পেপারকাপে তুফান তুললেন কলকাতার সোমঋতা

1

"আমার বাবা-মা খুবই ভালো। সবকিছুতেই তাঁরা আমার পাশে দাঁড়ান। কিন্তু যখন কেউ আমার মা'কে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন তিনি বিষণ্ণ স্বরে বলেন যে তাঁর মেয়ে রোজগারের জন্য কেটলি বিক্রি করে!" নিজের ডিজাইন স্টার্টআপ পেপারকাপ (Papercup) সম্পর্কে শুরুতেই এ কথা বললেন বছর চব্বিশের সোমঋতা গুহ।

পড়াশোনা শেষ হলে একটা ভালো চাকরি। সাধারণত এমনটাই দেখা যায়। সোমঋতা কিন্তু সেই চেনা ছকে বাঁধা পড়তে চাননি। তবে ঠিক কী করতে চান সেটাও বুঝে উঠতে পারছিলেন না যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির ছাত্রী থাকাকালীন। সৃষ্টিশীল কিছু করার মধ্যে আনন্দ পেতেন। কিছুটা শখপূরণের জন্যই শুরু করেন পেপারকাপ। দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার হয় এমন কিছু জিনিসকে নান্দনিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন ব্যাপারটা খুবই ছোট আকারে ছিল। পরবর্তীকালে সেটা নিয়ে বড় কিছু করবেন এমন ভাবনা মাথাতে ছিল না। এ সব কথা ২০১০ সালের।


নেহাতই শখ পূরণ করতে যে কাজের শুরু তা কিন্তু থেমে থাকল না। সোমঋতা লেগে রইলেন। চারবছর ঘষামাজার পরে ২০১৪ সালে সংস্থা হিসাবে নিবন্ধীকৃত হল পেপারকাপ। প্রোডাক্ট বলতে সাধারণ কিছু জিনিস। কিন্তু কাছে রাখতে চাইবেন অনেকেই। এটাই বিশেষত্ব। গত তিনমাস হল ই-কমার্স ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তারা এর বিক্রিবাটাও শুরু করে দিয়েছেন বলে জানালেন সোমঋতা। এর আগে থার্ড পার্টি ওয়েবসাইট, যেমন ফেসবুক ইত্যাদির মাধ্যমে পেপারকাপ বিক্রি করা হোত। কিছু ইভেন্টেরও আয়োজন করা হোত। যা এখনও করা হয়ে থাকে। এইসব ইভেন্টে শুধু পেপারকাপ প্রদর্শন ও বিক্রি নয়, সঙ্গে থাকে লাইভ জ্যামিং সেশন, স্পোকেন ওয়ার্ড পোয়েট্রি, লাইভ আর্ট। স্টার্টআপ হিসাবে কাজ শুরুর পরে গত এক বছরে কর্পোরেট ক্ষেত্রেও সামগ্রী নিয়ে পৌঁছে গিয়েছে পেপারকাপ। পেপারকাপের ফ্ল্যাগশিপ প্রোডাক্টের মধ্যে রয়েছে সুদৃশ্য কেটলি। যাতে ছবিতে, রঙে ভরিয়ে তোলা হয়েছে পৌরাণিক কাহিনি, লোককাহিনি, দৃশ্যাবলী। এছাড়াও রয়েছে মাগ, মাকড়ি, ঘর সাজানোর বিভিন্ন জিনিসপত্র।


কোনও কিছু তৈরি করা এক জিনিস। আর তা বিক্রি করা আর এক জিনিস। এ ব্যাপারে সোমঋতার বক্তব্য,"৫ বছর আগে আমরা যা করতে চাইছিলাম, তখন খুব কমজনই সেই পথে এগোচ্ছিল। কিন্তু এখন বাজার একদম সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। সুপার স্যাচুরেটেড বলতে পারেন। একই ক্ষেত্রে কাজ করছেন অসংখ্য মানুষ। যে কারণে ই-কমার্সেও ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রথম দশের মধ্যে থাকতে গেলে বিশাল বাজারে বড় বড় সংস্থার সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে। কিন্তু কম্পিটিশনের এই চ্যালেঞ্জকে স্বাগত জানাই। আর একটা বড় বিষয় হল ফান্ডিং। কিন্তু সঠিক সময়ে আমরা তার ব্যবস্থা করে নিতে পারব বলে আমরা আশাবাদী।" সঙ্গে আর একটু সংযোজন ঘটিয়ে সোমঋতা বললেন,"আমাদের ব্যবসা এগোচ্ছে ই-কমার্সের পথ ধরেই। ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় ভারতে ই-কমার্সের বাজার এখনও ছোট। কিন্তু ভারতে ই-কমার্স খুব দ্রুত গতিতে বাড়ছে। যেখানে এক কোটির মতো অনলাইন ক্রেতা রয়েছেন, সেখানে আপনি কিছুটা ভাগ তো পাবেনই। এখন কথা হল যতটা বেশি সম্ভব সেই বাজারকে অধিকার করা।"


