প্রসঙ্গ কাশ্মীর, প্রাসঙ্গিক সেনাপ্রধান

আলোচনা করলেন আশুতোষ, সাংবাদিক এবং এএপি নেতা

0

সেনাপ্রধানের মন্তব্যকে দুভাবে দেখা যায়। যারা পাথর ছুঁড়েছেন সেনা প্রধান তাঁদেরকে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে আখ্যা দেওয়ার কথা বলছেন। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। আসলে সেনাপ্রধান তাঁর মন্তব্যের মাধ্যমে সেনা বাহিনীর নৈতিক মনোবল বাড়িয়ে তুলতে চেয়েছেন। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু সেনার মনোবল বৃদ্ধিতে এই মন্তব্য করেছেন সেনা প্রধান। প্রসঙ্গত, গত দুবছরে বিবিধ সংঘর্ষে তুলনায় দ্বিগুণ সংখ্যক সেনার মৃত্যু হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কৌশল পরিবর্তন। বর্তমানে সেনা তাঁর নমনীয় মনোভাবও পাল্টাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আইনভঙ্গ করছেন যাঁরা তাঁদের কাউকেই ক্ষমা প্রদর্শন করা হবে না। অন্যদিকে, রাজনীতিকরা বিষয়টি নিয়ে গোলমাল পাকানোতে বিষয়টি জটিল আকার নিয়েছে। অন্যদিকে, টেলিভিশন চ্যানেলগুলিও বিষয়টিতে নাক গলিয়েছে।

আমরা সকলেই আমাদের দেশের সেনা বাহি‌নীর জন্যে গর্ব অনুভব করি। দেশের পক্ষে যে কাজ চলছে যে সম্পর্কে আমরা সকলেই সচেতন। আমরা যে শান্তিতে ঘুমাতে পারছি তার কারণ হল, আমরা নিশ্চিতভাবেই জানি, কেউ কেউ আমাদের জন্যে লড়াই করছেন। এজন্যেই সেনাবাহিনী সম্পর্কে প্রতিটি মন্তব্য আমা্দের গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত। এই ব্যাপারটি স্পৰ্শকাতরতা ও সময়োপযোগী দাবিগুলি দিয়েই বিবেচনা করা উচিত। সেনাপ্রধান তাঁর অধিকারের জায়গা থেকেই এ মন্তব্য করেছেন। তিনি যা সঠিক বলে বিবেচনা করেছেন সেই মন্তব্যই করেছেন তিনি। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধঘোষণা করেছেন। তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা খুব ভালোমতোই জানেন, দেশের পক্ষে কোন পদক্ষেপ মঙ্গলের হবে। তাছাড়া, ওঁরা জানেন সীমান্ত বরাবর সন্ত্রাসবাদকে মোকাবিলা করতে হলে কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্ত রাজনীতিক ও সাংবাদিকদের অন্য আর একটি কর্তব্য আছে - যা কিনা সেনার কর্তব্য থেকে পৃথক।

সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ অধিকার আছে কাশ্মীর ইস্যুটিকে সাদা ও কালো হিসাবে দেখার। কিন্ত বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের একাংশ এ কাজটি করতে সম্মত নয়। কাশ্মীর ইস্যুটিকে সাদাকালোর উর্ধ্বে এক ধূসর বিষয় হিসাবে দেখাটাই ঠিক হবে। এটি গভীরভাবেই এক জটিল বিষয়। কাশ্মীর সমস্যা বুঝতে হলে আমাদের দেখে নিতে হবে অতীতকে। দেখতে হবে কাশ্মীর ঘিরে কী ধরনের রাজনীতি চলেছে। দেখতে হবে অতীতের ঘটনাবলীও। ১৯৪৭ সালে দেশকে যখন স্বাধীন হিসাবে ঘোষণা করা হল – সেইসময়ে কাশ্মীর ভারতের অন্তর্গত ছিল না। কাশ্মীর ছিল মুসলমান অধ্যুষিত রাজ্য। কিন্ত এটি হিন্দু রাজা হরি সিংয়ের শাসনাধীন ছিল।

এটাও বুঝতে হবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতারা অনুমান করেছিলেন কাশ্মীরকে পাকিস্তানের অন্ত র্গত করা না হলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল তত্ত্বটি অবহেলিত থেকে যেত। কাশ্মীরকে এক্ষেত্রে পাকিস্তানের অন্তর্গত করাটাও জরুরি ছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে পাকিস্তানের দাবি ওঠে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। এই তত্ত্বের স্বপক্ষে যুক্তি ছিল, হিন্দুইজম ও ইসলাম দুটি ভিন্ন সংস্কৃতি। ফলে দুটি একত্রে মিশ খাবে না। এর ভিত্তিতে মুসলমানের সংখ্যাধিক্যের জেরে পাকিস্তানের দাবি তোলা হয়। বাকি অংশ ভারতে থাকবে। সেই হিসাবেই পাকিস্তানের জন্ম হয়। মূল পাক ভূখণ্ড থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানও (অধুনা বাংলাদেশ) এর অন্তর্গত হয়। কিন্ত কাশ্মীর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জিন্নার লাইন তাঁরা অনুসরণ করবে না। সেইসঙ্গে এই সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় যে, কাশ্মীর পাকিস্তানে যোগ দেবে না। এটা অবশ্য পাকিস্তানের নেতাদের অনুমোদিত ছিল না।

