GST কী? বুঝে নিন আপনার কীসে লাভ

0

দীর্ঘদিন ধরেই গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স নিয়ে বিস্তর জলঘোলা চলছে। ইউপিএ সরকারের আমল থেকেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানেই আটকে আছে অভিন্ন পণ্য ও পরিষেবা কর প্রয়োগ করার বিষয়টি। এবার ফের তেড়েফুঁড়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় সরকার। রাজনৈতিক তর্জাও তুঙ্গে। সংসদের চলতি বাদল অধিবেশনেই পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) বিল পাশ করানো সম্ভব হবে বলে ফের আশা প্রকাশ করেছে কেন্দ্র। যদিও বিল পাশ করানো একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ ফলে অনিশ্চয়তার হার্ডল গুলো থাকছেই। তবুও গোটা দেশের শিল্পমহল এবং শেয়ার বাজার তাকিয়ে আছে জিএসটি-‘গতিপ্রকৃতি’ কোন দিকে যায় সেটা দেখার জন্যেই।

বলা হচ্ছে সব থেকে বড় কর সংস্কারের পথে হাঁটতে চলেছে ভারত। কিন্তু অভিন্ন পণ্য ও পরিষেবা কর চালু হলে জিনিস পত্রের দাম কমবে কিনা সেটাও বুঝে নিতে হবে। পাশাপাশি বুঝে নিতে হবে দেশের মানুষের আখেরে কতটুকু লাভ হতে পারে এই গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্সে। ব্যবসায়ীদেরই বা কোথায় আটকে আছে স্বার্থ!

এখন যে ভাবে রাজস্ব আদায় করা হয় তাতে অনেক ধাঁধা আছে। ঘুরিয়ে নানা অছিলায় ক্রেতাকে কোনও পণ্য বা পরিষেবা পেতে অনেক কর দিতে হয়। যেগুলো চোখেও দেখা যায় না। পরতে পরতে সেই কর চাপানোর পদ্ধতি আদতে জটিলতাই তৈরি করে। সেই জটিলতাকে সরলীকৃত করতেই এই গুডস এন্ড সার্ভিস ট্যাক্স চালু করার কথা ভাবা হয়েছিল। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে এই নিয়ে বিভিন্ন মহলে জল্পনা চলছে। অধিকাংশ উন্নত দেশেই এই ধরণের সরলীকৃত কর কাঠামো আছে। ভারতে প্রাথমিক হার্ডল গুলির মধ্যে ছিল কম্পিউটারাইজেশনের অভাব। এখনও সেই সমস্যা পুরোপুরি ভাবে না মিটলেও অনেকটাই সুরাহা হয়েছে। একটি ছাতার তলায় সমস্ত করকে আনার যে প্রয়াস করা হচ্ছে তাতে ডকুমেন্টেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কোনও সামগ্রী উৎপাদন এবং বিপণনের সময় করের যে কাসকেডিং এফেক্ট পড়ে সেটাও নির্মূল করতে চাওয়া হয়েছে এই জিএসটি চালু করার মধ্যে দিয়ে।

করের কাসকেডিং এফেক্ট ব্যাপারটাও একবার বুঝে নেওয়া দরকার

কোনও সামগ্রী বা পরিষেবার ওপর কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার আলাদা আলাদা ভাবে যে রাজস্ব চাপায় মূলত তাকেই কাসকেডিং এফেক্ট বলে।

এখন কেন্দ্র যে Tax নেয়
1. Income tax
2. Service tax
3. Central sales tax
4. Excise duty
5. Security transaction tax.
এখন রাজ্য যে Tax নেয়
1. VAT/sales tax
2. Octroi কোনও পণ্য শহরে ঢোকার সময় যে কর দিতে হয়
3. State excise,
4. Property tax
5. Entry tax (কোনও পণ্য রাজ্যে ঢোকার সময় যে কর দিতে হয়)
6. Agriculture tax

এই কর কাঠামোয় করের চাপ বাড়ে পণ্যের উপর। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে একটি পণ্যের ওপর বেশ কয়েকবার কেন্দ্র এবং বেশ কয়েকবার রাজ্য কর আদায় করে। ফলে দিনের শেষে জিনিসটির দাম বাড়ে। ক্রেতাকে সেই মূল্য চোকাতে হয়। আর বৈদেশিক রফতানিতে তার প্রভাব পড়ে। বিদেশের বাজারে ভারতীয় পণ্যের দাম বেশি থাকায় ভারতীয় পণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি। অভিন্ন পণ্য ও পরিষেবা কর কাঠামোয় ভারতীয় পণ্যের দাম কমবে। দেশের বাজারে সেটা যেমন মূল্যবৃদ্ধি কমাতে সাহায্য করবে তেমনি বিদেশের বাজারেও তার সুফল ভোগ করবে দেশিয় সংস্থাগুলি।

