মুসলমান মেয়েরা দর্জির কাজ করছেন, তবে পুরুষের পোশাক তৈরি মানা

1

মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ আর্থ-সামাজিকভাবে প্রতিবেশী হিন্দু জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সংয়স্থা প্রতীচী ও অ্যাসোসিয়েশন স্ন্যাপ অ্যান্ড গাইডেন্স গিন্ডের করা একটি সমীক্ষার ফলাফল এ ব্যাপারে ‌উদ্বেগজনক। এই রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ভিতর ২৭.১ শতাংশ মানুষ মুসলমান সম্প্রদায়ের। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, তাঁদের ভিতর সাক্ষরতার হার রাজ্যের গড় সাক্ষর মানুষের তুলনায় ৭ শতাংশ ‌কম। তাছাড়া, স্বাস্থ্য-সহ অন্যান্য আর্থ-সামাজিক সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষজন।

এই পরিস্থিতিতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ কীভাবে যে দিনযাপন করছেন, সেটা সহজেই অনুমেয়। প্রতিদিনের জীবন তাঁদের কাটছে নানান বঞ্চনায়। কিন্তু, মানুষ বেঁচে থাকতে চায়। সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্খা যে কোনও মানুষের কাছেই একটি মানবিক চাহিদা। গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ কষ্টেসৃষ্টে কোনওক্রমে দিনযাপন করছেন যেমন, শহরাঞ্চলের অবস্থাও তথৈবচ। প্রতীচী ও অ্যাসোসিয়েশন স্ন্যাপ অ্যান্ড গাইডেন্স গিল্ড এই রাজ্যের শহরাঞ্চলের মোট ৭৫টি ওয়ার্ডে বসবাসকারী মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর যে সমীক্ষাটি চালিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, ওঁরা ভালো নেই। বরং, দিনগত পাপক্ষয় করে কোনওক্র‌মে বেঁচেবর্তে আছেন।

পুরুষদের অবস্থাই যখন তলানিতে, সেই পরিস্থিতিতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মেয়েদে‌র অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

কলকাতা পুরসভার ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কলাবাগান বস্তিতে বসবাস করেন মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ। এই ওয়ার্ডের ভোটার সংখ্যা ১৫ হাজার ৭০০জন। আর্থ-সামাজিকভাবে এই ওয়ার্ডটি ‌কলকাতার পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলির ভিতর অন্যতম। অধিকাংশ পরিবারই দিন গুজরান করছেন দারিদ্ৰ্য সীমার নীচে। পুরুষেরা বেশিরভাগই মিস্ত্রি অথবা দিন আনা দিন খাওয়া কাজের সঙ্গে যুক্ত। এই ওয়ার্ডের বাসিন্দা মহিলাদের একটা বড় অংশ দীর্ঘকাল পর্দানসীন জীবনযাপন করেছেন। বর্তমানে তাঁরা লড়াই করছেন জীবনটাকে পাল্টে দেওয়ার জন্যে।

প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০জন মেয়ে সরকারি প্রকল্পে দর্জির কাজ শিখে সামান্য হলেও আয় করছেন। পুরসভার টেলারিং প্রকল্পের সহায়িকা হামিদা জালাল জানালেন, দর্জির কাজ শিখে ঘরে বসে মেয়েরা দৈনিক অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। তাতে সংসারের কিছুটা হলেও সুরাহা হচ্ছে।

কলাবাগান বস্তির বাসিন্দা মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষজনও প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ তেমন পাননি। বলাবাহুল্য, এর কারণ হল অপরিসীম দারিদ্র্য। ফলে, একটা সময়ের পর এ তল্লাটের মুসলমান মেয়েরা যখন দারিদ্ৰ্যের কবল থেকে মুক্তি চাইছেন, সেই পরিস্থিতিতে সরকারি প্রকল্পে দর্জির কাজ শেখার সুযোগটুকু ওঁদের কাছে খড়কুটো আশ্রয় করে প্রাণ বাঁচানোর প্রয়াসের মতোই।

