ছাদে চাষাবাদ, গোলাপী শহরের সবুজ প্রতীক

0

গোলাপি শহর জয়পুর। পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তা,খালবিল আর পেল্লাই বড় বড় সব রাজপ্রাসাদ। আকাশপথে দেখা যায় বাড়ির ছাদগুলো সব হলদে রঙের কারুকার্য করা। এসবের মাঝে একটু সবুজের ছোঁয়া দিতে চেয়েছিলেন প্রতীক তিওয়ারি।

কীভাবে শুরু করলেন প্রতীক

আজ থেকে প্রায় বারো তের বছর আগে এক জৈবনিক কৃষি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রতীক একটি প্রকল্প শুরু করেছিলেন। সেখানে প্রতীক সরাসরি চাষীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। ২০০২ সাল। সেই শুরু। প্রতীকের খুব বেশিদিন সময় লাগেনি এটা বুঝতে যে ১০০ শতাংশ জৈব বলে কিছুই হয়না। এ যেন সোনার পাথর বাটি। কারণ সবক্ষেত্রেই রাসায়নিক কীটনাশকের ব্য়বহার হয়। তিন বছর পর তিনি প্রোজেক্ট বন্ধ করতে বাধ্য হন।

এর মধ্যে প্রতীক ওয়ালমার্টে চাকরি পান। বেশ মোটা টাকার কাজ। তবুও কি এক দোটানায় ভুগছিলেন। তিনি ভাবছিলেন হয় দুনিয়ার পরোয়া শিকেয় তুলে তিনি আরামে চাকরি করবেন অথবা সত্যিকারের কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করবেন। ভিতরের ডাককে বেশিদিন না শুনে থাকতে পারলেন না প্রতীক। ওয়ালমার্টের চাকরীতে ইস্তফা দিয়ে শুরু করলেন মনের টানে কাজ করা। কোমর বেঁধে নামলেন শহরে চাষের জমি তৈরি করতে।

জন্ম নিল "লিভিং গ্রীণ"

রাজস্থান। মরু অঞ্চল। তাবলে কি চাষাবাদ থেমে থাকবে। অনেকদিন ধরে স্বপ্ন ছিল প্রতীকের। এই অঞ্চলের মানুষ একদিন তাঁর বাড়ির ছাদেই না হয় ফলাবেন সবজি, ফল, মশলা আর ভেষজ জরিবুটি। আর তাই ২০১৩ সালে প্রতীক বানালেন "লিভিং গ্রীণ"। শহরবাসীকে উপহার দিলেন বহনযোগ্য গ্রীন হাউস। শহরাঞ্চলে চাষাবাদে এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে তাঁর সংস্থা। প্রতীকের মতে যেসব সংস্থা শহুরে মানুষকে নিজস্ব খাদ্যশষ্য উৎপাদন পদ্ধতি শেখায় প্রতীকরা তাঁদের মধ্যে প্রথম লাভজনক উদ্যোগ।

ব্যবসার মডেল এবং মডিউলার কৃষি

জয়পুরের সবজি ও ফল চাষের অবস্থা খুবই করুণ। তিনি ঠিক করলেন বাড়ির অব্যবহৃত ছাদগুলি কাজে লাগাবেন। তাঁরা বাড়ির ছাদে উন্নতমানের পলিথিন দিয়ে তৈরি নানান আকৃতির গ্রীণ হাউস এবং বাগান বসিয়ে দিলেন। গবেষণা করে এমন এক মিডিয়াম বানালেন যা ভিজে মাটির চেয়ে হালকা। বাগান তৈরি হল বিশেষ পাত্রের মধ্যে। এর বিশেষ জলধারণ ক্ষমতা জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। এক ধরনের পাউডার সামান্য প্রয়োগ করেন তাঁরা। তাতে জমি উর্বর থাকে এবং সারাবছর ফলন ভালো হয়। তাঁরা এখন ফ্র্যানচাইজি খুলেছেন দিল্লী,ইন্ডোর এবং যোধপুরে।

আগ্রহী যুবসমাজই লিভিং গ্রীণের ভবিষ্যত

প্রতীকরা চাষের খুঁটিনাটি বিষয়ে নজর দেন। তাঁদের সমস্ত সামগ্রীই গবেষণার ফল। তাই তাঁরা তাঁদের সামগ্রীর উপযোগিতা নিয়ে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত। তাঁরা গ্রাহককে প্রত্যেক মাসে ১০০০-১৫০০ টাকার বিনিময়ে পরিসেবা দেন। জলবায়ু অনুযায়ি তাঁরা সামগ্রী বিক্রি করেন। ফলে ওরা নিশ্চিত ওদের শহুরে গ্রাহকরা তাঁদের নিজেদের ফসল নিজেরাই ফলাতে পারবেন।

স্থানীয় ভেন্ডরদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে খুব শিগগিরই তাঁরা আরও ১০টা শহরে শাখা খুলছেন। একদল যুবকযুবতীও প্রতীকের হাত শক্ত করতে এগিয়ে এসেছে। পরিবেশ সংক্রান্ত কাজে বেশ উৎসাহী। মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানির চাকরি নয়, বরং তাঁরা আগ্রহী নিজেদের শহরে পরিবেশ নিয়ে কিছু গঠনমূলক কাজ করতে। ইমেলে ইচ্ছের কথা জানানোয় সাগ্রহে তাদের গ্রহণ করেছেন প্রতীক। লিভিং গ্রীণের দল এখন যথেষ্ট সমর্থ। তাঁরা নিজেদের ডিরেক্টরদের থেকেই তৃতীয় পর্যায়ের কৃষির মূলধন জোগাড় করে ফেলেছেন।

উনিশ সদস্যের এই দল প্রতিদিন গবেষণা চালাচ্ছে। চেষ্টা করছে সব সমস্যার চুলচেরা বিচার আর সমাধানের। প্রতীক আজ উদ্যোগপতিদের কাছে সফল উদাহরণ। শুধু কি তাই। এবার বাড়ির টেরেসে বাগান বানানোর পরিকল্পনা করছেন ওঁরা। ইতিমধ্যেই একটি মডেল তাঁরা বানিয়ে ফেলেছেন যেখানে মানুষ তাঁর নিজের বাড়ির বর্জ্য থেকে বানাতে পারবে জৈব সার।

যুবকদের আগ্রহ প্রতীক তিওয়ারি কে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর মনে হয় ওয়ালমার্টের চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্তে কোনো ভুল ছিল না। মনে হয় সত্যিই কিছু উন্নয়নমূলক এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ঘটাতে তিনি সক্ষম হয়েছেন। আমরা কুর্নিশ জানাই প্রতীকের প্রত্যয়কে।