ইকনোমিক টাইমসের রিপোর্ট, যদিও এই বছর ভারতের বৃদ্ধি ৭ থেকে ৭.৫ শতাংশ হবে বলে আশা করা হচ্ছে, তবুও কর্পোরেটে সেক্টরে ঋণের বোঝা, ব্যাঙ্কিং সেক্টরে মন্দা, দুই মরশুমের খারাপ ফলনের জন্য গরিব গ্রামীণ এলাকায় খারাপ প্রভাব পড়বে।

ভারতের পক্ষে সুখবর, বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাটকীয়ভাবে পড়ছে। মোদি যখন ক্ষমতায় এলেন তখন দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ১৩৩ ডলার। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ব্যারেল প্রতি ৩০ ডলার। এটাই মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে লড়তে সাহায্য করবে এবং বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ের পরিমান ধরে রাখবে। কিন্তু বাজারে নতুন সঙ্কট তৈরি করেছে গত ২৫ বছরে চিনের সবচেয়ে খারাপ অর্থনীতি। এখন সেটা ভয়ের আকার নিচ্ছে। চিনের সঙ্কট বাজারে এতটাই প্রভাব ফেলেছে, যে কারণে এই বছর জানুয়ারি ছিল সবচেয়ে খারাপ। ব্যাঙ্ক অবআমেরিকা মেরিল লিঞ্চের হিসেবে, ‘জানুয়ারির প্রথম তিন সপ্তাহেই গ্লোবাল স্টক থেকে ৭.৮ ট্রিলিয়ন ডলার মুছে গিয়েছে’। মার্কিন অর্থনীতিবিদরা ইতিমধ্যে প্রমাদ গুণতে শুরু করেছেন, ‘আগামী বছরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি মন্দাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২০ থেকে ১৫ শতাংশ’, যা বিশ্ববাজারের জন্য অশনী সংকেত।

১৯৮৫ পর সবচেয়ে বেসি সমর্থন নিয়ে সরকারের গড়েও মোদি সরকার এই সঙ্কট মোকাবিলায় খুব একটা আত্মবিশ্বাসী বলে মনে হচ্ছ না। প্রথম মাসগুলিতে কোনও সংস্কারের চেষ্টাই করছে না। সংসদের নিম্নকক্ষে সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে আইনি বৈতরণী পার হয়ে যাবে এমন ধারণা নিয়েই ভুল করে বসেছে। এতটা একরোখা না হলে জিএসটির মতো সংস্কার এতদিনে দিনের আলো দেখে ফেলত। এখন সংসদের অচলাবস্থায় ফেঁসে রয়েছে জিএসটি। দিল্লি এবং বিহারে বিজেপির হার প্রধানমন্ত্রীর মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। রক্তের স্বাদ পেয়ে গিয়েছে বিরোধীরা। মোদি সরকারকে তারা আর স্বস্তিতে থাকতে দিতে চায় না।

বাজার নিজে নিজে ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে কেন্দ্রকে নাক গলাতে হবে। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে যাতে অর্থনীতির ক্যাপ্টেন আত্মবিশ্বাসী হতে পারে এবং কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তার জন্য আইনের ধারক বাহকদের সমর্থন প্রয়োজন। এটাই বুঝতে পারছে না সরকার। নতুন ধারার অর্থনীতির জন্য কেন্দ্র এবং বাজারের ঘনিষ্ঠতা জরুরি। দুই বিপরীত পথে চলার সেই দিন চলে গিয়েছে। ভারতকে বুঝতে হবে সঠিক গণতন্ত্র এখানে নেই এবং পশ্চিমী অর্থনীতির মতো নয় আমাদের অর্থনীতি। সবসময় ওঠাপড়া করছে। ফলে আমাদের সামনের রাস্তা বেশ কঠিন। অর্থনীতির উন্নতির জন্য কেন্দ্রকে আরও বিনয়ী হতে হবে। এখানেই হেরে যাচ্ছে সরকার।

ভারতীয় পলিসি মেকারদের জন্য আমি কালেতক্সির কথা মতোই বলব, ‘ক্যাপিটালিজম ৪.০ মানে সরকার এবং বাজার ভুল করেছে শুধু রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিগ্রস্ত, ব্যঙ্কাররা লোভী, ব্যাবসায়ীরা অপদার্থ, ভোটাররা বোকা বলে নয়। আরও কারণ হল, পৃথিবী কোনও রকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিল এবং অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। যে সিদ্ধান্তগুলি নিতে পারলে মানুষের উপকার হত’। মি. মোদি আপনাকে আরও বাস্তববাদী হতে হবে। বুঝতে হবে নতুন পৃথিবীতে পুরনো ধ্যানধারণা চলবে না।

(লেখা- আশুতোষ- রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, অনুবাদ- তিয়াসা বিশ্বাস)