বস্তিতে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ গাদাগাদি করে বসবাস করেন। ঘর বলতে দশ ফুট বাই দশ ফুটের কোনওমতে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই। একএকটি পরিবারে অন্ততপক্ষে ছয় থেকে সাতজন সদস্য।

সুযোগের অভাবে ওঁরা কেউই মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারা মানুষ। বর্তমানে বস্তির মেয়েরা এই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে মাথা তুলে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে নেমেছেন। পরবর্তী প্রজন্মের মুসলমান মেয়েদের কাছেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। স্থানীয় কাউন্সিলর ‌জসিমুদ্দীন জানালেন, দর্জি‌র কাজ শিখে মেয়েদের অনেকেই কিছুটা স্বনির্ভর হয়েছেন। প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরে বেশ কিছু মেয়ে পোশাক তৈরির বিভিন্ন সংস্থা থেকে চাকরির ডাকও পেয়েছেন।

কিন্তু, বাধা এখানে মান্ধাতার আমলের রক্ষণশীলতা। ঘরের মেয়েরা দিনে আট থেকে দশ ঘণ্টা কারখানায় চাকরি করতে যাবেন, এটা এখনও পরিবারের বয়স্ক পুরুষেরা বরদাস্ত করছেন না বলে জানালেন হামিদা বিবি। বরং, পরিবারের পুরুষ অভিভাবকেরা সাত তাড়াতাড়ি মেয়েকে বিয়ে দিয়ে পার করানোর জন্য ব্যস্ত।

তবুও মেয়েরা লড়ছেন। কেউ কেউ স্বামীকে সহায়তা করবার জন্যে পুরসভার দেওয়া সেলাই মেশিন ঘরে বসিয়ে কাজ ক‌রেন। এঁদেরই একজন ফাতিমা বিবি। দুই নাবালক সন্তানের মা ফাতিমা গৃহস্থালীর কাজকর্ম সামলে এটা-ওটা সেলাই করেন। ফাতিমা জানালেন, একাজে দিনে ১০০ টাকার মতো রোজগার তাঁর হয়ই।

আফরোজা এ তল্লাটে একটি দৃষ্টান্ত। ছোট্ট ঘরের এককোণায় বসে নতুন মেয়েদের সেলাই শেখান আফরোজা। এ বাবদ ছাত্রীদের কাছ থেকে মাস গেলে সামান্য টাকা মাইনে পান। অবসর সময়েও নিজেও সেলাই করেন।

বছর পঁচিশের হাসিখুশি আফরোজা এখন এপাড়ার সেলাই দিদিমনি। প্রায় দশ পনেরোজন মেয়েকে সপ্তাহে দুদিন সেলাই শেখান। স্কুলের পড়া শেষ করার পরে আফরোজা অর্থাভাবে আর লে খাপড়া চালাতে পারেননি। বিয়ে করতেও নারাজ তিনি। নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে বিয়ে করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন।

আফরোজার কথায়, বিয়ে করলেই তো শুধু ছেলেমেয়ে মানুষ আর স্বামীর যত্ন নেওয়ার নামে ঘরসংসারের জোয়াল ঠেলতে হবে। মা-দাদিমার পুরনো জীবনটা আমি কাটাতে চাই না।

বিলকিস, রুকসানাদেরও তাই মত। তবে, গোঁড়ামি এখনও নির্মূল করা যায়নি। যে সমস্ত মহিলা দর্জির কাজ করছেন, মাস গেলে তাঁদের দ্বিগুণ-তিনগুণ বা তার চেয়েও বেশি আয়ের সম্ভাবনাটুকু রক্ষণশীলতার কারণে আটকে গিয়েছে। কেননা, কেবলমাত্র মেয়েদের পোশাক তৈরির অনুমতিই মিলেছে পুরুষ অভিভাবকদের কাছ থেকে। ফলে, পুরুষের পোশাক তৈরি করতে জানলেও মেয়েদের হাত-পা বাধা।

এই শিকলগুলিও এ পাড়ার মুসলমান মেয়েরা একদিন ভেঙেচুরে ফেলবেন নিশ্চয়ই!