স্কিৎজফ্রেনিকরা মানসিক রোগী হতে পারেন, বোকা নন

0

প্রথমেই যেটা তাঁর সম্বন্ধে চোখে পড়ে, তা হল তার পরিহাস করার ক্ষমতা। তিনি সবসময় চেষ্টা করেন মজার দিকটা দেখতে। ২০০৪ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন রকমের বিষয় সম্পর্কে কাজ করে চলেছেন, যেমন- মানসিক স্বাস্থ্য, অক্ষমতা, যৌনতা ও মানবাধিকার। তিনি প্রায়ই স্কিৎজফ্রেনিয়া নিয়ে তার জার্নি সম্বন্ধে কথা বলেছেন এবং লিখেছেন।

তিনি অদ্ভুত ফ্যাশন ফলো করেন। গোলাপি চুল, হাতে ট্যাটু, গথিক স্টাইল, থুতনিতে দুল। এসব দেখে অনেকেই তাঁকে ‘উন্মাদ’ মনে করে। এই কথা শুনলেই তিনি হাসিতে ফেটে পড়েন এবং বলেন, ‘আমি ওটাই চাই। মানুষ আমার সম্বন্ধে এরকমই ভাবুক। যে আমি কেবল দেখতেই উন্মাদ।’ 

রেশমা ছোটবেলা থেকেই স্পষ্টবক্তা, নিজের মতামত প্রকাশ করতে পছন্দ করেন, এবং স্বাধীনচেতা। তিনি কখনোই খুব একটা শান্ত নন। কিন্তু যখনই তিনি রেগে যান মানুষ সেটাকে স্কিৎজফ্রেনিয়ার লক্ষন বলে মনে করে।

‘আমার জার্নির সবচেয়ে কঠিন অংশ হল মানুষ আমাকে একজন স্কিৎজফ্রেনিক হিসাবেই দেখে, একজন ব্যক্তিমানু্ষ হিসাবে নয়। বেশিরভাগ সময় মানুষের কাছে আমাকে এটাই বলে যেতে হয়েছে যে, আমি কেবল স্কিৎজফ্রেনিয়া দ্বারাই পরিচালিত নই। অন্য সবার মত আমারও একটা ব্যক্তিত্ব আছে।'

পরবর্তী কথপোকথনটি এক সাধারন মানুষের সঙ্গে কিছু অসাধারন বিষয় নিয়ে যেগুলি তার কাছে খুবই সাধারন, কারন এটা তার জীবনের অংশ। এর মধ্যে কোনো বিরোধিতা নেই।

“স্কিৎজফ্রেনিয়া নিয়ে সমস্যা হল আমাদের অস্তিত্বটাই কেউ জানেনা, কেউ জানেনা আমরা কে বা কারা। আমাদেরকে হয় অ্যাসাইলাম, আশ্রম, নিজের বাড়ি বা আমাদের মগজের মধ্যেই আটকে রাখা হয়। একমাত্র সাইকিয়াট্রিস্টরাই আমাদের সম্বন্ধে কথা বলে থাকেন।“ তিনি বললেন। “আমরা স্কিৎজফ্রেনিকরা উন্মাদ হতে পারি, কিন্তু বোকা নই।অবশ্য, কখনো আমরা আলাদা একটা জগতে থাকি, এবং সেই সময়ে আমরা এটা বুঝতে পারিনা যে আমরা কী বলছি, কিন্তু যখন আমরা ভালো থাকি, তখন সত্যিই খুব খুব ভালো থাকি।“ তিনি হেসে বললেন।

স্কিৎজফ্রেনিয়া শব্দটি অনেকের কাছেই পরিচিত, কিন্তু খুব কম মানুষেরই এই বিষয়ে সঠিক ধারনা আছে। এর সংঞ্গাই হল অঞ্গতার অন্যতম কারন। “স্কিৎজফ্রেনিয়ার নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই, কারন এটা সবকিছুরই একরকমের মিশ্রন।“ বললেন রেশমা।