কিন্তু ভারতে যে ধরণের অভিন্ন পরিষেবা করের কথা বলা হচ্ছে সেটা আসলে ভিন্ন তিন ধরণের পণ্য ও পরিষেবা কর। একটা কর নেবে কেন্দ্রীয় সরকার। অন্যটা নেবে রাজ্য সরকার। সেন্ট্রাল জিএসটি নিয়ে তত সমস্যা নেই। কিন্তু স্টেট জি এসটি নিয়েই যত ঝামেলা। কারণ বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন রকম এসজিএসটি যাতে না হয় তার জন্যে সব রাজ্যকে একমত হয়ে একটি নির্দিষ্ট রেটে পৌঁছতে হবে। একটি রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও একই হার হওয়া জরুরি। যত গোলমাল এখানেই। তাহলে দেখা যাচ্ছে তৃতীয় ধরণের কর যাকে বলা হচ্ছে ইন্টিগ্রেটেড গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স সেটা আন্তরাজ্য আদান প্রদানের জন্যে নেওয়া হবে। একে আইজিএসটি বলা হচ্ছে। এটাও নেবে কেন্দ্রীয় সরকার।

মোদ্দা কথা হল এই নতুন কাঠামোয়, রাজ্যগুলির কর বাবদ আয়কে ক্ষুন্ন না করে এগোতে গেলে আর পাঁচটা দেশের মত একটিই অভিন্ন পণ্য পরিষেবা কর করা সম্ভব নয়। ভারতে কর কাঠামোয় থাকবে তিনটি কর।
A- সিজিএসটি
B- আইজিএসটি
C- এসজিএসটি

তৃতীয়টি শুধু পাবে রাজ্য। বাকি দুটি নেবে কেন্দ্র। মনে করা হচ্ছে এর ফলে দুর্নীতিহীন এবং পরিচ্ছন্ন কর ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে।

রাজনৈতিক মল্লভূমি

গত বাজেট অধিবেশনের সময় কংগ্রেসের তরফে সুনির্দিষ্টভাবে জিএসটি বিলের বর্তমান খসড়ার কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছিল। জিএসটি চালুর জন্য সংবিধান সংশোধনী বিলে করের ঊর্ধ্বসীমা ১৮ শতাংশে বেঁধে রাখার পাশাপাশি শিল্পোন্নত রাজ্যগুলির থেকে বাড়তি এক শতাংশ কর আদায় করার দাবি জানিয়েছিলেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। জিএসটি সংক্রান্ত বিবাদগুলির মীমাংসার জন্য পৃথক প্রতিষ্ঠান গড়ার দাবিও ছিল। বিজেপির বক্তব্য প্ৰথম যখন জিএসটির খসড়া তৈরি করেছিল ইউপিএ তখন তো করের ঊর্ধ্বসীমার উল্লেখ ছিল না। তাহলে এখন কেন কংগ্রেস এই দাবি করছে।

জিএসটি নিয়ে চাপ বাড়াতে এখন বণিকসভাকেও কাজে লাগাচ্ছে সরকার। বণিকসভার প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যেই রাহুল গাঁধী ও পি চিদম্বরমরে সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গেও আলাদা করে বৈঠক করছেন জেটলি।

আরও দুটি বিষয়। এক, করের হার কত হলে রাজ্যের রাজস্ব ক্ষতি হবে না তার হিসেব কষা। আর দুই, দ্বন্দ্ব এড়িয়ে কর বসানোর উপর কেন্দ্র ও রাজ্যের অধিকার বেঁধে দেওয়া। যে সব সংস্থার ব্যবসার পরিমাণ বছরে দেড় কোটি টাকার কম, তাদের উপর শুধু রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে এই দাবি তোলা হয়েছিল। সম্প্রতি দিল্লিতে ‘এমপাওয়ার্ড কমিটি’র সঙ্গে বৈঠকে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি এই সিদ্ধান্ত মেনেও নিয়েছেন।

এদিকে তৃণমূল কংগ্রেস প্রথম থেকেই জিএসটিকে সমর্থন জানিয়ে এসেছে। কিন্তু সরকার প্রস্তাবিত বিলে নতুন যে প্রস্তাব এনেছে, তাতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেজায় বিরক্ত। দিল্লি গিয়ে সেই ক্ষোভের কথা মমতা নিজেই জানিয়ে এসেছেন। তাঁর সাফ কথা, রাজ্যের এক্তিয়ার কমালে এই বিল সমর্থন করা সম্ভব হবে না। পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তি আপাতত মেনেও নিয়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার।