দিগন্তের খোঁজে এক ভারতীয় নারী

কারনেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্ক জুকারবার্গের সঙ্গে একবার দেখা করার সুযোগ হয়েছিল মণীষা রাইসিংঘানির। সেখানে মার্ক তাঁর সহকর্মী সেরিল স্যানবার্গের সম্বন্ধে কিছু কথা বলেন। পরে উওমেন লিডারশিপ নিয়ে সেরিলের একটি বক্তৃতা শুনে মণীষার মনে তথ্য প্রযুক্তি শিল্প জগতে নিজে কিছু করার ইচ্ছে জন্মায়। সেই ইচ্ছেই আজ তাঁকে লজিনেক্সট সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতার মর্যাদা দিয়েছে।

0

তথ্য প্রযুক্তি শিল্প মানেই পুরুষ আধিপত্য।মণীষার মতে, এমন একটা বদ্ধমূল ধারণা আছে। ফলে লজিনেক্সটের পুরুষ প্রতিষ্ঠাতাকেই সকলে প্রথমদিকে সংস্থার একমাত্র মালিক বলে মনে করত। দুই মহিলা শিল্পোদ্যোগী আইবিএমের সিইও জিন্নি রোমেটি ও সেরিল স্যানবার্গের আদর্শে অনুপ্রাণিত মণীষাকে এই ধারণা বদলাতে কম লড়াই করতে হয়নি। কিন্তু কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে একদিন নিজের সংস্থা লজিনেক্সটে নিজের সঠিক জায়গা তৈরি করে নেন মণীষা।

মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস কের বার হওয়ার পর মাসটেক সংস্থায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে যোগ দেন মণীষা। কিন্তু ছমাসের মধ্যেই মণীষা বুঝতে পারেন এই কপোর্রেট দুনিয়ায় সারাজীবন তাঁর পক্ষে চাকরি করা সম্ভব নয়। ইনফরমেশন সিস্টেম সম্বন্ধে মুন্সিয়ানা বাড়াতে মণীষা এ বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পূর্ণ করেন কারনেগি মেলন থেকে। কারনেগি থেকে পাস করে মণীষা যোগ দেয় ওয়ার্নার ব্রাদার্সের আইটিউনের ডাটা অ্যানাইলিটিকস হিসাবে। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় ধ্রুভিলের। যিনি পরবর্তীকালে লজিনেক্সটের অপর মালিক হন। ২০১৩ সালে একদিন নিউইয়র্কের একটি কফিশপে ধ্রুবিলের সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে লিজিস্টক ব্যবসার নানা সমস্যা নিয়ে মণীষার দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়। সেখানেই এই দুই ইঞ্জিনিয়ার একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হন। দুজনেই একমত হন যে এই সমস্যা মেটানোর জীয়নকাঠি লুকিয়ে আছে ইন্টারনেটে। সেই ভাবনা থেকেই তাঁরা প্রথম তাঁদের ব্যবসার উদ্যোগ শুরু করেন মার্কিন মুলুকে।

এর পরের বছর ২০১৪ সালে মার্কিন মুলুক ছেড়ে ভারতে ফিরে আসেন মণীষা। মণীষার মতে, তখনও মহিলারা এই দুনিয়ায় খুব কমই সামনে আসছেন। কারণ হিসাবে তাদের সঠিক পরামর্শদাতার অভাব এবং স্কুল জীবন থেকেই মেয়েদের তথ্য প্রযুক্তির বিষয়ে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে খামতিকে তুলে ধরেছেন তিনি। কিন্তু এসবের উর্দ্ধে উঠে লজিস্টিক ব্যবসায় ক্রমশ সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকেন মণীষা‌। তাঁর নিজের উপলব্ধীর কথা জানাতে গিয়ে মণীষা বলেন, সেই সময়গুলোয় খুব খারাপ লাগত যখন বিভিন্ন সংস্থার বড়কর্তাদের সঙ্গে তাঁকে বৈঠক করতে হত। কারণ ওসব বৈঠকে প্রায়শই কোনও মহিলাকে পেতেন না তিনি। এটা তাঁকে অবাক করত, নিরা‌স করত। তাই নিজের সংস্থায় কাজ করা মহিলাদের মণীষা নেতৃত্বের ভূমিকায় দেখতে পছন্দ করতেন। তারা নিজেরা কোনও ব্যবসা শুরু করছে দেখলে এখনও খুশি হন মণীষা।পাশাপাশি লজিনেক্সটের পুরো টিমটাকে নিয়ে কাজ করার সময় কখনও বস হিসাবে নয়, বরং নেতা হিসাবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন মণীষা। যা তার টিমকে আরও ভাল কাজ করায় উৎসাহ জুগিয়েছে। মণীষার মতে, সবসময়েই তাঁর চেষ্টা থাকে তাঁর টিম যেন কোনও সুযোগ হাতছাড়া না করে। এজন্য তাদের যথেষ্ট ‌ও পেশাদার হিসাবে তালিম দেন তিনি।

আগে দেশ ছেড়ে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে প্রতিভাবানরা বিদেশে চলে যেতেন। এখন সময় বদলেছে। এখন বহু পেশাদার প্রযুক্তিবিদ ফের দেশে ফিরছেন। এঁদের মধ্যে অনেকেই নতুন ব্যবসা করতে ভারতে ফিরে আসছেন। তাই লজিনেক্সটকে সফল্যের চূড়ায় নিয়ে যেতে সেরা প্রযুক্তিবিদদের সংস্থায় চাকরি দিয়ে থাকেন মণীষা। অনেক সময়ে দেশের বাইরে থেকেও প্রতিভাবানদের তুলে আনেন নিজের সংস্থায়। এক্ষেত্রে তাঁদের দেশে ফেরার ইচ্ছেটাকে সম্পূর্ণ কাজে লাগান মণীষা।

ভবিষ্যতে মণীষা চান তাঁর সংস্থা লজিনেক্সটকে এমন একটা জায়গায় তুলে নিয়ে যেতে যেখানে এক ছাদের তলায় মিটবে যাবতীয় লজিস্টিকস প্রযোজন। শুধু দেশে নয়, সারা বিশ্বের একটা ওয়ান স্টপ দোকান হিসাবে লজিনেক্সটকে প্রতিষ্ঠিত করাই ‌মণীষার আগামী লক্ষ্য।

Related Stories