দু'চাকায় সমাজসেবা! প্রেসার মাপেন 'প্রেসার মহারাজ'

0

আলমবাজার জুট মিলের পাশে জুট ওয়ার্কারদের কলোনী। সকাল থেকে আলমবাজার মোড়ের কাছে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে বছর সাতেকের ছোট্টু। বাড়িতে উচ্চ রক্তচাপের রোগী, দাদির শরীর খারাপ। কাউকে বাড়িতে এনে প্রেসার মাপাতে হবে। সকালে এই সময়টা এখান দিয়ে প্রেসার মহারাজ যান। তাকে দেখতে পেলে বাড়ি নিয়ে গিয়ে দাদির ‌প্রেসার মাপানো যাবে। প্রেসার মহারাজ নামটা শুনে অবাক হচ্ছেন তো! অবাক হওয়ারই কথা। শৈশবেই রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দের জীবনাদর্শে দীক্ষিত হওয়া, রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের মত গেরুয়া পোশাক পরা কাশীপুরের বিশ্বজিত বাগচীকে এই নামেই চেনেন তার পরিচিত লোকজন।

সকাল হলেই কাশীপুরের বাড়ি থেকে সাইকেলে প্রেসার মাপার যন্ত্র নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন তিনি। আর সাইকেল চেপে নানা জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে বিনামূল্যে মেপে বেড়ান লোকজনের ব্লাড প্রেসার। রোদ, ঝড়,বৃস্টি যাই হোক না কেন নড়ন চড়ন নেই তার এই রুটিনের। তার এই প্রেসার মাপার ব্রতের কারণে চাপা পড়েছে তার আসল পরিচয়।উত্তর কলকাতা ও শহরতলীর লোকের কাছে কাশীপুরের বিশ্বজিত বাগচী আজ লোকমুখে প্রেসার মহারাজ বা শুধুই মহারাজ। বিশ্বজিতের নিজের কথায়,"কম্পাউন্ডার হওয়ার পূর্বের অভিজ্ঞতা ছিল। পেশাগত কারণে রামকৃষ্ণ আয়ুর্বেদিক ভবনের তৈরী নানান আয়ুর্বেদিক প্রডাক্ট ফেরি করছি দীর্ঘদিন।স্কুলজীবন থেকেই বিবেকানন্দের জীবে সেবার বানী আমায় টানত। সাধ্যমত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতাম।চাইতাম স্বায়ীভাবে কিছু একটা করতে। কিন্তু কি করতে পারব সেটা জানতাম না।" বরানগর রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তন ছাত্র বিশ্বজিত স্কুলে প্রাক্তনীদের পূর্ণমিলন অনুষ্ঠানে গিয়ে আইডিয়াটা পান।স্কুলেরই এক সন্ন্যাসী মহারাজ তাকে বলেন তার কম্পাউন্ডারির অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে।বলেন রক্তচাপ জনিত সমস্যা আজ প্রতি ঘরে ঘরে । তবে সেতুলনায় আমাদের এখানে প্রেসার মনিটরিং এর ব্যবস্থা ভাল নয়।বিশ্বজিতকে বলেন বিনামূল্যে লোকের প্রেসার মেপে দিতে।

আইডিয়াটা মনে ধরে।ভাবেন সত্যিই তো এতে তো সহজেই লোকের ভালো করতে পারবেন। আর তার বর্তমান পেশা আয়ুর্বেদিক প্রোডাক্ট বেচার কাজ চালিয়ে যেতেও কোনও অসুবিধা হবে না।ব্যাস নিজের সাইকেল নিয়ে নেমে পড়লেন বিনামূল্যে প্রেসার মাপার কাজে। যদিও একে কোন কাজ বলে ভাবেননা বিশ্বজিত। তার কাছে এটা মানব সেবার ব্রত। বললেন," বিবেকানন্দ বলেছিলেন আমরা সকলে যদি আমাদের আশপাশের লোকজনের কাজে লাগতে পারি তাহলে ভারতবর্ষের চেহারা অন্যরকম হবে।বাকি লোকেদের কথা আমি বলতে পারব না,আমি আমার মত করে চেষ্টা করে চলেছি।প্রতিদিন চেষ্টা করি কমপক্ষে ১০০ জনের ব্লাড প্রেসার মাপার। রোজ তা সম্ভব হয় না।আবার মাঝে মাঝে তার বেশীও হয়ে যায়। কোনদিন এমন হয় দুপুর হয়ে গিয়েছে তাও লোকজন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আর আমি প্রেসার মেপেই চলেছি।" বিশ্বজিতের দাবী গত তিন বছরে বিনামূল্যে প্রায় একলাখ লোকের মেপেছেন তিনি। রোজ সকাল নটায় বাড়ি থেকে বেড়িয়ে দুপুর তিনটে নাগাদ বাড়ি ফেরেন।সাইকেলে লাগানো বিনামূল্যে প্রেসার মাপার বোর্ড দেখে তাকে থামিয়ে প্রেসার মাপিয়ে নেন পথচলতি লোকজনেরা। রাস্তাঘাটে প্রেসার মাপার ফাঁকে চলে আয়ুর্বেদিক প্রোডাক্ট বেচার কাজ। পেশা আর নেশা দুইই চলে সমান তালে।

কিসের টানে রোজ পথে নামেন বিশ্বজিত।তার কথায়,"লোকের ভালোবাসাই আমার কাছে সেরা পুরস্কার। যখন আমি রাস্তাতে লোকজনের প্রেসার মাপি তখন তাদের চোখে আমার প্রতি এক শ্রদ্ধার ভাব দেখতে পাই। মানুষজনের সেই ভালোবাসা ,শ্রদ্ধাই আমায় পথে নামার প্রেরণা যোগায়।"

অধিকাংশ মানুষের ব্লাড প্রেসার নর্মাল থাকলেও কারও ব্লাড প্রেসারে অস্বাভাবিক মাত্রাও দেখতে পান। সেক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে তাদের ডাক্তারি পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।যাতে তারা আরো বড় ধরনের অসুস্হতা থেকে বাঁচতে পারেন। তার কাছে প্রেসার মাপানো অনেককেই এভাবে আগাম সতর্ক করতে পেরেছেন প্রেসার মাহারাজ। তবে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা তাকে খুব নাড়া দিয়েছে। মাস তিনেক আগে বরানগরের একটি কারখানার এক শ্রমিকের ব্লাড প্রেসার মেপে অস্বাভাবিক মাত্রা দেখতে পান। তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তার দেখানোর কথা বলেন। কিন্তু ওই শ্রমিক তার পরামর্শ শোনেননি। কয়েকদিন পরে ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে খবর পান সেদিন রাতেই মৃত্যু হয়েছে ওই ব্যাক্তির। একটি মানুষেরও জীবন বাঁচাতে না পাড়ার যন্ত্রণা তাঁকে তাড়া করে।

বিনামূল্যে জগতের লোকের ব্লাড প্রেসার মাপা প্রেসার মহারাজের নিজের ব্লাড প্রেসার নর্মাল তো? আমাদের প্রশ্নের উত্তরে হেসে বললেন "আমার ব্লাড প্রেসার মোটের উপর ঠিকই আছে। বেঠিক হওয়ার উপায় নেই। শরীর খারাপের জন্য একদিনও আমার বিনামূল্যে প্রেসার মাপার কাজে ছেদ পড়ুক তা আমি চাইনা।" এই বলে সাইকেল চেপে অন্য জায়গায় নতুন লোকজনের প্রেসার মাপতে রওনা দিলেন প্রেসার মহারাজ।