চোখ থাকতে অন্ধ কেন? প্রশ্ন ডঃ ভেঙ্কটস্বামীর

‘অন্ধ কানাই ঘাটের পরে, গান শুনিয়ে ভিক্ষা করে’। ‘সহজ পাঠে’ রবি ঠাকুরের এই একটা পঙক্তি নিয়ে সম্প্রতি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন মহলে। কানাই এখানে যে শ্রেণির প্রতিনিধি সেই ‘অন্ধ’-দের কি ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া অন্নসংস্থানের আর কোনও উপায় নেই? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য বিশ্বকবি বেঁচে নেই, তবে আমরা জানি যে অন্ধদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য একাধিক উপায় এনে দিয়েছে বিভিন্ন সংস্থা। কিন্তু এদের চোখের আলোয় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে আর ক’জন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সবার আগে মনে আসে ডঃ জি ভেঙ্কটস্বামী ও তাঁর সংস্থা ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’-এর নামটা। ১৯৭৬ সাল থেকে ডঃ ভেঙ্কটস্বামী কাজটা করে এসেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে।

0

ডঃ ভেঙ্কটস্বামীর স্বপ্ন ছিল পৃথিবী থেকে অন্ধত্ব দূর করা। সারা বিশ্বে অন্তত সাড়ে ৪ কোটি মানুষ চোখে দেখতে পান না। তাঁদের মধ্যে ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ বাস করেন ভারতবর্ষেই। ডঃ ভেঙ্কটস্বামী জানতেন যে, এদের ৮০ শতাংশেরই অন্ধত্ব নিরাময়যোগ্য। উপযুক্ত চিকিৎসায় চোখের আলোয় ফিরিয়ে আনা যায় তাদেরকে। চিকিৎসা পরিষেবা থেকে এইসব মানুষ যাতে বঞ্চিত না হয়, সেই উদ্দেশ্যেই ডঃ ভেঙ্কটস্বামী ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’ হাসপাতালটি। তখন তাঁর বয়স ৫৮ বছর। তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ে মাত্র ১১টি বেডের ছোট্ট হাসপাতালটি দিয়ে যাত্রা শুরু করে ধীরে ধীরে তা ক্রমশ ডালপালা মেলতে থাকে গোটা বিশ্ব জুড়ে। এখন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চক্ষু হাসপাতালগুলির মধ্যে অন্যতম ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’। এক দশকেরও বেশি সময় হয়ে গেল ডঃ ভেঙ্কটস্বামী পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তবু তাঁর আদর্শকে সামনে রেখে আজও সমান তালে এগিয়ে চলেছে ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’।


মাদুরাইয়ের ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’ হাসপাতাল
মাদুরাইয়ের ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’ হাসপাতাল

মাত্র ১১টি বেডের একটি হাসপাতাল থেকে শুরু করে গোটা বিশ্বব্যাপী এক খ্যাতনামা সামাজিক সংস্থা পরিচালনার কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু ডঃ ভেঙ্কটস্বামীর আকাঙ্খাটা এমনই স্বতন্ত্র ও গঠনমূলক ছিল যে, কোনও কিছু না ভেবেই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এই কর্মযজ্ঞে। এমনটা নয় যে, ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’-কে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে মূলধন নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন কোনও শুভানুধ্যায়ী। বরং পদে পদে প্রতিকূলতা ও অনটনটকে সঙ্গী ছিল তাঁর। তিনি ব্যবসায়িক ভিত্তিটাকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন, যাতে তাকে উপজীব্য করেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে পেরেছেন নিজের লক্ষ্যে। যখন হাসপাতালে বেড কম পড়েছে, তিনি যোগ করেছেন আরও একটি বেড। যখন বেড রাখার জায়গার অভাব দেখা দিয়েছে, তিনি হাসপাতালকে আরও একতলা বাড়িয়ে নিয়েছেন। যখন একটি হাসপাতাল পর্যাপ্ত মনে হয়নি, তৈরি করিয়েছেন নতুন একটি হাসপাতাল। যখন শুধু ভারতের মাটিতে হাসপাতাল গড়ে তোলাটা যথেষ্ট নয় বলে মনে হয়েছে তাঁর, বিদেশ বিভুঁইয়ের অন্ধজনের সাহারা হয়ে গড়ে তুলেছেন নতুন নতুন হাসপাতাল। এভাবে সাতটি দেশজুড়ে ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’-এর হাসপাতালগুলি মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ করে চলেছে। যা ডঃ ভেঙ্কটস্বামী নিজের অদম্য ইচ্ছেটাকে বাস্তব রূপ দিয়েছে।

সামাজিক সংস্থাগুলির পৃথক কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে। কোনও ভুলচুক হলে অভিযোগ করার পরিবর্তে তারা নজর দেয় ত্রুটি শুধরে অবস্থার পরিবর্তনে। ডঃ ভেঙ্কটস্বামীর দর্শনটাও ছিল এরকমই। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, সবকিছুকেই একটা সঠিক পথে চালনা করা সম্ভব। এই প্রত্যয়টাকে হাতিয়ার করেই এগিয়ে যেতেন তিনি। তাঁর মধ্যে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা ছিল। নিজের ধারণাগুলিকে অপরের মধ্যে অনায়াসে ছড়িয়ে দিতে পারতেন তিনি। সহজাত এই প্রবৃত্তিটাই দৃষ্টিহীন মানুষকে নতুন জীবনে ফিরিয়ে দিতে উৎসাহিত করত তাঁকে। বিশেষ করে যাদের চিকিৎসার সামর্থ্য নেই, তাঁদের আরোগ্য সাধনের একটা দৃঢ় সংকল্প লক্ষ্য করা যেত ডঃ ভেঙ্কটস্বামীর মধ্যে।

