চেন্নাইয়ে দুর্গতদের পাশে স্টার্টআপ পরিবার

0

চেন্নাইয়ের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ত্রাণ নিয়ে হাজির শুরুয়াতি সংস্থাগুলি। শুধু ব্যবসার খাতিরে নয়। সামাজিকতার টানেও ছক ভেঙে হাত বাড়িয়েছে বিভিন্ন সংস্থা।

অনেক সময় দেখা যায় ফিল্ম স্টারেরা রাস্তা ঝাঁটা হাতে স্বচ্ছ ভারতের ডাকে লেগে পড়েছেন। কখনও বা সেলেব্রিটিরা অনাথ আশ্রমে বা রেড লাইট এলাকা গুলোয় মানবিক মুখ নিয়ে হাজির। আমরা বলি বটে সবই পাবলিসিটি স্টান্ট। কিন্তু সেবা করাটা তাতে মিথ্যা হয়ে যায় না।

এই সময় চেন্নাইয়ের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ফুটে উঠলো ব্যতিক্রমী এক ছবি। গোটা শহর জলমগ্ন। মানুষের কপালে ভাঁজ। প্রাণ হারিয়েছেন শতিনেক। এখনও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন আরও কয়েকশ। এরকম কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে সরকার ও বিভিন্ন NGO র পাশাপাশি বেশ কিছু স্টার্ট-আপ এগিয়ে এসেছে। নিজেদের মতো করে বন্যা দুর্গতদের পাশে থাকার চেষ্টা করছে।

দিল্লীর স্টার্ট-আপ Socialcops-কে দেখলাম স্থানীয় ভূমি নামের একটি NGO র সঙ্গে ত্রাণের কাজে লেগে পড়ল। ওদের প্রযুক্তি দিয়ে বের করে দিল সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তথ্য। সংস্থার সহপ্রতিষ্ঠাতা পি শঙ্কর বলেছেন, কোন এলাকায় কী ধরণের ক্ষতি হয়েছে, কীভাবে সমস্যার সমাধান হবে, এসব তথ্য দিয়ে ভূমির স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য একটি live মানচিত্র বানানো হয়েছিল। ভূমি এই মানচিত্রের সাহায্যে সেইসব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছনোর চেষ্টা করেছে।

"সঠিক তথ্য এবং রসদ যখন বড় সমস্যা তখন স্টার্ট-আপ তাঁদের প্রযুক্তিবিদ্যার স্মার্টনেস ও দক্ষতা কাজে লাগাতে পারেন",বললেন উত্তরাখণ্ড ও নেপাল ত্রাণকার্য্যে গুঞ্জের সঙ্গে কর্মরত চন্দন শর্মা। Logistics কোম্পানিগুলি যাতায়াতের যান ও ফার্মেসিগুলি ওষুধ দিয়ে সাহায্য করতে পারেন। গুঞ্জ এখন প্রতিটি শহরে আরও স্বেচ্ছাসেবকের জন্য ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে।

অনলাইন ট্যাক্সি বুকিং সংস্থা ওলা বন্যাদুর্গতদের জন্য নৌকার ব্যবস্থা করে আগেই শিরোনামে উঠে এসেছে। এবার তাঁরা সমস্যা পীড়িত মানুষদের ‘safety zones’ পরিষেবা দিচ্ছেন। অম্বাটুরের ঊষারাণী ম্যারেজ হল ও ওয়ালটেক্স রোডের সত্যনারায়ণ ভবনে দুর্গতদের আশ্রয়,খাদ্য ও প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসার বন্দোবস্ত করেছে। পিছিয়ে নেই ওলার প্রতিযোগী উবেরও। তাঁরা শহরে বিভিন্ন প্রান্তে বিনামূল্যে রাইডের ব্যবস্থা করেছে। 

