এফ ১৬ এর ডিসপ্লে ডিজাইনার এখন অনলাইন চাওয়ালা

0

পূর্ব দিল্লির ব্যস্ত বাজার এলাকার পাশেই এক নিরিবিলি গলি, সেখানে এক সাধারণ দেখতে ছোট দোকান। এই দোকানেই গত তিনবছর ধরে, সপ্তাহের সাতদিন চায়ের স্বাদ ও ঘ্রাণ নিয়ে কাজ করে চলেছেন অভিজিত মজুমদার।


১৮ বছর ধরে টানা ইনস্ট্রুমেনটেশন ও ডিজাইন শিল্পে কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে কাজ করার পর অভিজিত ঠিক করেন অন্যের জন্য আর কাজ করবেন না তিনি। “আমি আর আমার বন্ধু প্রথমেই ভাবি খাবারের কথা। শহরের নানারকমের খাবারের খোঁজ চালাই আমরা। দুবছর ধরে প্রতি সপ্তাহান্তে দিল্লির নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম, দেখতাম নতুন কী খাবার পাওয়া যাচ্ছে? কিয়স্কগুলিতে কী পাওয়া যায়? সেগুলির মানুষ কতটা পছন্দ করছে?” বললেন অভিজিত।

তিনি আরও জানান, “আমরা দেখি নানাধরণের খাবার পাওয়া যায়, মুখরোচক খাবার, নতুন স্বাদের খাবার, রয়েছে কফিশপ। কিন্তু চায়ের ক্ষেত্রে একটা ফাঁক দেখতে পাই আমরা। চা ভারতীয়দের কাছে খুবই প্রিয় এক পানীয়, কিন্তু ঘরে তৈরি চা খাওয়ার সুযোগ মেলে হয় বাড়িতে নয়তো রাস্তার চায়ের দোকানে। কফিশপ থাকলে চায়ের লাউঞ্জ কেন নয়? এর থেকেই চা লাউঞ্জ খোলার কথা ভাবি আমরা”।

অভিজিতের শেষ চাকরি স্যামটেলে। সেখানে এফ ১৬, এয়ারবাস ইত্যাদির সিআরটি ডিসপ্লে ডিজাইন করতেন তিনি। কাজের সূত্রে পরিচয় চীন ও জাপানের মানুষদের সঙ্গে, তাঁরা উপহার হিসেবে নিয়ে আসতেন চা। এভাবেই তাঁদের সংস্কৃতি ও পরম্পরার একটি অংশকে নতুন দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাইতেন তাঁরা। এইসব উপহার পাওয়া চায়ের সম্ভারে ভরে উঠছিল অভিজিতের ঘর। “আমার সহকর্মীরা আমার এই চায়ের সম্ভারে অভিভুত ছিল ও প্রায়ই আমার কাছে চা খেতে চাইত, আমিও সানন্দে চা করে খাওতাম তাদের। চা লাউঞ্জ সম্পর্কে ভাবনা চিন্তা করার সময় এই বিষয় আরও বেশি পড়াশোনা শুরু করি আমি”, বললেন অভিজিত।

পূর্ণ সময়ের চাকরি ছেড়ে কনসালট্যান্ট হিসেবে স্যামটেলে কাজ করতে থাকেন অভিজিত, সঙ্গে চালিয়ে যান চা বিষয়ক পড়াশোনা। নানাধরণের চা সংগ্রহ করে সেই সম্পর্কে গবেষণা চালাতে থাকেন। নিউ গ্লেনেকোর শিব সারিয়া ও মিত্তল টী’স-এর বিক্রম মিত্তলের কাছে সাহায্য পান এ বিষয়। অবশেষে স্যামটেলের চাকরি ছেড়ে নিজের ব্যবসা শুরুর উদ্যোগ নেন। পূর্ব দিল্লির বাজারে লাউঞ্জ তৈরির জায়গাও পেয়ে যান, বন্ধুর সঙ্গে মিলে জুটিয়ে ফেলেন বিনিয়োগও।

