সন্দেশখালির দিগন্তে উজ্জ্বল ফারুকের মিশন

0

সাতটা বাজলে আদুরে ঘুম সরিয়ে ইউনিফর্ম পরে বই, ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে, অর্পিতা, জেসমিন, শাহিদরা। তাদের যে স্কুলে যেতে হবে। পড়াশোনা করতে হবে। বড় হতে হবে যে। হইহই করে স্কুলে যাওয়ার পর প্রার্থনা। পড়ার ফাঁকে হাত ধুয়ে টিফিন খাওয়া। নোংরা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা। এভাবেই শৃঙ্খলার অদৃশ্য সুতোর মধ্যে বড় হচ্ছে কচিকাঁচারা। তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘নবদিগন্ত মিশন’ সত্যিকারের নতুন দিগন্তের খোঁজ দিয়েছে।

জলে, জঙ্গলে বেড়ে ওঠা। দু মুঠো ভাতের জন্য লড়াই এথানে নিত্যসঙ্গী। এই যুদ্ধে ক্রমশই পিছনের সারিতে চলে গিয়েছিল পড়াশোনা। এমনই এক পাণ্ডববর্জিত গ্রামে ঝাঁকুনিটা দিয়েছিলেন ভূমিপুত্র ফারুক হোসেন গাজি। নামী হাসপাতালের চিকিৎসক ফারুক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে গ্রামে স্কুল খোলেন। যার পুরোটাই বিনামূল্যে। পড়ুয়া ও অভিভাবকদের পড়াশোনার গুরুত্ব বোঝানোর পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ে সচেতন করার কাজটাও শুরু হয়ে যায়। আর এভাবেই উত্তর চব্বিশ পরগনার সন্দেশখালির বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘটে গিয়েছে নিঃশব্দ বিপ্লব।


বছর দুয়েক আগেও এই ব্যা পারটা খাস শাকদহে গ্রামে ভাবাই যেত না। ভোজবাজির মতো পরিবেশটা এক লহমায় বদলে দিয়েছেন ফারুক। দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় ফারুক অভাবী পরিবারে বড় হয়েছেন। কিন্তু কোনওভাবেই ছেলের শিক্ষার অভাব যাতে না হয় তার জন্য আল আমিন মিশনে পাঠিয়েছিলেন বাবা। সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বাঁকুড়ার সম্মিলনী মেডিক্যাল ক‌লেজে এমবিবিএস শেষ করেন ফারুক। এরপরই এক নামী বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি পেয়ে যান সন্দেশখালির খাস শাকদহের প্রতিনিধি। বৈভব, ভোগবাদের গড্ডালিকায় হারিয়ে যাওয়ার সমস্ত ব্যবস্থাই ছিল। সব দূরে রেখে আঠাশ বছরের ফারুখ ফিরে আসেন নিজের গ্রামে।দিন বদলের ডাক শুরু হয় তখন থেকেই।

খাস শাকদহের অধিকাংশ মানুষই পেশায় দিনমজুর। কারও ফিশারি আছে। কেউ আবার ফিশারিতে কাজ করেন। সংখ্যালঘু প্রভাবিত এই গ্রামে কয়েক ঘর আছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। এদের কাছে পড়াশোনাটা এখনও বিলাসিতার মতো। তাদের বুঝিয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থাটা করেছিলেন ফারুক। আর এই অসম লড়াইয়ে পেয়েছিলেন গ্রামের কিছু উৎসাহীকে। সেই লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রামেই ফারুক সাহেব প্রতিষ্ঠা করেন ‘নবদিগন্ত মিশন’। ফারুকের সঞ্চিত অর্থে তৈরি হয় স্কুলভবন। যেখানে নার্সারি থেকে ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াশোনার ব্যবস্থা আছে। ইতিমধ্যেই সেখানে প্রায় ২৫০ জন ছেলেমেয়ে বড় হওয়ার পাঠ নিচ্ছে। বই, ব্যাগ থেকে ইউনিফর্ম। সবকিছুই বিনা পয়সায় পায় পড়ুয়ারা। তিন-চার বছর বয়স থেকেই মাউসের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে অর্পিতা, জেসমিনদের।

