বিকাশের হাত ধরে আলোর পথে উপজাতিরা

0

‘ভ্যাট ব্রিকশিয়া’-একটি সামাজিক উদ্যোগ, যারা ওডিশার উপজাতিদের সংষ্কৃতি অটুট রেখে নতুন জীবনযাপনে অভ্যস্থ করে তুলতে সাহায্য করছে। এখনও পর্যন্ত তারা উপজাতি বেল্টের চারটি গ্রামে ৩৬৮টি পরিবারের সঙ্গে কাজ করছে। বিকাশ দাস, এই উদ্যোগের যিনি প্রতিষ্ঠাতা, এই রাজ্যেই তাঁর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা এবং এটাই কারণ এই উদ্যোগ নেওয়ার।

বিকাশ দাস
বিকাশ দাস

অতিথি দেব ভব, এই আদর্শে বড় হয়েছেন বিকাশ। এবং সম্পর্কগুলি নিজেদের গোত্রের মধ্যে রাখতে শিখেছেন। ‘আমার যৌথ পরিবার সবসময় সতর্ক করে দিত যাতে স্থানীয় উপজাতি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে না মিশি, না ছুঁই।কারন তারা আদিবাসী’, পুরনো কথা মনে পড়ে বিকাশের। বলে চলেন বিকাশ, ‘ছেলেবেলায় একবার শহরে এক মন্দিরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। এক বৃদ্ধা তাঁর নাতি নিয়ে মন্দিরে ঢুকতে যাচ্ছিলেন। একজন তাঁকে লক্ষ্য করে গালিগালাজ করল এবং তারপর প্রায় ঘাড় ধরে ধাক্কা মেরে মন্দির থেকে বের করে দেয়, কারন তারা অপরিষ্কার, নোংরা’। এই ঘটনা বিকাশের মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল যা আর পিছু ছাড়েনি।

বড় হয়ে বিকাশ সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি হলেন, আইবিএমে আইটি কনসালটেন্ট হিসেবে চাকরি পেলেন। সব নিয়ে ভালই ছিলেন। কিন্তু ছোটবেলায় উপজাতিদের সম্পর্কে যে প্রশ্নগুলি মনে গেঁথে গিয়েছিল তাতো মুছে যায়ইনি বরম দ্বিগুন হয়েছে। ২০১৩য় চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ঠিক করলেন, উপজাতি এবং তাদের জীবনধারা বুঝতে তাঁর সবটা সময় দেবেন এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে গঠনমূলক কিছু করতে চান। ‘যদিও ছোটবেলায় খুব কাছ থেকে আদিবাসীদের দেখেছি কিন্তু তাদের সঙ্গে মিশতে পারিনি। মনে হত কাচের মধ্য দিয়ে আমি তাদের সমস্যাগুলি দেখছি। ওদের সমস্যা নিয়ে মনে মনে ভেবেছি। কিন্তু অনুভব করতে পারিনি। স্মরণকালের অতীত থেকে তারা ব্রাত্যই। সিদ্ধান্ত নিলাম উপজাতিদের মতন করে তাদের গ্রামে দুমাস কাটাবো। জীবনে প্রথমবার এত ক্ষিধে অনুভব করলাম। হতাশাজনক, ভয়ঙ্কর সেই অভিজ্ঞতা। তাপরই বুঝলাম আসল সমস্যা কোথায়। শিখলাম বিত্ত থাকলেই সুখি হওয়া যায় না, তিনি বলেন।