কিন্তু পরিকাঠামোগত সমস্যার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবসা শুরু করা সম্ভব হয়না। কিছুদিনের চেষ্টার পর লাউঞ্জ তৈরির পরিকল্পনা ঝেড়ে ফেলে ঠিক করেন চা বিক্রি করবেন। মিত্তল টী’স এর বিক্রম মিত্তল তাঁকে বাজারে পরিচিতি দিতে সাহায্য করেন, এবং তাঁর দোকানে চা সরবরাহ করতে বলেন অভিজতকে। পাইকারি সরবরাহের পাশাপাশি খুচরো বিক্রিও শুরু করেন অভিজত। বেশ কয়েকজন বিশ্বস্ত বন্ধু জোগাড় করে ফেলেন অভিজিত, কেউ তাদের প্রয়োজনীয় চা কিনতে আসেন তো কেউ ওলংয়ে চুমুক দিতে দিতে অভিজিতের সঙ্গে গল্প করতে।

ক্রেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে ক্ষমতাই সবথেকে বড় সম্পদ অভিজিতের, এই ক্রেতারাই হয়ে ওঠেন তাঁর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডর। বিভিন্ন ধরণের চা, সেগুলি রাখার পদ্ধতি, নানা খাবারের মেল বন্ধন ইত্যাদি নিয়ে পরামর্শ দেন অভিজিত। এই ক’বছরে বিশ্বস্ত ক্রেতার সংখ্যাটা ক্রমেই বেড়েছে। “একটি জাপানি পরিবার প্রতি মাসে তাঁদের প্রয়োজনীয় চা কিনতে আসতেন আমার কাছে”, জানালেন অভিজিত।

খুচরো ও পাইকারি বিক্রির পাশাপাশিই অনলাইনও চা বিক্রি শুরু করেছেন অভিজিত, পোর্টালের নাম, ‘চায়েওয়ালা’। আমাজনের মতো অনলাইন পোর্টালের সঙ্গেও ব্যবসা শুরু করেছেন অভিজিত। এই সব কিছুর মধ্যেই আগামী বছরই নিজের চা লাউঞ্জ শুরু করার পরিকল্পনা করে চলেছেন তিনি।

নানা ভেষজ চা বিক্রি করেন অভিজত, সেগুলি নিয়ে পড়াশোনা করেন আরও বেশি। অভিজিত বললেন, “ভেষজ চায়ের নানা রোগ সারানোর ক্ষমতা রয়েছে, এটা জানার পরই আমি এই নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি, এবং প্রাকৃতিক চিকিত্সা হিসেবে এগুলি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিই। বর্তমানে কুসুম ফুল ও Borago officianalis নিয়ে কাজ করছি আমি। অন্ত্রের সমস্যায় অসাধারণ কাজ দেয় কুসুম ফুল, প্রাকৃতিক জোলাপের কাজ করে, হজমে সাহায্য করে ও গর্ভ পরবর্তী কালে সেরে ওঠায় কার্যকরী ভূমিকা নেয়। Borago officianalis এক ধরণের নীল পাপড়ির ফুল ও প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপ্টিক, কিন্তু ভারতে খুবই কম পাওয়া যায়। বেশিরভাগ ট্যালকম পাউডার ও অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম তৈরিতে ব্যবহার হয় এই ফুল।

নানা বিরল প্রজাতির ফুল কিনে তা চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাচ্ছেন অভিজিত। এই কাজে আয়ুর্বেদিক চিকিত্সককেও নিয়োগ করেছেন তিনি।

অভিজিত জানালেন, “আমরা প্রাকৃতিক পাতা চা ব্যবহারে উত্সাহিত করি এবং বিভিন্ন ভেষজ ও মশলা চায়ের বিষয় তাঁদের জানাবার চেষ্টা করি। সৌরেন, নামরিং, গোপালধারা, সুংমা ইত্যাদি চা নিলাম কেন্দ্র ও এস্টেটগুলির ওপর চা আমদানির জন্য নির্ভর করেন এই চা ওয়ালা। এছাড়া দেশ বিদেশের নানা জায়গা থেকে চা নিয়ে আসেন তিনি।বিদেশে তাঁর যোগাযোগের ফলে মা’চা, পু’য়ের, ফার্মোসা, ব্লুমিং টির মতো উচ্চমানের চা নিয়ে এসে সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রি করতে পারেন তিনি।

লেখা-ইন্দ্রজিত ডি চৌধুরি

অনুবাদ-সানন্দা দাশগুপ্ত

Related Stories