২২ বছর বয়সে তার স্কিৎজফ্রেনিয়া ধরা পড়ে প্রথম। তিনি সাইকিয়াট্রিক থেরাপি নেওয়া শুরু করেন। কিন্তু কিছু বছর পর সব ধরনের ওষুধ খাওয়া বন্ধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন যা যা তাকে প্রেসক্রাইব করা হয়েছিল। এটা মেনে নেওয়া তার পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনদের কাছে সহজ ছিলনা। কিন্তু তারা তাকে কোনোরকম বাধা দেননি। রেশমাকে এখন থেকে সাধারন মানুষের মতই জীবন যাপন করতে হবে, এই বিবেচনাই ছিল এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পিছনে।

“আমার বাবা এবং আমার ডাক্তার সবসময়ই আমাকে এবিষয়ে খুব সমর্থন করেছেন, কারন তাঁরা আমার ব্যক্তিত্বটা বুঝতেন। আমার বাবা আমাকে বড় হতে দেখেছেন। আমি ছিলাম সবচেয়ে দুরন্ত, প্রতিবাদী, চারিদিকে দৌড়ে বেড়াতাম, গাছে চড়তাম। ওঁর জিন আছে আমার মধ্যে। আর সেইজন্যেই আমি যেসব পাগলামি করি সেগুলো তাঁর কাছে তাজ্জব লাগে না। কারন তিনি নিজেও একই রকম পাগলামি করেন।"

রেশমার জন্ম মালয়েশিয়ায়। এখন পুনেতে তার বোন আর চারটি বিড়ালের সঙ্গে থাকেন। “ আমার মা-বাবা ইন্দোনেশিয়ায় চলে যান কারন ৬৫ বছর বয়সেও তিনি চাকরি করতে চেয়েছেন। আমাদের কিছু অসুস্থতা ছিল আমার মায়ের ছিল ক্যানসার আর আমার ব্রেন টিউমার।"

একটা বিনুনির মতই তার জীবনে বিভিন্ন দুর্ঘটনা, শিক্ষা, শক্তি, অনুপ্রেরনা সব একের পর এক জট পাকাতে থাকে। আর এভাবেই তাঁর ব্যক্তিত্ব আকৃতি নেয়। সময় কখনই ফাঁকা থাকে না। তিনি মার্শাল আর্ট শেখান, ছবি আঁকেন, মূকাভিনয় করেন, ধ্যান করেন, বিভিন্ন কনফারেন্সে স্পিচ দেন, অ্যাকাডেমিক পেপার লেখেন, আরো অন্যান্য কাজ এবং হয়ত এমন কিছু কাজ যার সম্বন্ধে আমিও জেনে উঠতে পারিনি।

“আমার একটা রুটিন থাকলে ভালে হয়। কিন্তু করা হয়ে ওঠে না।" তিনি হেসে বললেন। এর কারন হল, প্রথমত তিনি অনেক রকম কাজের সঙ্গে যুক্ত এবং দ্বিতীয়ত, তাঁর মাথার মধ্যে যে শব্দ এবং দৃশ্য গুলো কাজ করে সেগুলো তাকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে বাধা দেয়। “ এরকম যখন হয়, তখন তিন দিন আমার খুব খারাপ কাটে। কারন ভিশন গুলো বর্তমান স্মৃতি গুলো নষ্ট করে দেয়। তাই আমি তখন সম্পূর্ণ দিকভ্রান্ত, ক্লান্ত, উদভ্রান্ত হয়ে পড়ি এবং কাউকে চিনতে পারিনা।আবার নতুন করে সবকিছু ঠিক করতে অনেক সময় লাগে। যখন আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসি, তখন আমি চেষ্টা করি ছবি আঁকতে, পড়তে অথবা গান শুনতে (আমার বিড়ালগুলো খুব সাহায্য করে)।“

