উইটি চিমটির সুশীল সমাজে আপনাকে স্বাগত!

0

গলায় বড় মানুষের গাম্ভীর্য। ইংরেজি উচ্চারণে কর্পোরেটের ছোঁয়া। ফোনে কথা বলার সময় বুঝতেই পারিনি তাঁর চেহারা কেমন। বয়স কত। মুখোমুখি কথা না বলে বোঝা সম্ভব-ই না! ফোনে সেদিন আমি আপনি করে কথা বলা শুরু করি। ওপার থেকে পরিস্কার বাংলায় ভেসে এল, ‘স্যার প্লিজ আমাকে আপনি বলবেন না। আমি ক্লাস টেন-এ পড়ি। সামনের মাসেই বোর্ডস দেব”।

কলকাতার মাস্টার মস্করা

পরের দিন ‘ক্লাস টেন’-য়ের শুভজিত দে-র মুখোমুখি হওয়া গেল। বিরাটিতে বাড়ি। স্কুল আদিত্য একাডেমি। ‘নেম টু ফেম’- ফেসবুক ট্রোল পেজ – ‘তার কেটে গেছে’। মাত্র চার মাস আগে শুরু হওয়া ইন্টেলেকচুয়াল জোকসের এই পেজে আপাতত ‘লাইকস’ ৩৯ হাজারের কিছু বেশি। শুভজিত এবার বিনয়ী। ‘না-না, আমি একা ৩৯ হাজার করিনি। আমি ৫-৬ হাজার অবধি করেছি। তারপর আমি দুটো দাদা (পড়ুন বন্ধু) পাই। দিব্যেন্দু সরকার আর জয়দীপ ভট্টাচার্য। বাকিটা ওরাই টেনেছে’। কিন্তু এধরনের ট্রোল পেজের ভবিষ্যত কি? শুভজিত চাঁচাছোলা। ‘ভাববেন না আমি ইউজার-দের হাসানোর জন্য এসব করছি। আমি একটা নির্দিষ্ট প্ল্যান নিয়ে এগোচ্ছি। ক্লাস টেন পাশ করে আমি পড়াশুনা ছেড়ে দেব। ব়্যাপ সাউন্ড প্রডিউসার হিসাবে কাজ করতে চাই আমি। টেনের পর তাই আমি বিদেশের কোনো ইউনিভার্সিটি-তে পড়তে যাব। ব়্যাপ নিয়ে কাজ আমার শুরু হয়ে গেছে। ইউটিউব ভিডিও বানাবো। অ্যালবাম করব। আর তখনই আমার ট্রোল পেজের ক্রাউড-টা আমার কাজে লাগবে। পুরো ফ্যান বেস-টাকে রি-ডাইরেক্ট করব আমার মিউজিকে। ট্রোল পেজের ক্রাউড-তো আমার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স’! সপ্রতিভ দেখায় শুভজিত-কে। 

দাঁড়াও, দাঁড়াও। ক্লাস টেনে পড়াশুনা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাবা-মা জানেন? ‘নিশ্চয়-ই! আমি বাবা-মা-কে অনেক দিন আগেই বলে রেখেছি। অঙ্ক, বিজ্ঞান আমার ভাল লাগে না। ব়্যাপই আমার প্রাণ। বার্কলে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সিদ্ধান্তটা সেই থেকেই। যা কিছু করেছি বাবা-মা-র অনুমতি নিয়েই করেছি’।

লক্ষ্যে স্থির। এবং অদম্য জেদ। শুভজিতের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনে হল বিজ্ঞান অপছন্দের বিষয় হলেও নিজের অজান্তে সে কখন ডুবে গেছে কম্পিউটার টেকনোলজির দিগন্তহীন সমুদ্রে! ক্লাস টু থেকে ইন্টারনেট নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করা ছেলেটির প্রযুক্তিগত জ্ঞান শুনলে অবাক হতে হবে। সংগীতপ্রীতি শুরু হয় ক্লাস ফাইভের আশেপাশে। গান শোনার নেশা সেই সময় এমন প্রভাব ফেলেছিল, একবার একটা এমপিথ্রি কেনার জন্য বাবা-র পার্স থেকে এগারোশো টাকা বের করে নিয়েছিল শুভজিত। পরে ধরা পড়ে গিয়ে খুব লজ্জা হয়েছিল। তারপর থেকে তার প্রয়োজনের কথা এক দিনের জন্যও মুখ ফুটে বলেনি সে। বাবা-মা খুশি হয়ে হাত পেতে যা দিয়েছেন, শুভজিত সাদরে গ্রহণ করেছে।

সৌরভের অন্য গন্ধ...