‘উপজাতিদের বহুমুখী সমস্যা এবং সেসব লিখতে গেলে একটা গোটা বই লেখা হয়ে যাবে। বংশানুক্রমে সমস্যাগুলি হল-ভৌগলিক একাকিত্ব, বেকারত্ব, ভূমিহীনতা, অশিক্ষা, অপুষ্টি, শারীরিক সমস্যা, শৌচাগারের অভাব, অলাভজনক চাষবাস, ফড়ে, ব্যবসায়ী এবং মহাজনের কাছে ঠকে যাওয়া। আমাদের সংস্থা উপজাতিদের সমস্যা মেটাতে তাদের সঙ্গে খুব কাছ থেকে কাজ করে’, জানান বিকাশ। ‘ভ্যাট ব্রিকশয়া’ প্রথমেই যেটা করল, আদিবাসীদের জন্য বিকল্প রোজগারের রাস্তা তৈরি করে দিল যাতে পরিবারগুলি তাদের নুন্যতম প্রয়োজন মেটাতে পারে। প্রথমে ২০০০ টাকার একটা তহবিল গড়ে তাতে বাকি পরিবারগুলি সামর্থ্যমত আরও টাকা তুলে দিল। বিকাশ ব্যাখ্যা দেন, ‘প্রাথমিক পুঁজি খুব অল্প ছিল। কিন্তু নানা কাজে উপজাতিদের দক্ষতায়, বিশেষ করে মহিলারা রোজগার করতে থাকায় সেটা আগের চেয়ে তিন চার গুন বেড়ে গেল’। প্রথম লক্ষ্য ছিল কৃষি। ‘একফসলি (একবার ফসল নষ্ট হয়ে গেলে, দ্বিতীয় কোনও রোজগারের পথ থাকে না)চাষের কারণে কৃষকের আত্মহত্যা একটা বড় সমস্যা এখানে। আমরা কৃষকদের কৃষি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিলাম যাতে তারা বহুফসলি চাষের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। এর ফলে ফসল নষ্ট হলেও তাদের বিকল্প রোজগারের পথ থাকে’, ব্যাখ্যা দেন বিকাশ। তাছাড়া, সংস্থা বিশেষ করে মহিলাদের জন্য নানা ব্যবস্থা করে যাতে তাদের দক্ষতার জোরে আয় এবং সাংসারিক কাজ দুটোই সমান তালে চলে। ‘আমরা উপজাতি মহিলাদের তৈরি নানা জিনিস যেমন কারুশিল্প, আচার, শুকনো খাবার, বন্য ফুল-পাতা-মূল থেকে তৈরি ওযুধ বিক্রির জন্য বাজার (মূলত স্টল অথবা শহুরে এলাকার বাজারে)চ্যানেল তৈরি করে দিই’। অন্যান্য প্রজেক্টগুলি হল সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য কাউন্সেলিং যেমন- জন ধন অ্যাকাউন্ট, লোন এবং ভর্তুকি, বাড়িতে অল্প পরিশ্রমে লাভজনক মাশরুম চাষ এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা। ‘লক্ষ্য করলাম যে উপজাতিদের সঙ্গে আমরা কাজ করছি তারা এবার অবিচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছেন প্রায়ই। ঠিক এটাই দেখতে চেয়েছিলাম। ওইটুকুই বড় পাওনা ছিল আমাদের কাছে। তাছাড়া আগে বাচ্চাদের মাঠে কাজ করতে পাঠানো হত। যার ফলে স্কুলছুটের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছিল। কিন্তু এখন সংখ্যাটা ৯৫ থেকে ৩২শতাংশে নেমে এসেছে’, জানান বিকাশ। আর শশুরা যা শিক্ষা পাচ্ছে আস্তে আস্তে তা সারা সম্প্রদায়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

