প্রত্যন্ত বাজারে দার্জিলিঙের উন্নত চা পৌঁছে দিচ্ছেন রমেশ

0

গ্র্যাজুয়েশনের পর কিছুদিনের জন্য দার্জিলিং গিয়েছিলেন রমেশচাঁদ আগরওয়াল। তখনও ঠিক করে উঠতে পারেননি ভবিষ্যতে কী করবেন। উত্তরবঙ্গে ঘুরতে গিয়ে সেখানে চায়ের চাষ এবং খোলা বাজারে চায়ের নিলাম দেখে নিজের ভবিষ্যৎ ঠিক করে নেন বছর বাইশের যুবক। কতটা কী করতে পারবেন তখনও বুঝতে পারছিলেন না। পরীক্ষামূলকভাবে তাই চায়ের একটা ছোট চালান কিনে নেন। তারপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

বেশি পরিমানে চা কেনাবেচার প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকে প্রথমে জল মাপার চেষ্টা করছিলেন রমেশ। সেই সময় একটা ঘটনা ব্যবসার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রমেশ বলেন, ‘খোলা চায়ের এক খুচরো ব্যবসায়ীর সঙ্গে একদিন বসে আলাপ করছিলাম। সেই সময় এক খদ্দের এসে চায়ের মান নিয়ে অভিযোগ করে গেলেন। শুধু তাই নয়, কদিন আগে কেনা চায়ের প্যাকেটও ফেরত দিয়ে যেতে চাইলেন। ওই ঘটনাই যথেষ্ঠ ছিল। ঠিক করে নিলাম, নিজের ব্র্যান্ডে ভালো মানের সাধ্যের মধ্যে দামের চায়ের প্যাকেট বের করব। প্যাকেট যাবে সেই সব জায়গায় যেখানে ব্রুক বন্ড বা লিপটনের মতো বড় ব্র্যান্ডের চা পৌঁছায় না’। তিন ভাইয়ের সহযোগিতায় দূর দূরান্তে ভালো মানের চা পৌঁছে দিতে রমেশ, ‘মোহানি টি’ নামে ব্র্যান্ড বানিয়ে চায়ের উৎপাদন শুরু করেন।

মরশুমি ফসল হলেও মানুষ সারা বছর চা খান। উত্তরবঙ্গ, অসম, তামিলনাড়ু এবং কেরল থেকে চায়ের নমুনা সংগ্রহ করে প্রোডাক্ট চূড়ান্ত করা রীতিমতো যেন দক্ষযজ্ঞ। বিভিন্ন এজেন্ট থেকে চায়ের নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরীক্ষা হয়ে এলে তবে অর্ডার পড়ে। এজেন্টদের কাছ থেকে নেওয়া সমস্ত পণ্য এরপর কানপুরে যেখানে কারখানা রয়েছে সেখানে নিয়ে আসা হয়। আরেক প্রস্ত পরীক্ষা হয় কানপুরে। ‘মোহানি টি’র বর্তমানে একটি বিশেষজ্ঞ দল রয়েছে যারা উৎপাদিত চা তিন মাসের মধ্যে জায়গায় জায়গায় পৌঁছে দিয়ে সরবরাহের গোটা প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন।

অন্যান্য পণ্যের মতোই চা সরবরাহের ক্ষেত্রেও অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। গ্রামে লোকসংখ্যা অনেক। তবে তাঁদের গ্রাহক হিসেবে পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। রমেশ বলেন, ‘কানপুরে যখন চা প্যাকেটজাত হওয়ার কাজ চলছিল তখনই বুঝতে পারি উত্তর প্রদেশের দূর দূরান্তের গ্রামে মাল পৌঁছানো এবং সরবরাহ করা বেশ কঠিন, শুরুতে যেটা বোঝা যায়নি। নতুন ব্র্যান্ড হওয়ায় ডিস্ট্রিবিউটর পাওয়াও মুশকিল। সবাই ধারে মাল নিতে চাইত। কাটতিও কম। তাই দোকানদারও নতুন ব্র্যান্ডের চা রাখার ভরসা পেতেন না। ধৈর্য এবং ধারাবাহিকতার জয় হল শেষ পর্যন্ত। ছোট শহরে মোহানি চা ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা পেল’।

যেটা চ্যালেঞ্জ ছিল আস্তে আস্তে সেটাই শক্তিতে পরিণত হল। স্থানীয় পুরনো যে ব্র্যান্ড আগে থেকেই চালু ছিল তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়ও আর সেভাবে লড়তে হচ্ছিল না। রমেশ যোগ করেন, ‘স্থানীয় অনেক সংস্থা ‌রয়েছে বাজারে যেগুলি ছোট জায়গায় চুটিয়ে ব্যবসা করে অথবা কয়েকটা জেলায় বেশ চালু। সবসময় দাম আর স্কিমের ওপর খেলে। যেহেতু আমাদের পাখির চোখ গ্রাম আর ছোট ছোট শহর ফলে, আমারা ইউনিলিভার বা টাটার মতো জাতীয় স্তরের সংস্থাগুলির সঙ্গে লড়াই করতে পারব না। কিন্তু প্রাদেশিক ও স্থানীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে লড়াইও বেশ কঠিন। কোন প্রযুক্তি ব্যাবহার হবে তা নিয়ে কোনও বাধা নিযেধ ছিল না। ফলে প্রাথমিকভাবে সেটাই ডিস্ট্রিবিউশন, ব্র্যান্ডিং, গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জন এবং সাপ্লাই চেন ঠিক রাখার শক্তি যুগিয়েছিল।যার ফলে প্রতিযোগিতায় সবাইকে পেছনে ফেলে দিতে সময় লাগেনি’।

উত্তর ভারতে বর্তমানে ৬০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার নিজের দখলে বলে দাবি রমেশের। উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, পঞ্জাব, জম্মু ও কাশ্মীর, বিহার, ঝাড়খণ্ডেও ভালো শেয়ার রয়েছে। বর্তমানে সংস্থার বার্ষিক আয় ৩০০ কোটি টাকা।আগামী পাঁচ বছরে সেটা ১০০০ কোটিতে নিয়ে যাওয়াই রমেশ আগরওয়ালের লক্ষ্য।