বাজারে টিকে থাকতে কী পরিকল্পনা রয়েছে পেপারকাপের? এ ব্যাপারে ধারাবাহিক লড়াই, হার না মানা মনোভাবে জোর দিচ্ছেন সোমঋতা। একমাত্র তাহলেই বিশাল বাজারে প্রতিযোগীদের সঙ্গে টক্কর দেওয়া যাবে বলে তিনি মনে করেন। এ জন্য পরিকল্পনাও ছকে নিয়েছেন তিনি। তিনটি বিষয়ে বিশেষ নজর। প্রথমত, ই কমার্সে যতটা বেশি সম্ভব উপস্থিতি জানান দেওয়া, লক্ষ্য আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছন। দ্বিতীয়ত, কর্পোরেট ক্লায়েন্টদের কাছে প্রথম পছন্দ হিসাবে উঠে আসা, কর্পোরেট ক্ষেত্রে উপহারসামগ্রীর প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে।আর এমন ইভেন্টের ব্যবস্থা করা যেখানে একইসঙ্গে লাইভ মিউজিক, কবিতা, শিল্পের সঙ্গেই ব্যবস্থা থাকবে জিনিস বিক্রির ব্যবস্থা।


পেপারকাপের অধিকাংশ জিনিসই হাতে তৈরি আর তা করে থাকেন সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মহিলারা। এই কাজে যুক্ত না হলে যাদের হয়তো পরিচারিকা হিসাবেই রোজগারের পথ দেখতে হোত। ফলে প্রান্তিক এইসব মহিলাদের সামনে রোজগারের একটা পথ খুলে গিয়েছে। সোমঋতা অবশ্য একা নন, পেপারকাপের কো-ফাউন্ডার হিসাবে রয়েছেন শুভজিৎ পাঁজাও। ব্যবসা চালাতে যে টুকু পুঁজি লাগছে তার ব্যবস্থা দুজনে মিলেই করে চলেছেন। বাজারে কতটা সাড়া মিলছে? সোমঋতার জবাব, "আমরা বাজার বুঝি না, আমরা বুঝি মানুষ।" সেই মানুষের মন বুঝতেই লেগে রয়েছে পেপারকাপ। ই-কমার্স ওয়েবসাইট তো রয়েছেই, পাশাপাশি প্রতি তিন মাসে ইভেন্টসের আয়োজন করা হয়। কলেজের ফেস্টে গিফ্‌ট স্পনশর হিসাবে সহযোগিতা করা হয়। সোমঋতা মনে করেন, যেভাবে চলছে তা আরও কিছুদিন ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতের দিকে অনেকটাই এগিয়ে যাবে পেপারকাপ।


পিছন ফিরে তাকালে কেমন লাগে? এ ব্যাপারে ভালো লাগা, খারাপ লাগা দুই আছে সোমঋতার। যত ছোটই হোক, তিনি নিজের মতো কিছু করার চেষ্টা করছেন, এটা সবসময়ই তাকে তৃপ্তি দিত। আরও কাজ করার শক্তিও জোগাত। কিন্তু চারপাশের মানুষ যেভাবে তাকে নিরুৎসাহিত করেছে, উপহাস করেছে তা আজও ভুলতে পারেন না। সোমঋতার কথায়," কেউ অন্যরকম কিছু ভাবছে বা করতে চাইছে মানেই যেন ব্যাপারটা গোলমেলে। নিশ্চয় এর মধ্যে অন্যরকম ব্যাপার আছে। আমাদের সমাজে এমনটাই ভেবে নেওয়া হয়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। স্টার্টআপ আবার কী, এসব খারাপ জিনিস এমনই সব সারগর্ভ জ্ঞান দিতেন তারা। কেউ-কেউ উপদেশ দিয়ে বলতেন, শখ হিসাবেই এসব ভালো, কিছু করতে গেলে চাকরিবাকরিই ভালো। আসলে এই ধরনের লোকেরা ঝুঁকি নিতে ভয় পায়। তাদের কাছে জীবন মানে যতটা সম্ভব ঝুঁকিহীন থাকা। তারা এমন জীবন কাটিয়েছেন মানে অন্যদেরও তেমনটাই হওয়া উচিত। কিন্তু এসব অন্তঃসারশূন্য কথায় আমি দিশা বদলাইনি। যা ভেবেছি তাই করেছি। লজ্জা করলে কিন্তু চলবে না।" আর এখন? "এতটাই থ্রিল যে কী বলব। ঠিক যেন সিনেমার মতো। রোজই কমবেশি একই কাজ করলেও, প্রতিটা দিন যেন অন্যরকম। ব্যস্ততা, দৌড়ঝাঁপ, মিটিং, নতুন-নতুন লোকের সঙ্গে কথা বলা, নতুন আইডিয়া। আপনি যঅন্যরকম কিছু একটা করছেন এই বোধটাই সবচেয়ে আনন্দের। গত একবছর আমি আন্ত্রেপ্রেনার হওয়া ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারিনি। যদি ব্যর্থও হই, তবুই চাইব একজন উদ্যোগপতিই হতে", গর্বের সঙ্গে এ কথাই বললেন সোমঋতা।