কুষ্ঠ আক্রান্তদের নতুন জীবন দিল বিন্দু আর্ট স্কুল

0

মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, হোটসঅ্যাপ-চূড়ান্ত টেকস্যাবি আজকের প্রজন্ম। তবু ভাবতে অবাক লাগে অত্যাধুনিক এই প্রজন্মের কাছে আজও অস্পৃশ্য কুষ্ঠরুগীরা, এডস আক্রান্তরা। ঠিক এই ভাবনাটাই নাড়া দিয়েছিল ওয়ার্নার ডরনিককে। ওয়ার্নারের পরিচয়, তিনি একজন শিল্পী, অস্ট্রিয়ার মাল্টি মিডিয়া আর্টিস্ট। নিজের ভাবনার এক দোসর খুঁজে পান ভারতে। খুঁজে পান পদ্ম ভেঙ্কটরমনকে। পদ্মের আরও একটা পরিচয় আছে। তিনি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আর ভেঙ্কটরমনের কন্যা। দুজনে মিলে ২০০৫ সালে চেন্নাইয়ে গড়ে তোলেন বিন্দু আর্ট স্কুল, যার লক্ষ্যই হল সারা দেশের কুষ্ঠরুগীদের সমাজে প্রতিষ্ঠা দেওয়া।

কেউ ঠিক করে তুলিও ধরতে পারেন না। কারও দুটো আঙুলের জড়তায় রেখা বেঁকে যায়। এক রঙ গড়িয়ে মিশে যায় অন্য রঙে। সেই সব প্রতিবন্ধকতা নিয়েই কেউ এঁকেছেন মাছ-ফুল-পাখির স্বপ্নের সংসার। ফুটে উঠেছে অবজ্ঞার যন্ত্রণা। কেউ খুঁজে পেয়েছেন নিহীত শান্তি। কারও ছবিতে শহরের পথে যুগলের স্কুটার যাত্রা। যেন পথ না শেষ হয়। কারও ছবিতে আছে অরণ্য, মেটে রঙের অলিগলি। আদিগন্ত পথ নিঃসর্গের হাত ধরাধরি করে চলছে তো চলছেই অগস্ত যাত্রায়! সমাজে ফেরার পথ নেই। কিন্তু ওরা শিল্পের হাত ধরেই ফিরে আসতে পারলেন সসম্মানে আরও বৃহত্তর সমাজে।

তামিলনাডুর চেঙ্গেলপট্টু এলাকার ভারত্তাপুরমে ‘বিন্দু’ নামে একটি শিল্প স্কুলে ৫০ জন কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত শিল্পী ছবি আঁকেন। এমন ১০ জন শিল্পীর আঁকা প্রায় ৪০টি ছবি নিয়ে শান্তিনিকেতনের নন্দন গ্যালারিতে সম্প্রতি চিত্র প্রদর্শনী করে গেলেন ওয়ার্নাররা। ‘শান্তিনিকেতনের কথা আমরা আগেই শুনেছিলাম। আমাদের খুব ভাল লাগছে, এমন একটি জায়গায় আমাদের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী হচ্ছে’, বলেন শিল্পীদের একজন ওয়াই উমা। ‘একটা সময় বাঁচার ইচ্ছেটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। একা হয়ে গিয়েছিলাম। এখন বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা ফিরে পেয়েছি’, বলছিলেন উমা। উদ্যোক্তাদের পক্ষে বিশ্বভারতীর চিত্রকলা বিভাগের সঞ্চয়ন ঘোষ বলেন, ‘প্রদর্শনীর পাশাপাশি এখানকার শিল্পকর্ম এবং শিল্পীদের সঙ্গে ওখানকার শিল্পীদের আলাপ পরিচয়ের কর্মসূচিও ছিল’।

শুধুমাত্র সরকারি সহায়তার জন্য বসে না থেকে, এই সংস্থা আর্থ-সামাজিক দিক থেকে স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল তাঁদের পথ চলা। প্রথমে তাঁরা কুষ্ঠ রোগে আক্রান্তদের তৈরি শিল্প কর্ম বিক্রি করে, আর্থিক দিক থেকে তাঁদের স্বনির্ভর করার চেষ্টা করছেন। দেশের অন্য জায়গার মতো দক্ষিণ ভারতের তামিলনাডুর চেঙ্গেলপটু এলাকার ভার্তপুরমে রয়েছে কুষ্ঠকলোনী। এমন এলাকাগুলির বাসিন্দাদের আর্থ-সামাজিক পুনর্বাসন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন অষ্ট্রিয়ার শিল্পী ওয়ার্নার ডোরনিক ‌এবং ভারতের সমাজকর্মী পদ্মা ভেঙ্কটরমন। তাঁদের উদ্যোগে ২০০৫ সালে কুষ্ঠ রোগে ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে এমন আর্ট স্কুলের পরিকল্পনা।স্কুলের পক্ষে ওয়ার্নার ডোরনিক বলেন, ‘চেষ্টা করছি ওঁদের স্বনির্ভর করতে। আমরা ওঁদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। শান্তিনিকেতন শিল্প, সংস্কৃতির জায়গা। বিশ্বভারতীর কলাভবনের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু শেখার এবং ঘুরে দেখার জন্য ওই শিল্পীদের নিয়ে আসা। তাদের শিল্পকর্মের প্রদর্শনীর পরিকল্পনাও, তারই একটি অঙ্গ।’

‘নন্দন’ গ্যালারিতে যে সব ছবি জায়গা করে নিয়েছে তার বেশিরভাগই হ্যান্ডম্যাড পেপারের উপর পেস্টেল কালারের কাজ। বেশির ভাগ ছবিজুড়ে রঙ ও রেখার আশ্চর্য এক সারল্য। ভাবনার উড়ানে সুদূরের ডাক। একরাশ স্বপ্ন জড়িয়ে রয়েছে  ছবিগুলিতে।

Related Stories