জুভেনাইল কেয়ারের গল্প :এক টিটেনাস সংক্রমন থেকে দশ হাজার সেচ্ছাসেবক

0

তখন ২০১০ সাল। কলেজে ঢোকার কয়েকদিন আগেকার ঘটনা। বাড়ির কাজের লোকের ছেলের দিকে পেরেক ছুঁড়ে মেরেছিলাম। সেই পেরেকের আঘাতে তাঁর ‘টিটেনাস ইনফেকশন’ হয়ে যায়। নিজের ভুল আমি সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম। ভেবেছিলাম, এ রকম কষ্ট না জানি কত লোক পায়।... কথাগুলি যাঁর তিনি আজ প্রায় ১০ হাজার কর্মীকে নিয়ে বিশাল কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন।


রাহুল প্রসাদ। ২০১০ সালে বেঙ্গালুরুতে জুভেনাইল কেয়ার শুরু করেন। কিন্তু বর্তমানে তাদের বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজ ছড়িয়ে পড়েছে ভেল্লোর, পুণে, নিউ দিল্লি, জয়পুর। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য, বেকার ছেলেমেয়েদের বিশেষ করে কলেজ পড়ুয়াদের জুভেনাইল কেয়ার সঙ্গে যুক্ত করা। এঁদের প্রধান কাজই হল, অনাথ শিশুদের নিয়ে কোনও ওয়ার্কশপ করা, কিংবা বস্তি বা গ্রামে মেডিকেল ক্যাম্প করা অথবা শিক্ষকশিক্ষিকাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। অর্থাৎ দেশের ভবিষ্যৎ-কে সুপ্রতিষ্ঠিত করা।

কী করে এত উৎসাহ পান? এ প্রশ্নের উত্তরে রাহুল ফিরে যান, সেই অভিজ্ঞতায়, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ঘুরে বেড়িয়েছিলেন দিল্লির বিভিন্ন বস্তিতে। দেখেছিলেন, কী সাংঘাতিক দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছেন তাঁরা। শৌচালয়ের অবস্থা খারাপ, চিকিৎসার মান খারাপ, শিশুকন্যাদের সঙ্গে অনৈতিক ব্যবহার, কী নেই সেখানে। আর এর সব কিছুর মূলে যার দায় সবচেয়ে বেশি, সেটা হল অশিক্ষা। সেদিনই রাহুল ঠিক করে ফেলেছিলেন ঠিক কী তাঁকে করতে হবে। কিন্তু শুরু করতে গেলে দরকার শক্ত খুঁটির। কিন্তু প্রথমেই ধাক্কা। যে বহুজাতিক কোম্পানিতে তিনি গিয়েছিলেন কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি (সিএসআর)-এর অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে, তাঁরা রাহুলের সঙ্গে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেন। কারণ সেদিন রাহুল নিজের লক্ষ্য তাঁদের বুঝিয়ে উঠতে পারেননি। কিন্তু সেদিনকার সেই দুর্ব্যবহার থেকেই রাহুল শিক্ষালাভ করেন। আজ ৪০০ টা স্পনসরশীপের মিটিং করে রাহুল কথা বলতে শিখে গেছেন। তাই সিএসআর মারফত মিলছে অর্থসাহায্য। এ ছাড়াও সদস্যদের সদস্যপদের জন্য ১০০-২০০ টাকা তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া হয়। যার পরিবর্তে এই সমাজকল্যাণমূলক কাজের সাক্ষী হতে পারেন তাঁরা। শুধু তাই নয়, ‘পাবলিক রিলেশন’, ‘মার্কেটিং’ এবং ‘কর্পোরেট পার্টনারশিপ’-এর অভিজ্ঞতাও হয় তাঁদের। রাহুলের মতে সুযোগ না পেয়েই আমাদের দেশে কত প্রতিভা হারিয়ে যায়। সেই জন্যই অলিম্পিকে ভারতের স্থান ৫০ এবং আমেরিকা জেতে ৫০টি মেডেল।


জুভেনাইল কেয়ার প্রোজেক্টস

‘প্রোজেক্ট এহসাস’ শিশুশ্রম এবং দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।

‘প্রোজেক্ট কাগজ’ ফেলে দেওয়া কাগজ পুনরায় ব্যবহার করে স্কুল পড়ুয়াদের সাহায্য করার চেষ্টা করছে।

‘প্রোজেক্ট ইউনাইটেড’ প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিশেষ প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত করে।

স্পর্শ, বিদ্যা এবং মুসকান শিশুকন্যাদের সাহায্যের চেষ্টা করে।

জুভেনাইল কেয়ার পদক্ষেপগুলি

২০১০- দেশের যুবকদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পথ চলা শুরু জুভেনাইল কেয়ার-এর। লক্ষ্য, শিশুকল্যাণ।

২০১১- বেঙ্গালুরুর কালাসিপালয়াম প্রোজেক্ট স্পর্শ শুরু করে জুভেনাইল কেয়ার।

২০১২- ভেল্লোরের ভিআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু স্বাধীনতার জন্য নিজেদের কার্যালয় খোলা হয়।

২০১৩- দেশজুড়ে সদস্যসংখ্যা ৩০০০।

২০১৪- সদস্যসংখ্যা ১০০০০ ছাড়ালো।

২০১৫- মার্চে শিক্ষার একটি সম্মেলনের আয়োজন।

পরবর্তী পদক্ষেপ

গৃহবধূদের নিয়ে একটি কার্যক্রমের আয়োজন করা, যাতে বস্তিতে গিয়ে শিশুকন্যাদের শিক্ষা সম্পর্কে সচেতন করা এবং মেয়েদের শারীরিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা।

রাহুলের প্রেরণা

‘সাধারণের সঙ্গে কথা বলেই হোক কিংবা কলেজ পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলেই হোক, আমি সবসময় কিছু না কিছু শেখার চেষ্টা করি। আমি কলেজ পড়ুয়াদের প্রশিক্ষণ দিই, কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিই। কিন্তু যেদিন এই সংগঠন প্রতিষ্ঠা হয়, সেদিন আমাকে কেউ এভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো ছিল না। যখনই সময় পাই, তখনই অনাথ বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটাই। ওদের মুখে হাসি দেখতে পেলে আমার রাতের ঘুম ভালো হয়।’