বিদ্যার দেবীদের নিয়ে আলোচনা হবে কলকাতায়

3
ভারতীয় সভ্যতায় দেবী সরস্বতী যে ঠিক কী তা নিয়ে নানান মুনির নানান মত। কেউ বলেন নদীমাতৃক সভ্যতায় তিনি নিহিত বহমান নদী। জ্ঞান চর্চার অঙ্গনে তিনিই আরাধ্যা। সমস্ত জ্ঞানের আকর। রূপ কল্পনায় তিনি লাস্যে ভরা অপরূপ। সঙ্গীতে শ্রেষ্ঠা। বীণা হাতে সুর ছড়িয়ে দিচ্ছেন ফল্গু নদীর স্রোতের মত হাজার হাজার বছর ধরে। কথিত জনশ্রুতি, লিখিত স্লোকে তিনি সাদা পদ্মের ওপর বসে থাকা স্নিগ্ধ প্রখর মেধাবী নারী। ব্রাহ্মণ্য সমাজ তাঁকে পুজো করে। 

কিন্তু আশ্চর্য বিষয় এই দেবী শ্রমণদেরও। বৌদ্ধ সংস্কৃতির হাত ধরে সরস্বতী গিয়ে পৌঁছেছেন চিনে। সেখানে তিনি মঞ্জুশ্রী নামে পূজিত। মঞ্জুশ্রী বিদ্যার দেবতা। বৌদ্ধ ধর্মে মহাযান শাখায় মঞ্জুশ্রী একজন পুরুষ দেবতা। তাঁকে কোথাও কোথাও রাজকুমার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রের প্রাচীন মহাযান সূত্রে তাঁর উল্লেখ আছে। তাঁকে প্রজ্ঞাময় বোধিসত্ত্ব হিসেবে আরাধনা করা হয়। এবং একই ভাবে তিনি শায়িত বুদ্ধ নন। তিনি বসে আছেন। তার ধ্যানমগ্ন রূপ পাওয়া যায় বজ্রযান বৌদ্ধ শাখায়। তাঁকে পরিপূর্ণ জ্ঞানের মূর্তি হিসেবে আরাধনা করা হয়। বুদ্ধের তেরটি অবতারের অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয় মঞ্জুশ্রীমূলকল্পের মত ক্রিয়াতন্ত্রের আকর গ্রন্থে আছে মঞ্জুশ্রীর কথা। বলা হয়, শৈব, গড়ুর এবং বিষ্ণু তন্ত্রের মন্ত্রগুলি আদতে মঞ্জুশ্রীর কাছ থেকেই বৌদ্ধরা শিখেছেন। এবং সেখানে মঞ্জুশ্রীকে সরস্বতীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। শুধু চিনে তিব্বতে কিংবা রেঙ্গুনে নয় গোটা এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল মঞ্জুশ্রী আরাধনা। পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া গিয়েছে সেই মূর্তি। বৌদ্ধদের হাত ধরে ভারতীয় সরস্বতী গিয়েছেন জাপানেও। সেখানে তিনি দেবী। নাম বেঞ্জাইতেন। জাপানে বেঞ্জাইতেন এসেছেন ষষ্ঠ শতাব্দীতে। বৌদ্ধ সভ্যতার বিস্তারের ভিতর দিয়ে। সেখানেও দেবী পদ্মে বসে আছেন। তিনি যাকিছু বহমান তাঁর দেবী, যেমন জলের ধারা, নদী, সঙ্গীত, সুর, জ্ঞান আর কাব্যের দেবী। বৌদ্ধদের দ্বারা পূজিতা হয়েছেন বেঞ্জাইতেন। পাশাপাশি জাপানের প্রাচীন সনাতন ধর্ম শিনটো ধর্মগ্রন্থেও বেঞ্জাইতেন সমানভাবে আদৃতা।