যে কোনো অবস্থাতেই, রুটিনের চেয়ে যে জিনিসটা রেশমার জন্যে বেশী গুরুত্বপূর্ণ তা হল ঘুম। “ আমি লক্ষ করেছি যে যখন আমার ঘুম হয়না, আমি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ি এবং ধীরে ধীরে এর ফলে আরো উত্তেজিত হয়ে পড়ি আর অতিরিক্ত কাজ করতে থাকি। ঝোঁকের মাথায় সবকিছু করতে থাকি কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ি। ঘুমের অভাব আমার ভিশনের ক্ষতি করে।“- তিনি বললেন। “ঘুমের সময় আমার ফোনটাকেও সরিয়ে রাখা দরকার। ঘুমানোর পর কেউ যদি আমাকে ফোন করে তাহলে আমি খুবই রেগে যাই। আর আমার ইচ্ছে হয় ফোনটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিতে। সবাই মনে করে আমি ঠিক আছি কিনা, বেঁচে আছি কিনা সেটা জানা জরুরী। কিন্তু রাত ১০টা থেকে সকাল ১০টার মধ্যে তাদের জানার কোনো দরকার নেই” – তিনি হেসে বললেন।

সুতরাং, লম্বা ঘুম, মেডিটেশন, থাই চি ক্লাস, মূকাভিনয়, ছবি আঁকা, এসব কিছুর মধ্যেও মানসিক ভারসাম্যহীনতা এবং সমাজে তার সম্বন্ধে ধারনা নিয়ে কথা বলেন এবং লেখালিখি করেন। “ভারতে প্রায় ২০০০ এরও বেশী জাতীয় আইন আছে এবং তার মধ্যে অন্তত ২০০ টিতে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ কথাটি আছে। এই টার্মটি Mental Health Act 1987 তে প্রায়ই আছে। এই টার্মটি Lunacy Asylum Act 1858 সরাসরি এসেছে”। তিনি বলতে থাকেন এবং বুঝিয়ে দেন যে এই লেবেলটি বর্তমানে বিভিন্ন আইনত কাগজপত্রেও আছে। “যে বিষয়টি সম্পর্কে কথা বলতে আমার বেশী ভালো লাগে, সেটা হল Indian Aircraft Rules এর part 3, section 24a। এই আইনে বলা হয়, যে সকল ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্যহীন বা মৃগী রোগী তারা কোনো রেজিস্টার্ড মেডিকেল প্র্যাকটিশনার বা কোনো নিকট আত্মীয় ছাড়া বিমানে চড়তে পারবেন না”। “ তাহলে ভাবুন তো, যদি কোনো যাত্রীকে দেখে পাইলটের মনে হয় যে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন, সেক্ষেত্রে তিনি তাকে নিয়ে যাবেননা”। - তিনি বললেন হাসতে হাসতে।

যাইহোক, ভারত সরকার এই সকল আইন গুলোকে নতুন করে প্রনয়ন করার চেষ্টা করে চলেছে। রেশমা আরো বললেন, ২০০৬ সালে ভারত সরকার রাষ্ট্রপুঞ্জের Rights of Persons with Disabilities (UNCRPD) সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। এবং সেক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পুরানো আইন গুলিকে বদল করা প্রয়োজন।

সরকারের সিদ্ধান্ত এই সকল মানুষের জীবনে খুব বড় একটা ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এটাই একমাত্র বিষয় নয়। অপর একটা ব্যাপার হল আমাদের কথা শোনানোর কোনো জায়গা নেই। “অনেকেই বলেন যে স্কিৎজফ্রেনিকরা নিজেদের সম্বন্ধে কোনো কথা বলতে চান না। কিন্তু সেকথা সত্যি নয়। আমাদের জন্যে কোনো প্লাটফর্মই নেই। আর যখন আমরা নিজেদের বিষয়ে কিছু বলতে যাই, আমাদেরকে থামিয়ে দেওয়া হয়। কারন, মানুষ মনে করে আমরা পাগল এবং আমরা যা বলছি সেটা নেহাতই পাগলামি”।

এ বিষয়ে তিনি তাঁর বই প্রকাশের দিনের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলেন। স্কিৎজফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত এক যুবক যখন উঠে দাড়িয়ে এমন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন যেটা সরাসরি আলোচনার বিষয় বস্তুর সঙ্গে যুক্ত নয়। “প্রকাশক বার বার আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন কারন আমাদের সময় সীমিত ছিল এবং তাড়াতাড়ি অনুষ্ঠান শেষ করতে হত। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম অপেক্ষা করতে কারন, অন্যের কথা শোনার জন্যে কেউই অপেক্ষা করতে চায়না। সেই ব্যক্তি কিছু বলতে চেয়েছিল, যদিও সেটা আলোচনার বিষয়বস্তু ছিলনা, সবাই সেটা বুঝেছিল”।