বন্যা দুর্গতদের খাদ্য সমস্যার সমাধানে পাশে আছে জমাটো-ও। একটি মিল কেনা হলেই একটি মিল তাঁরা ফ্রিতে বানভাসিদের দেবেন। এভাবে জোমাটো বন্যার তৃতীয় দিন বিকেল পাঁচটা অবধি ২০,০০০ অর্ডার পেয়েছেন। ৪০,০০০ এর বেশি মিল তাঁরা দুর্গতদের দিতে পেরেছেন। সংস্থার এক সদস্য আশা করেন এভাবে প্রায় ১,০০,০০০ মানুষের মুখে আহার দিতে পারবেন। জোমাটো Chennai Volunteers, Robinhood Army and Delhivery নামের একটি NGO -র সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিভিন্ন এলাকার বন্যায় আক্রান্তদের খাবার পৌঁছে দিচ্ছে।

ই কমার্স কোম্পানি পেটিএম ও বসে নেই। চেন্নাই শহরের স্থানীয় মোবাইল নম্বরগুলিতে ফ্রিতে ৩০ টাকার টক-টাইম ভরে দেবার অফার দিচ্ছে ওরা। তাঁদের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট শঙ্কর নাথের মতে প্রত্যেক স্থানীয় উপভোক্তার মোবাইলে ২/৩ টে কল করার মতো টকভ্যাল্যু যেন থাকে। মানুষের নিকটজনেরা যাতে জানতে পারেন তাঁরা ভালো আছেন,নিরাপদ আছেন। তিনি একথাও বলেন পে টি এম বিষয়টির অপব্যবহার নিয়ে চিন্তিত নয়। BSNL ( Bharat Sanchar Nigam Limited) এগিয়ে এসেছে তাদের নিজস্ব ভঙ্গিমায়। জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এক সপ্তাহ কোনও কল চার্জ ধার্য হবে না। এয়ার টেল ফ্রিতে ৩০ টাকার টক-টাইম এবং দুদিনের ৫০ এম বি নেট ডাটা দিয়েছে।

হেলথ কেয়ার সংস্থা প্র্যাক্টো চিকিৎসক ও হাসপাতালের তালিকা বানিয়েছে। মানুষ এখানে বিপৎকালীন সুচিকিৎসা পেতে পারবেন। বন্যা পরিস্থিতিতে রোগের প্রকোপ যাতে না বাড়ে সেটা রুখতে স্টার্ট-আপ সংস্থাগুলি সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। অনলাইন পরিষেবা সংস্থা UrbanClap পেস্ট কন্ট্রোল পরিষেবা দিয়েছে। ডেঙ্গু,ম্যালেরিয়া বা চিকুনগুনিয়া যাতে না ছড়ায় সেদিকে নজর দিয়েছে UrbanClap। সংস্থার সহপ্রতিষ্ঠাতা অভিরাজ বল বলেন, তাঁদের পার্টনারদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিনামূল্যে পেস্ট কন্ট্রোল পরিষেবা দিতে চেষ্টা করছেন।

Housejoy হোম সার্ভিস সংস্থা। এঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্র যেমন ওয়াশিং মেশিন, ফ্রিজ বা প্লাম্বিং এর জিনিষপত্র চেকআপ করছেন। এঁদের ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী কর্মী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা মাদিপাক্কম, ভেলাচেরী, পাল্লিকারানায়, মেদাভাক্কম, আদয়ার, কোট্টুরপুরম এবং বালেশ্বরভক্কম এ কাজ করছেন।

সফটওয়্যার স্টার্ট-আপ কোম্পানি Freshdesk তাঁদের কর্মীদের পাশে আছেন। আভ্যন্তরীণ সফটওয়্যার প্রযুক্তি দিয়ে আগে তাঁরা প্রতিটি কর্মীর নিরাপত্তা বিষয়ে খবর নিয়েছেন। সব কর্মীর প্রাতরাশ, দুপুরের ও রাতের খাবার দিচ্ছেন। অফিস সারাদিন খোলা। প্রয়োজনে কর্মীরা অফিসেই থাকতে পারেন এরকম ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন ওরা। স্থানীয় এলাকায় Freshdesk এর কর্মীরা ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন। যাঁদের বাড়ি শুকনো এলাকায় তাঁরা বন্যাপীড়িত সহকর্মীদের আশ্রয় দিয়েছেন।

হয়তো কিছু মানুষ বিষয়গুলোকে মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি বা হুজুক বলে উড়িয়ে দেবেন। তবে ইওর স্টোরি স্টার্টআপদের এই সেবা করার মানসিকতাকে কুর্নিশ জানায়।