বৌদ্ধ ধর্ম ছাড়াও দুনিয়ার যে প্রান্তে মূর্তি পুজোর প্রচলন ছিল সেখানেই জ্ঞানের দেবীর রূপাবয়ব পাওয়া গিয়েছে। অধিকাংশ সভ্যতায় তিনি নারী। আবার কোথাও কোথাও পুরুষ। যেমন ধরুন আফ্রিকায় বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতার দেবতা অননসি। মাকড়সার মত তাঁর চেহারা। তিনি চেয়েছিলেন সমস্ত শিক্ষাকে একটি কলসির মধ্যে ভরে রাখতে। তবে এই দেবতা জনগোষ্ঠীর লোকগাঁথার চরিত্র। পুজো পান তবে কৌলিন্য কম। কিন্তু আফ্রিকায় বিদ্যার আসল অধিষ্ঠাতা আর প্রজ্ঞার দেবতা হিসেবে সব থেকে বেশি জনপ্রিয় অরুনমিলা। নানান জনগোষ্ঠীর পৌরাণিক কাহিনিতে তার উল্লেখ আছে। পৌরাণিক জনশ্রুতি মতে তিনিই আদি অনন্ত সময় ধরে বিশ্বের সমস্ত শুভবুদ্ধি, প্রজ্ঞা আর সুচিন্তার দেবতা। সর্বময় ক্ষমতাশালী দেবাদিদেব ওলোদুমারের পর সব থেকে ক্ষমতাশালী, সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। সৃষ্টির আদি থেকে তিনি আছেন। জগত সৃষ্টির পর তিনি মানুষের ভিতর, জনসমাজের মধ্যে এক পুরোহিত দম্পতিকে নিয়ে আসেন। পুরোহিত ইফা এবং তাঁর সুযোগ্যা পত্নী ইয়ানিফাস। মানুষের সমস্ত জিগীষা এবং অনুসন্ধিৎসার দেব দেবী। আফ্রিকায় ইসলামের প্রভূত বিস্তার হলেও জনগোষ্ঠীগুলির ভিতর এখনও ইফা এবং ইয়ানিফাস পুজো পান।

আদি অনন্তকাল ধরে চলে আসছে বিদ্যার দেবদেবতার আরাধনা। প্রাচীন সব সভ্যতার মধ্যে বেশিরভাগ জ্ঞানের দেবতাই নারী। যেমন মিশরীয় সভ্যতার নেইথ, শেসাথ্‌, ইসিস্‌; সুমেরিয়ান সভ্যতার নিসাবা; জাপান সভ্যতার বেঞ্জাইতেন; রোম সভ্যতার প্রভিদেন্তিয়া এবং মিনার্ভা; ইট্রাসানিয়ান সভ্যতার মিনার্ভা; নোস্টিক সভ্যতার সোফিয়া; গ্রীক সভ্যতার এথেনা; পার্সিয়ান সভ্যতার আনহিতা; নরসে সভ্যতার সাগা, ভর, স্নোত্রা, গেফ্‌জন; এবং ভারতীয় সভ্যতায় সরস্বতীকে পাওয়া যায় জ্ঞানের দেবী হিসাবে। এই জ্ঞানের দেবীদের নিয়েই কলকাতায় আলোচনার আয়োজন করেছে বাংলার পুরাতত্ব গবেষণাকেন্দ্র। ১৭ জানুয়ারি। এটা ওদের প্রথম আনুষ্ঠানিক সেমিনার। সংস্থার কর্ণধার রাজীব বানু জানালেন এটা প্রথম বলে এই সেমিনারের নাম রেখেছেন “SEMINARCH I” আলোচনা হবে মহাবোধি সোসাইটি হলে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জ্ঞানের দেবীদের কথা বলবেন বিভিন্ন ইতিহাসবিদ এবং পুরাতত্ব গবেষকেরা। আলোচনায় উঠে আসবে বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতায় জ্ঞানের দেবতা হিসাবে নারীকে বেছে নেওয়ার তাৎপর্য। তৎকালীন সমাজে তাঁদের অবস্থান এবং একই ভাবে বর্তমান সমাজে নারীদের অবস্থান নিয়ে তুলনামূলক আলোচনাও হবে।