ইন্টারনেটে স্থানীয় ভাষাই দেবে ব্যবসায়িক সাফল্য

0

কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল এক সময়। পরাধীন ভারতের হোটেল, রেস্তোঁরায় টাঙানো থাকত অপমানসূচক এই সাইনবোর্ড। ইন্টারনেটের দুনিয়াতেও এরকমই একটা সময় ছিল। ইংরেজি জানলে আপনি স্বাগত, নইলে ‘তফাত যাও’। মাউসে পেলব ক্লিক দিলেই, ‘খুল যা সিম সিম’। নিজেকে আপনি আবিষ্কার করবেন বিশ্ব-উদ্যানের মাঝে। ডালে-ডালে পেকে টুক-টুক করছে জ্ঞানবৃক্ষের ফল। কত তথ্য। আইনস্টাইন থেকে স্টিফেন হকিং। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন থেকে বিল লাদেন। ইংরেজি জানলে ইন্টারনেট খুলে দেবে জ্ঞানের উদ্যা‌নের প্রবেশদ্বার। নইলে পরাধীন ভারতের ‘কুকুর এবং ভারতীয়দের’ মতো আপনিও ব্রাত্য।

এই ১২০ কোটির দেশে বাজার ধরতে যারা উৎসাহী। তারা জানেন এখন তথ্যে সকলের অধিকার। ফলে ইংরেজি নয়। কনটেন্টের ভাষা হতেই হবে স্থানীয়।

সাহিল কিনি
সাহিল কিনি

হাতুড়ির আঘাতে, বুলডোজারের ধাক্কায় ইন্টারনেটের অদৃশ্য প্রাচীর ভেঙে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার কাজটা যারা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে সাহিল কিনি অন্যতম। Aspada নামের সংস্থার ভাইস প্রেসিডেন্ট। বেঙ্গালুরুর টেক স্পার্কসের সম্মেলনে সাহিলের বক্তব্য যেন প্রচলিত অন্তর্জাল ব্যবস্থার মুখে নক-আউট পাঞ্চ। 

‘ভারতীয়েদর অর্ধেকই তো ইংরেজি জানেন না। ইন্টারনেটে তাঁদের অধিকার সুনিশ্চিত কররা জন্য কম্পিউটারে চাই স্থানীয় ভাষা। নইলে কিন্তু ধরে নিতে হবে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তৈরি সাইনবোর্ড এখনও টাঙানো রয়েছে।’

২০১৫ সালে টেক স্পার্কসে সাহিল
২০১৫ সালে টেক স্পার্কসে সাহিল

কম্পিউটারে স্থানীয় ভাষা প্রয়োগের চেষ্টায় লেগে থাকা সাহিল কিনি সাফল্যের মুকুটে একগুচ্ছ পালঙ্ক। টেক স্পার্কসের সম্মেলেন সাহিল যে কথা বললেন, তার মর্মার্থ এরকম – ভারতে মাত্র দশ থেকে বারো কোটি মানুষ ইংরেজি জানেন। জনসংখ্যার অনুপাতে তা মাত্র দশ শতাংশ। আর বাকি নব্বই শতাংশ ৭৮০টি ভাষা এবং উপভাষায় কথা বলেন। সংবিধানে বাইশটি ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ভাষার সমুদ্র ভারতের বিভিন্ন ভাষাকে যদি কম্পিউটারে ব্যবহার করা যায়, তবে সাধারণ মানুষের উপকার তো হবেই। সঙ্গে রয়েছে ব্যবসার সুবর্ণ সুযোগ।

টেক স্পার্কসের সম্মেলন
টেক স্পার্কসের সম্মেলন

নিজে সাতটা ভাষায় কথা বলতে পারেন সাহিল। মানুষটা উপলব্ধি করেন যে কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট এখন সাধারণ মানুষের কাছে প্রহেলিকা। স্বপ্নের উদ্যান। ভাষার অদৃশ্য প্রাচীর ডিঙিয়ে বেশিরভাগ মানুষ সেখানে পৌঁছতেই পারেন না‌। এখনও ইন্টারনেটে যা কিছু পাওয়া যায় তার ৫৬ শতাংশ ইংরেজিতে।

ডেভেলপারদের উদ্দেশ্যে সাহিল বলেন, ‘‘কম্পিউটারে স্থানীয় ভাষা ব্যবহারের জন্য জানা চাই – সৃষ্টিশীলতা+বোধশক্তি+আবিষ্কারি নেশা। আসপাদা পোর্টফোলিও কোম্পানির ক্যাপিটাল নাকি এটাই। আমরা যখন পারছি, তখন আপনারা পারবেন না কেন?’’ সম্মেলনের মঞ্চ থেকে যেন চ্যালেঞ্জটা ছুঁড়ে দিলেন সাহিল।

দক্ষতার স্বীকৃতি হিসাবে কোম্পানির বোর্ডে স্থান পেয়েছেন সাহিল। সেই কবে স্বাধীনতা দাবি করে পদ্মাপারের একদল বাঙালি ছেলে বলেছিল, গুলি চালাবে তো চালাও। তবু বাংলায় লিখব। বাংলায় ভাবব। বাংলা আমার দীপ্ত স্লোগান, তৃপ্ত শেষ চুমুক। একুশে ফেব্রুয়ারি সত্যিই অমর। সাহিলরা আছেন বলেই অমর। বেঁচে রয়েছে যুগ-যুগ ধরে।

ইংরেজি সর্বস্ব সাইবার দেওয়ালে, বার্লিনের প্রাচীরের মতো গুঁড়িয়ে দিতে হলে দরকার স্থানীয় ভাষায় ফন্ট। শুদ্ধ ব্যকরণের প্রয়োগ। অনুবাদ এমন হতে হবে যাতে তা অন্ধ অনুকরণ না হয়ে দাঁড়ায়। ইংরেজি ‘প্লে’ কে হিন্দিতে বলা যেতে পারে খেল, বাজাও বা তানপুরা, সেতার, বেহালার মতো সঙ্গীতের যন্ত্র বাজানো। কিংবা নাটক। কোন ক্ষেত্রে কী শব্দ প্রয়োগ করা দরকার, তা বোঝার জন্য দরকার মেধা। এজন্যই বোধহয় সাহিল বলেন, কম্পিউটারে স্থানীয় ভাষা চালু করতে গেলে সমস্যা তো রয়েছে অনেক। কিন্তু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলেই পাহাড় চূড়ো জয়ে এত আনন্দ, এত রোমাঞ্চ।

ভাষার সমুদ্র ভারতের ইন্টারনেটে নাকি এখন সবেমাত্র জোয়ার। স্থানীয় ভাষার ওপর জোর দিলে আসবে বড়-বড় ঢেউ। ব্যবসার সুবর্ণ সুযোগটা ছেড়ে দেওয়া কি খুব বুদ্ধিমানের হবে? প্রশ্নটা রইল উদ্যোগপতিদের জন্য।

Related Stories