শুধু পড়াশোনার পরিবেশ আটকে না থেকে এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নের কাজ শুরু করেছে ‘নবদিগন্ত’। অনাথ, দুঃস্থ ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের স্কলারশিপ, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যশিবির করা হয়। যেখানে গ্রামের সমস্ত মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। বিনা খরচে রোগী দেখা থেকে আরম্ভ করে ওষুধ বিতরণ হয়। আর এই ব্যবস্থায় অনেককে পাশে পেয়েছেন ফারুক। তেমনই একজন ক্যানিং-এর সৈয়দ মঞ্জুর রহমান। তাঁর ডায়গনস্টিক সেন্টার স্বাস্থ্য শিবিরের সবার বিনামূল্যে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করে। মানুষকে এই সম্পর্কে সচেতন করতে তিনি নিয়মিত সেখানে যান। এমন কর্মকাণ্ড দেখে কেরল ও দিল্লির একটি সংস্থাও এগিয়ে এসেছেন। ফারুকের এই উদ্যোগে প্রভাবিত গোটা গ্রাম। এলাকার ছেলেমেয়েরাই কচিকাঁচাদের পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছে। সহধর্মিণী নিলুফা পারভীন শিক্ষা বিভাগের সমস্তটাই দেখেন। স্বাস্থ্যের দায়িত্ব আনসার মোল্লার কাঁধে।‘নবদিগন্ত’র মাধ্যমে এলাকার বেশ কিছু ছেলেমেয়ের কর্মসংস্থানও হয়েছে।

শুধু কচিকাঁচা নয়, এলাকার অনেকেরই মুশকিল আসান ‘নবদিগন্ত’। কোনও কলেজ পড়ুয়া স্কুলের মাইনে দিতে পারছে না। কারও টিউশনের টাকা দরকার। সেখানেও ‘নবদিগন্ত’। এমনকী স্কুল, কলেজে যাওয়ার জন্যট পোশাকের প্রয়োজন হলেও এই সংস্থা এগিয়ে এসেছে। বয়স্কদের শীতবস্ত্র, ওষুধ, বিনামূল্যে অপারেশন নিজের কর্মস্থলের মাধ্যমে নিখরচায় করিয়ে দেন ফারুক। তাপসী বারিক, শেখ নুরুজ্জামান, রিঙ্কু খাতুনরা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা শিখেয়েই ক্ষান্ত হয় না। তাদের অভিভাবকরাও যাতে সচেতন হন তার জন্য বছরভর নানারকমভাবে ব্যস্ত থাকেন। নির্মল গ্রাম প্রকল্পের মাধ্যমে সেই সচেতনতার কাজ শুরু হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের সঙ্গে খেলাধূলাতেও গুরুত্ব দিয়েছে নবদিগন্ত। এলাকার ছেলেদের নিয়ে ফুটবল ও ক্রিকেট টিম তৈরি হয়েছে। এইসব দেখে আশেপাশের শঙ্করদহ, দেবীতলা, শিরিষতলার মতো গ্রামগুলোও বুঝতে পেরেছে জীবন কতটা বর্ণময়।

‘নবদিগন্ত’র পরশে গত ২ বছরে এলাকায় স্কুলছুটের সংখ্যা কার্যত বন্ধ। নতুন প্রজন্ম স্কুলে আসছে। বদলে যাওয়া পরিবেশের কারিগর ফারুকের স্বপ্ন আরও অনেক অনেক দূরে। তাঁর কথায়, ‘‘ক্লাস ফোর নয়, স্কুলকে এইচএস পর্যন্ত করতে চাই। যেখানে বোর্ডিংও থাকবে। স্থানীয়রা যাতে চাকরির পথ খুঁজে পায় তার জন্য জয়েন্ট এন্ট্রাস, ডব্লুবিসিএসের মতো প্রতিযোগিতামূলক প্রশিক্ষণের ‌ব্যবস্থা সেখানে থাকবে। বিএড কলেজেও করার ইচ্ছে আছে। আর একটা প্রাইভেট হাসপাতাল করতে চাই। যেখানে চিকিৎসার জন্যএ কোনও অর্থ লাগবে না।’’ স্বপ্নের ফেরিওয়ালার মতো শোনায় ফারুকের গলাটা।

অনেক নেই রাজ্যের বাসিন্দা ফারুক নীরবে তাঁর স্বপ্ন বুনে চলেছেন। এই লড়াইয়ে তাঁর সহযোদ্ধা মঞ্জুর রহমানের কথায়, ‘‘এভাবে বিন্দু বিন্দু থেকে একদিন সিন্ধু হবেই।’’ আর সেই স্বপ্নের সিঁড়ি ধরে নিশ্চিন্তে এগিয়ে চলেছেন দুই সুহৃদ।