একজন আদর্শ নেতাই পৃথিবীকে বদলের পথে নিয়ে যেতে পারে। ডঃ ভেঙ্কটস্বামী এমনই একজন ব্যক্তিত্ব। তিনি নমনীয় উদারতার সঙ্গে মানবিকতা ও পেশাদারিত্ব। এই দুই আপাতবিরোধী বৈশিষ্ট্যের সমাহার ঘটিয়েছিলেন নিজের মধ্যে। অসাধারণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ডঃ ভেঙ্কটস্বামী একটা ফলপ্রসূ কৌশল অবলম্বন করে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। সৃষ্টিশীল এই বিপণন পদ্ধতি ছাড়াও তিনি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন ছাপোষা জীবন যাপনেও নিজের সামর্থ্যটাকে অপরের মধ্যে সঞ্চালিত করার জন্য।

ডঃ ভেঙ্কটস্বামী নিজের সংস্থাকে ভাল থেকে অসাধারণ করে তোলার স্বপ্ন দেখতেন এবং তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার নিরলস প্রচেষ্টায় মগ্ন থাকতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, একটা সংস্থা গড়ে ওঠে তার কর্মীদের নিয়ে। তাই তিনি চেষ্টা করতেন মানসিক ও চারিত্রিক পরিশীলনের মাধ্যমে নিজের কর্মচারীদের সার্বিক উন্নয়নের। আজও তাঁর শিক্ষাকে পাথেয় করে এগিয়ে ছলেছে ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’এর বর্তমান পরিচালকরা। আসলে ডঃ ভেঙ্কটস্বামী শিক্ষা নিয়েছিলেন কঠোর বাস্তব থেকে। ৫৮ বছর বয়সে তিনি যখন প্রতিষ্ঠা করেন ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’-এর, তখন তাঁর হাতে কানাকড়িও ছিলনা। কিন্তু তাই বলে তিনি হতোদ্যম হয়ে পড়েননি। বরং নিজের স্বপ্নকে সার্থক করার চেষ্টায় অক্লান্ত পরিশ্রম করে গিয়েছেন। তিনি জানতেন যে, সাফল্য একদিনে আসে না। তার জন্য ধৈর্য্য ধরতে হয়। সেই অধ্যাবসায়টা ছিল বলেই আজ তিনি সার্থক রূপ দিতে পেরেছেন ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’-এর।

একজন চিকিৎসক হিসাবে ডঃ ভেঙ্কটস্বামীর দর্শনটা ছিল এই যে, ‘আমাদের দরজায় যে বা যারাই কড়া নাড়ুক, তাদের পরিচর্যা করাটাই আমাদের প্রাথমিক কর্তব্য। হতে পারে তাদের কাছে পয়সা নেই, আমরা ঠিক একটা পথ বার করে নেব’। অসামর্থ্যদের চিকিৎসা খরচ জোগাড়ের একটা পদ্ধতি খুঁজে বার করেছিলেন তিনি। তিনজন সমর্থ ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি জুটিয়ে নিতেন একজনের বিনা পয়সায় চিকিৎসার রসদ। এটাই ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’এর ভিতটাকে মজবুত করতে সাহায্য করেছিল। ডঃ ভেঙ্কটস্বামী কতকগুলি মূল্যবোধকে আঁকড়ে থাকতেন। যার প্রথমটা হল সহানুভূতি, যেটা ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’-কে সর্বজনীন করে তুলেছে। দ্বিতীয়টা হল সাম্য, ধনি-দরিদ্র ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান পরিষেবা দিতে বদ্ধপরিকর ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’। তৃতীয়টা হল স্বচ্ছতা, যা তিনি আজীবন নিজের চিকিৎসা কার্যে প্রয়োগ করেছেন। সবকিছু সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার এই গুণটাই তাঁর সংস্থার জন্য মূলধন জোগাড়ের একটা মুক্ত মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিল। কোনওকিছুই তিনি গোপন রাখতেন না। সমাজের উদ্দেশ্যে পরোক্ষে তাঁর এই বার্তা ছিল , ‘যতটা আপনারা দেবেন, ততটাই ফিরিয়ে দিতে পারব আপনাদের’।

‘অরবিন্দ আই কেয়ার’ গোটা বিশ্বব্যাপী তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজি ছড়িয়ে দেওয়া ছাড়াও তাদের সরঞ্জামের গুনগত মানোন্নয়ন, ন্যূনতম মূল্যনির্ধারণ ও সাধ্যের মধ্যে সকলের নাগালে পৌঁছে দিতে পেরেছে। চক্ষু চিকিৎসার দিগন্তটাকেই বদলে দিয়েছিল ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’। সেই সময়ে যখন অস্ত্রোপচারের জন্য লেন্সের খরচ ছিল ২০০ ডলার, তখন ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’ তা মানুষের হাতে তুলে দিত মাত্র ৫ ডলারে। যে কারণে অন্তত ৮৫টি দেশে ‘অরবিন্দ আই কেয়ার’ তাদের সামগ্রী সাফল্যের সঙ্গে পৌঁছে দিতে পেরেছে।