বিলিতি ব্রকোলির গুণে চাঙ্গা বারাসত, বনগাঁ

0

অন্য চাষের মতোই খরচ। জলের ঝামেলাও তেমন নয়। অথচ রোজগার দ্বিগুণ। অর্থের গুণে বাঁধাকপি, ফুলকপিকে সরিয়ে বনগাঁ, বারাসতের মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষকরা ব্রকোলি চাষে মন দিয়েছেন। হোটেল, রেস্তোঁরার চাহিদা আছেই, সঙ্গে সাধারণ মানুষের খাদ্য তালিয়া ব্রকোলি জায়গা করে নেওয়ায় বিক্রি নিয়ে ভাবতে হয় না। বিঘে প্রতি দশ থেকে পনেরো হাজার টাকা লাভের হাতছানিতে ব্রকোলি চাষের জমি দ্রুত বাড়ছে উত্তর ২৪ পরগনায়।

তিন-চার দশক আগেও বাঙালির রান্নাঘরে বিনস, ক্যাপসিকাম মঙ্গলগ্রহের বস্তু বলে অনেকের মনে হত। এই দুই সব্জি এখন যেমন অবিচ্ছেদ্য হয়ে পড়েছে অনেকটা সেভাবেই হেঁশেলে ঢুকেছে ব্রকোলি। ফুলকপির মতো, শুধু ফুলটাই সবুজ রংয়ের। স্বাদেও অন্যরকম। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই সব্জির ব্যবহার বাড়ছে স্যালাড, সব্জি ডাল, পকোড়ার মতো পদে। মানুষের এই রুচি বদলের পিছনে অন্যতম বড় ভূমিকা নিয়েছেন উত্তর চব্বিশ পরগনার একাধিক এলাকার চাষিরা। আমডাঙা, গোপালনগর, হাবরা, গাইঘাটা, মছলন্দপুরের মতো জায়গায় এখন ব্রকোলির রমরমা। বীজ ফেলা থেকে মাস চারেকের মধ্যে এই সব্জি তৈরি হয়। কয়েক বছর আগে ব্যক্তিগত উদ্যোগে চাষ শুরু হলেও এখন জেলার উদ্যানপালন দফতর বেশ কয়েক জায়গায় ব্রকোলির বীজ দেওয়ার পর থেকে চাষযোগ্য জমির পরিমাণটা দ্রুত বাড়ছে।

জেলার উদ্যানপালন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে বনগাঁ ও বারাসত মহকুমা মিলিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার একর জমিতে এ বছর ব্রকোলি চাষ হয়েছে। গতবারের থেকে চাষের জমির পরিমাণ দেড় গুণ বেড়েছে। গতবার ফলন ছিল ৫০ মেট্রিক ফলন। এবার সেখানে বেড়ে হয়েছে ৭২ মেট্রিক টন। ব্রকোলির মতো অপ্রচলিত সব্জির এই উত্তোরত্তর বৃদ্ধির পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ। বলছেন আমডাঙার মাঠপাড়ার চাষি আমিরুল ইসলাম। আমিরুল গত তিন বছর ধরে ব্রকোলি চাষে যুক্ত। ফুলকপি, বরবটি, পালং শাক, টম্যাটোর মতো শীতকালীন সব্জি চাষ করতেন জমিতে। ব্রকোলিতে মন দেওয়ার পিছনে আমিরুল বলেন, ‘‘আমার অল্প জমি। অন্য সব্জি চাষ করলেও দাম পেতাম না। ব্রকোলি চাষ করার পর থেকে আর বিক্রির জন্য ভাবতে হয় না।’’ আমিরুলের মতো ভরসা পাচ্ছেন হাবরার ফুলতলার সৌমিত্র সাহা। ব্রকোলি নিয়ে এই প্রবীণ চাষি শুরুর দিকে সংশয়ে ছিলেন। ভাল দাম মেলায় তাঁর বিভ্রান্তি কেটেছে। সৌমিত্রবাবু নিজের পাঁচ বিঘে জমির পুরোটাই এবার ব্রকোলির জন্য রেখেছিলেন। মাত্র চার মাসেই ষাট হাজার টাকা তাঁর ঘরে এসেছে।

গাইঘাটার শ্রীরামপুরের ব্রকোলি চাষিরা সংগঠিতভাবে নেমেছেন। ব্রকোলির ভাল দামের আশায় তারা একটি গাড়ির ব্যবস্থা করেছেন। যে গাড়ি করে ব্রকোলি চলে যাচ্ছে শিয়ালদহ, মানিকতলা বাজারে। বেশ কিছু হোটেল, রেস্তোঁরা এবং শপিং মলেও যাচ্ছে ব্রকোলি। শ্রীরামপুরের সুধাংশু দাস বলছেন, ‘‘আমাদের ব্রকোলির খুবই চাহিদা কলকাতায়। ওখানে এক পিস ব্রকোলি ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হয়। আরও চাষের জমি বাড়ানোর চেষ্টা করছি । অনেকেই এই চাষে আসতে চাইছেন।’’ আশ্বিনের শেষের দিকে বীজ ফেলা হয়। ফুলকপির পিঠোপিঠি ফসল ওঠে। কেউ কেউ একটু দেরিতে লাগিয়ে দেরিতে তোলেন। তাদের লাভটা অনেক বেশি। এত উজ্জ্বলতার মধ্যেও আক্ষেপও চাষিদের। তাদের কথায় ডিসিক্কো, কমেট, গ্রিন ম্যাজিক, ফিয়েস্টের মতো প্রজাতির উচ্চফলনশীল ব্রকোলি বীজ সব জায়গায় পাওয়া যায় না। দামও কেজি প্রতি সাতশো থেকে হাজার টাকা। পাশাপাশি পরিকাঠামোগত সমস্যায় তারা ভোগেন। সবার পক্ষে বহু দূরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না বলে ৮ থেকে ১২ টাকার মধ্যে এক পিস ব্রকোলি করে দিতে হয়। উদ্যান পালন দফতর এই সমস্যা সমাধানে অনেক জায়গায় বীজ বণ্টন করেছে। তাতে কিছুটা কাজও হয়েছে। ব্রকোলি এখন আর অচেনা চাষ নয় উত্তর ২৪ পরগনার এই দুই মহকুমায়। হাবরা, আমডাঙার দেখাদেখি বসিরহাটের কয়েকটি জায়গায় ব্রকোলি চাষ শুরু হয়েছে। এভাবেই জেলায় অর্থকরী সব্জির চাষচিত্রে আরও আলো পড়ছে।