নান কাজ করে স্থানীয় আদিবাসীদের যা আয় তার লভ্যাংশের ১০ শতাংশ ‘ভ্যাট ব্রিকশয়ার’ ফান্ডে যায়। উপজাতি সম্প্রদায়ের ১২ জন মহিলা প্রতিনিধি এই ফান্ডের দেখাশোনা করেন। ‘ফান্ডের টাকা আবার উপজাতিদের কল্যাণে যেমন স্বাস্থ্য এবং শিক্ষায় ব্যবহার করা হয়। প্রতিটা গ্রাম অথবা ইউনিট থেকে একজন করে প্রতিনিধি তাদের সমস্যা সম্পর্কে আমাদের গবেষণায় সাহায্য করে এবং তার কতটা উন্নতি হল সেই সম্পর্কে খোঁজ রাখে। আমাদের কাছে একটা মাসিক পরিসংখ্যান থাকে যাতে শিশুদের ওজন (১মাস-৫বছর বয়সের শিশু), স্কুলে ভর্তি এবং স্কুলছুটের সংখ্যা, পারিবারিক রোজগার, কৃষি উৎপাদন ইত্যাদি ডাটা থাকে। এই ডাটার ওপর ভিত্তি করে পরের মাসের লক্ষ্য স্থির করি’, বলেন বিকাশ। সঙ্গে যোগ করেন, যখন উন্নয়নের নতুন প্রকল্পের সঙ্গে উপজাতিদের পরিচিতি ঘটাচ্ছে তখন তাদের সাংস্কৃতিক দিকটা খেয়াল রেখে বাস্তুতন্ত্রের যাতে পরিবর্তন না হয় বিকাশের সংস্থা সেই দিকটাও খেয়াল রাখে। ‘উপজাতিদের সংস্কৃতি, ভাষা এবং বংশপরম্পরা বাঁচিয়ে রাখা জরুরি’, তিনি বলেন।

কোন কোন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে? বিকাশ বলেন, ‘চাকরি ছেড়ে যখন উপজাতিদের সঙ্গে প্রত্যন্ত গ্রামে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম আমার পরিবার খুব হতাশ হয়েছিল। তারা ভেবেছিলেন আমার কোনও মানসিক সমস্যা হয়েছে। কারণ গরিবদের সাহায্য করার জন্য আমি গরিবদের মতো বসবাস করতে চেয়েছি। যাইহোক পরে তাঁরা আমার কাজের ধরন বুঝতে পেরেছেন’। তবে উপজাতিদের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্যকরা অতটা সহজ ছিল না। ‘আমাকে বহিরাগত হিসেবে দেখত সবাই। সেটা বন্ধ করাতে এবং আমাকের তাদেরই একজন হিসেবে গ্রহণ করাতে অনেকটা সময় লেগেছিল। এখন তারা আমাকে সমর্থন করে, আমার জন্য ভাবে। ঠিক যেন আরও একটা পরিবার। ভাবতে ভালো লাগে আমার এতগুলি পরিবার এবং প্রত্যেকে আমার জন্য যা খুশি করতে পারে,যতদূর খুশি যেতে পারে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, এই সম্মান, শুভেচ্ছা, ভালোবাসা টাকা রোজগারের থেকে অনেক বড় পাওনা, অনেক বেশি আনন্দের’। ‘ভ্যাট ব্রিকশায়া’র স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিকাশ বলেন, ‘যদি ভালো কাজ হয়, টাকা আপনিই আসবে। এভাবেই আমরা এতটা ধরে রেখেছি। আমাদের কাজে আমরা আত্মবিশ্বাসী। উপাজাতিদের ইকোসিস্টেম যতদিন সংরক্ষিত থাকবে, আমাদের টাকাও আসবে’।

বিকাশ শেষ করেন, ‘উন্নয়ন মানে, শহুরে সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া এবং জাতীয় মূলধারার এজেন্ডায় উপজাতিদের নিয়ে আসা নয়। উপজাতিদের সংস্কৃতি বেশ সমৃদ্ধ এবং অনন্য। কিন্তু কালে কালে বিলোপের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উপজাতি সংস্কৃতির সংরক্ষণ প্রয়োজন। ‘ভ্যাট ব্রিকশায়া’ তাদের মূল শক্ত করে, প্রকৃতির শান্তিতে তাদের বাঁচিয়ে রাখার সংস্কৃতিকে অটুট রাখে, যে সংস্কৃতি সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে উপজাতিদের টিকিয়ে রেখেছে এই মাটিতে’।