দেশভাগের পরে পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করে। এজন্যে দায়ী ছিল পাক সেনাই। সেইসময় পাক রেঞ্জাররা কাশ্মীর বিমানবন্দরে ঢুকে পড়েন। সেইসময়ে রাজা হরি সিং ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমর্থন চান। ভারত সেইসময়ে সিদ্ধান্ত নেয় কাশ্মীরকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত রাখার শর্ত দেওয়া হয়। রাজা হরি সিং এই শর্তে রাজি হয়েছিলেন। এরপর ভারতীয় সেনা কাশ্মীরে যায় ও কাশ্মীরকে রক্ষা করে। আদতে জাতীয় সংগ্রামের একটি বাই-প্রোডাক্ট বলা যেতে পারে দেশভাগ ও কাশ্মীর আন্দোলনকে। পাকিস্তান নীতিগতভাবে বিশ্বাস করে কাশ্মীরের পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা উচিত। দেশভাগের পরে কাশ্মীর পাকিস্তানের কাছে একটি অসমাপ্ত অ্যাজেন্ডা।

এরপরে শেখ আবদুল্লা ও উপত্যকার তৎকালীন সবচেয়ে বড় পার্টি ন্যাশনাল কনফারেন্স ও ভারত সরকারের সংঘাত তৈরি হয়। অবশেষে সত্তর দশকে শেখ আবদুল্লা সরকার গঠন করেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর ছেলে ফারুক আবদুল্লা সরকারের দায়িত্ব নেন। কিন্ত তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে যাওয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি মাথাচাড়া দেয়। এরপরে ১৯৮৭ সালে আর একটি বড় ভুল হয়। বিধানসভা নির্বাচনে এমইউএফ সরকার তৈরি করতে অস্বীকার করে। এর জেরে উপত্যকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি মাথাচাড়া দেয়। এছাড়া, আর একটি ভুল করেছিলেন ভি পি সিং। জগমোহন সিংকে রাজ্যপাল করে কাশ্মীরে পাঠানোটা তাঁর আর একটি বড় ভুল ছিল। তার ভুল নীতি কাশ্মীরকে একটি সাম্প্রদায়িক চেহারা দেয়। এছাড়া কাশ্মীর পণ্ডিতদের উপত্যকা ছেড়ে চলে যাওয়াটা আর একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। সেইথেকে কাশ্মীর জ্বলছে।

পাকিস্তান সর্বতোভাবে কাশ্মীর ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালিয়েছে। বিশ্বের নজর কাড়তে এটা করা হয়েছে। আমেরিকাও কাশ্মীর ইস্যুকে তাঁদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে কাজে লাগিযেছে। ইসলামিক শক্তিগুলি বৃহত্তর জেহাদি ইস্যুতে কাশ্মীর ইস্যুকে কাজে লাগিয়েছে। উচ্চাকাঙ্খী কাশ্মীরি নে্তারা কাশ্মীরকে মুক্ত করতে চেয়েছেন। তাঁরা স্বাধীন দেশের নেতা হতে চেয়েছেন। বিজেপি ও আরএসএসের কাছে কাশ্মীর একটি রাজনৈতিক ফাঁদ। এর জেরে কাশ্মীরের জনতা প্রতিদিনই আশা হারিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। গড়পড়তা কাশ্মীরিরা সন্ত্রাসবাদী ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী সংস্থাগুলির যাঁতাকলে পড়ে গিয়েছেন। ফলে তাঁদের পক্ষে অবস্থান ঠিক করা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মেলালে তাঁরা অভিযুক্ত হচ্ছেন। তাঁদের স্বজাতির প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদি তাঁরা সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে যান তাহলে তাঁরা দেশবিরোধী হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছেন।

বিজেপি পিডিপি-র সঙ্গে কাশ্মীরে রাজ্য সরকারে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিজেপি আর্টিকেল ৩৭০-এর অবলুপ্তি চেয়েছে। বিজেপি সরকারের অঙ্গ হলে রাজ্যবাসীর ভিতর বিরূপ মনোভাব‌ দেখা দেবে। এর জেরে কাশ্মীরি্দের ভিতর বিচ্ছিন্নতাবোধ আর বেশি বেড়ে চলার সম্ভাবনা প্রবল।

সেনা ও আধা সামরিক বাহিনী উপত্যকার শান্তিরক্ষায় প্রয়োজনীয়। সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলাতেও এটা করা দরকার। পাশাপাশি এটাও দেখা দরকার রাজনীতিক ও বু্দ্ধিজীবীদের কাশ্মীর ইস্যুটিকে কেবলমাত্র আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসাবে দেখানোটা ঠিক নয়। টিভি চ্যানেল ও অর্ধপক্ক জাতীয়তাবাদীরা কাশ্মীর নিয়ে জাতীয়তাবাদের স্লোগান তুললেও তা ভুল হবে। কাশ্মীরিদের মারফত স্বাধীনতার যে কোনও দাবিই ভারতমাতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গে তুলনীয়।

কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই ইস্যুতে সমঝোতা করা ঠিক হবে না। আবার সাম্প্রতিক সময়ে শাসকে্রা ব্যাপারটা যেভাবে সরলীকরণ করছেন, সেভাবেও দেখাটা ঠিক হবে না। এটা বুঝতে হবে, যে কোনও কাশ্মীরিই সন্ত্রাসবাদী নয়। প্রত্যেক পাথর নিক্ষেপকারী দেশদ্রোহী নয়। মানুষের রাগের অনেক কারণ আছে। এটা কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করেই মোকাবিলা করা যাবে। কাশ্মীর সমস্যার সরলীকরণ সমস্যার সমাধান নয়। কিন্তু অত্যন্ত দুভার্গ্যজনকভাবে টিভি ও জনপ্রিয় বুদ্ধিজীবীদের ব্যাখ্যা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ক্ষতি করছে। কখনও কখনও টিভি ও জনপ্রিয় বিতর্কগুলি থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত বৃহত্তর স্বার্থে। তবে শীঘ্রই এরকম কিছু ঘটবে বলে মনে হয় না।

(Disclaimer: The views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the views of YourStory)