স্কিৎজফ্রেনিয়ার উপর অপর্না স্যান্যালের একটি ডকুমেন্টারি ‘A Drop of Sunshine’-এ মুখ্য ভূমিকা পালনের পর রেশমার জীবনে এক বিরাট পরিবর্তন আসে। “এই ধরনের ডকুমেন্টারি কেবল মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত NGO বা কনফারেন্সেই দেখানো হয়না, বিভিন্ন ধরনের ফেস্টিভাল যেখানে স্কিৎজফ্রেনিয়া ছাড়াও আরো নানা ধরনের মানুষও আসেন। আমার জগৎটা যদি একটা নির্দিষ্ট সামাজিক গন্ডির মধ্যে হয়, তাহলে আমি আরো বৃহৎ বাস্তবের কাছে পৌঁছাব কি করে? এই সিনেমাটি আমার গল্প আরো অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে এবং নতুন যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরী করেছে”।– তিনি বললেন।

মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে কথা বলার অভাবই একটি মূল কারন এবং অনেকেই সেটা মানেন। যাইহোক, রেশমা বললেন, “সমস্যাটা কেবল মানসিক সংক্রান্ত নয়। সমস্যাটি আরো পুরানো। মানুষ সুখী নয় কিন্তু সে সেটা স্বীকার করে না। ক‌’টা মানুষ বলতে পারে যে, সে তার জীবন এবং কাজ নিয়ে সুখী নয়! ক’টা মানুষের এটা বলার ক্ষমতা আছে? এটাই হল মূল প্রশ্ন। কারন, মানুষকে নিজের পড়াশুনা করতে হয়, পরিবারকে চালাতে হয়, বাড়িতে টাকা আনতে হয়, ইত্যাদি। মূল কথাটি হল, আমাদের স্বাস্থ্য - শারীরিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক – এ সবই হল আমাদের নিজেদের দায়িত্ব। মানুষ কখনো কখনো সেটা ভুলে যায় এবং মনে করে যে জীবনটাকে কোনোরকমে চালিয়ে নিয়ে যাওয়াই একমাত্র কাজ।

আমার মনে হয় মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে কথা বলার সময় আমাদের বিশেষভাবে সচেতন থাকা উচিত। কারন, যখন আমরা এ বিষয়ে কথা বলি, তখন নিজে থেকেই আমরা সেটাকে ডিপ্রেশন, দুশ্চিন্তা, আত্মহত্যার প্রচেষ্টা ইত্যাদি নাম দিয়ে ফেলি। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টা আরও সহজ হতে পারে। কিন্তু আমরা ডাক্তারের কাছে যাই, যেন একমাত্র তিনিই ভগবান এবং আমাদেরকে সারিয়ে তুলতে পারবেন। এর পরিবর্তে, আমরা যদি নিজেদের মনের কথা প্রকাশ করে বলতে পারতাম, সেটা বরং কাজের কাজ হত”।

উপসংহারে রেশমার মতে স্কিৎজফ্রেনিয়ার সংজ্ঞা কী, সেটা বলে নেওয়া ভালো। “আমার অভিধানে স্কিৎজফ্রেনিয়া শব্দটা সেই জগৎ এর জন্যে, যেটা আগে থেকেই উন্মাদ। কেবল আমরাই সেই পাগলামিকে এতটাই নিজেদের মধ্যে গেঁথে নিয়েছি যে সেটাই এখন আমাদের মানসিক অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নয়ত আমরা এত রকম অভিঞ্গতা লাভ করি যে জগৎটা আর আমরা এক হয়ে যাই। এক ধরনের অস্তিত্ব সংকট, যেখানে আমরা আর আমরা নই, সবই প্রতিচ্ছবি”।