দমদমের সৌরভ দত্তের গল্পে তেমন কোনও চমক নেই। কিন্তু আছে এগিয়ে চলা। বাঁকুড়ার ছেলে সৌরভ ২০১২ সালে গ্রাজুয়েশন পাশ করেই চলে আসেন কলকাতায়। এমসিএ শেষ করে চাকরি করাই ছিল লক্ষ্য। শিক্ষাগত যোগ্যতার নিরিখেই সফ্‌টঅ্যয়ার ডেভোলপারের চাকরি পেতে তেমন কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। বেশ চলছিল দমদম এ বাড়ি ভাড়া করে থাকা আর অফিস। বছর দেড়েক আগে হঠাৎ মনে হল ফেসবুকে ব্যক্তিগত প্রোফাইলটা আরেকটু চকচকে করে তোলা দরকার। ব্যস! শুরু হয়ে গেল ট্রোল পেজ-‘হাসির পাসওয়ার্ড’।

নামটা এমনই, লোকে নেড়েচেড়ে দেখবেই। ফোটোসপে মজার মজার বুদ্ধিদীপ্ত বাংলা মন্তব্য-কে ডিজাইন করে পোষ্ট করা হয় এই ওয়ালে। "আমি-ই করি। অফিস থেকে রাতে বাড়ি ফিরে। ভাল লাগে। সব কটা উক্তি মৌলিক। মাঝে মধ্যে দু-একটা বন্ধুকেও অ্যাডমিন বানিয়ে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি পেজ-এ বৈচিত্র্য আনার জন্য। কিন্তু ভয় লাগে-যদি কখনও উক্তি মৌলিক না হয়, নিজেরা যদি মাথা খাটিয়ে না বের করে ‘কপি-পেষ্ট মেরে দেয়’।" এক নিঃশ্বাসে ঝড়ের গতিতে বলে গেল সৌরভ। 

এই দেড় বছরে বাংলা ট্রোল পেজের দুনিয়ায় রীতিমতো হৈচৈ ফেলে দিয়েছে সৌরভের ‘হাসির পাসওয়ার্ড’। সৌরভ বলছিল, পেজ এমন একটা জায়গায় চলে গেছে, ফ্যান-ফলোয়িং এমন মারাত্মক- কোনও একদিন মজার পোষ্ট না লিখে যদি ‘সুপ্রভাত’ আর ‘শুভরাত্রি’ লিখে পোষ্ট করে দেওয়া যায়, তাহলেই নাকি ‘লাইকস’-য়ের বন্যা বয়ে যাবে। কিন্তু এই হিস্টিরিক অভিব্যক্তির পিছনে রহস্যটা কি? সৌরভের যুক্তি, এটা সম্পূর্ণ ভিউয়ারদের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে খেলা। তাঁরা কোনটা ভালবাসেন, কোনটা সময়োপযোগী- তা অনুমান করে যদি মজার উক্তি লেখা যায় এবং সেটা যদি ভিউয়ার-দের মনের কথা হয়, ‘লাইকস’ আর ‘ফলোয়ার’ আসবেই। সৌরভের সঙ্গে একমত শুভজিত। ট্রোল পেজের সাফল্য নির্ভর করবে অ্যাডমিন কত ভাল করে, কত সূক্ষ্মভাবে ভিউয়ার-দের মানসিকতা বিচার করতে পারেন তার উপর। শুভজিতের মতো হয়ত নির্দিষ্ট কোনও লক্ষ্য নিয়ে, এগোচ্ছেন না সৌরভ। কিন্তু বিষয়টা যে অসম্ভব উপভোগ করছেন তাতে সন্দেহ নেই।

লাখে একটা পাওয়া যায় এমন ছেলে...

হাসির আড়ালে একটা অন্য কাহিনিও অপেক্ষা করছে আপনাদের জন্যে। সেটা বালি-র রোহিত মান্না-র কাহিনি। ছেলেটা দারুণ ইন্টেলিজেন্ট। সেন্ট মেরিজ ব্যারাকপুরের কম্পিউটার সায়ান্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। কিন্তু ওর কথা শুনে মন ভারী হয়ে গেল। ওর এমন একটা ব্যামো হয়েছে যা এক লাখে এক জনের হয়। আপাতত শয্যাশায়ী। গত সাত মাস দুরারোগ্য জিবিসিনড্রোমে আক্রান্ত। এক লাখে এক জন মানুষ পড়েন এই রোগের কবলে। চিকিৎসা চলছে। কিন্তু কত দিনে সারবে, বা কতটা সারবে - তা নিশ্চিত নয়। রোহিতের ট্রোল পেজ 'হাসলে হবে, খরচা আছে’। গত বছর ১২ই নভেম্বর শুরু হয়। এখনও অবধি সাতাশ হাজার ‘লাইকস’ পেয়ে গিয়েছেন রোহিত। একাই অ্যাডমিন। সারাদিন ঘরে শুয়ে শুয়েই গোটা দুনিয়াকে হাসিয়ে যান বালির এই অসামান্য ছেলেটি। রোহিতেরও সময় কেটে যায় ট্রোল পেজে পোস্ট লিখে। পাশাপাশি ফ্রিলান্স প্রোগ্রামিং-এর কাজ করেন রোহিত। এটুকুই আনন্দ। বিপর্যস্ত জীবনে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর অদম্য ইচ্ছে। কি বিচিত্র তাই না? প্রদীপের তলায় যে অন্ধকার!