অনলাইনে বীমা কেনা সোজা করেছে সুবীরের GIBL

14

বাংলা থেকে বাইরে গিয়ে দারুণ সব কাজ করেন অনেকেই। অনেকেই বিদেশে গিয়ে দুর্দান্ত ব্যবসা ফেঁদে বসেন। শেকড় বাকড় উপরে দারুণ চাকরি নিয়ে রীতিমত পার্মানেন্ট এনআরআই হয়ে যান। তারপর সে দেশের অর্থনীতির উত্থান পতনের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে জীবন যাপন করতে থাকেন। ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। বাড়ির সামনের বটগাছ। নদী। বন্ধুদের সঙ্গে করা খুনসুটির মুহূর্ত। ঠাকুমার খাটের তলা থেকে মোরব্বা, আঁচারের বয়াম থেকে আঁচার চুরির কিসসা। কিন্তু যত সময় এগোয়, যত নিউইয়র্ক, লন্ডন, বার্লিন, ডাবলিনের হাওয়ায় দোল খায় ল্যাভেন্ডার, অ্যাসপারাগাস, কিংবা ড্যাফোডিল ততই কাশফুল কেমন দূর থেকে দেখা স্মৃতির তলায় থিতিয়ে যাওয়া নস্টালজিয়া হয়ে যায়। নস্টালজিয়ায় থাকে ছোটবেলা, মেজোবেলা এবং বড় হওয়ার বেলা। জীবনের প্রথম সব কিছুই যেখানে অতীতের হলুদ মলাটে মোড়া। দূর থেকে দেশের কথা ভাবেন বৈকি! বাবা মাকে নিয়ম করে দিনে, দুদিনে কিংবা হপ্তায় একটা ফোন হয়ত করেন। ভুলে যাতে না যান তাই মোবাইলে অ্যালার্ম দেওয়া থাকে। পুজোয় আসেন। কিংবা আসেন না। তবু টান থাকে শেকড়েরই দিকে।

আজ আপনাদের এমন একজন বাঙালি উদ্যোগপতির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব যিনি ফিরে এসেছেন শুধু পরিবারের টানে। বাবার অসুখ, শুনেই তড়িঘড়ি ডাবলিন থেকে উড়ে এসেছিলেন কলকাতায়। বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে গিয়ে টের পান ভারতের পিছিয়ে থাকার ছবিটা। দেখেন ইনসিওরেন্স ক্লেম নিয়ে নানান সমস্যা। গোটা সিস্টেমটাই ভীষণ অস্পষ্ট। এই অস্পষ্টতা দূর করতে নিজেই কোমর বেঁধে নেমে পড়লেন।

দুর্গাপুরের ছেলে সুবীর মুখার্জি। ছোটবেলা থেকেই বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। আর পাঁচটা শিশুর মতই ভাবতেন দ্রুত কীভাবে বড় হওয়া যাবে। দাদা পড়াশুনোর সূত্রে মুম্বাই থাকতেন। সেখানেই পরে কাজ করতেন। বাবা সুবীরকে সাহসী দেখতে চেয়েছিলেন। মাধ্যমিকের পর মুম্বাইয়ে দাদার কাছে পাঠিয়ে দেন। ট্রেনের টিকিট কেটে তুলে দেন ট্রেনে। সে সময় এত ফোন টোন ছিল না। দাদাকে একটা টেলিগ্রাম করে দেন শুধু। সুবীরের বয়স তখন ষোলো কি সতের। বাড়ির অন্যেরা বলেছিল, "সে কি! এতটুকু ছেলে মুম্বাই একা একা যাবে!" বাবা বলেছিলেন, "আলবাত যাবে, কারণ এই বয়সে আকবর সম্রাট হয়ে গিয়েছেন। অ্যালেক্সান্ডার দেশ জয় করতে বেরিয়ে পরেছেন। আর ও একা একা মুম্বাই যেতে পারবে না।" এভাবেই সাহসী স্বাবলম্বী করে তৈরি করতে চেয়েছিলেন সুবীরের বাবা। তারপর একা একা পড়তে আসেন কলকাতায়। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে গণিত অনার্স। তারপর সেখান থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্যে শিবপুর বিই কলেজ। পড়া শেষ হতে না হতেই সফ্টঅয়্যার ডেভেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এমআইএসএল, প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্সের মত সংস্থায় কাজ করেন। অ্যামেরিকান অনলাইন(এওএল)-এ সিনিয়র সফ্টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজের সূত্রে চলে যান আয়ারল্যান্ড। ২০০৩ এ সেখানেই শুরু করেন e-Celtic নামে নিজের সফ্টঅয়্যার সংস্থা। এক এক করে শত পুষ্প বিকশিত হতে থাকে। ২০১০ এ কাতারে অনাবাসী বাঙালিদের একটি অ্যাসোসিয়েশন সুবীরকে প্রথম সম্বর্ধনা দেয়। নিজের উদ্যোগে দেশের বাইরে ব্যবসা করে দুর্দান্ত সাফল্য পাওয়ার প্ৰথম স্বীকৃতি ছিল সেটাই। গ্লোরি অব বেঙ্গল। ২০১২ সালে ডেলয়ট সুবীরের সংস্থা ই কেল্টিককে আয়ারল্যান্ডের Top 10 Fastest Growing Tech Company হিসেবে চিহ্নিত করে। ইকেল্টিকের বানানো একটি সাইট আয়ারল্যান্ডের সেরা ফিনান্সিয়াল সাইট হিসেবে নমিনেটেড হয়। মুকুটে একের পর এক পালক গুঁজতে থাকেন সুবীর মুখার্জি। ২০১৩ সালেই তাঁর সংস্থা আরও একবার Top 20 Fastest Growing Tech Company in Ireland এর সম্মান পায়। কিন্তু ২০১০-১১ সালে বাবার অসুখের সময় ভারতে হেলথ ইনসিওরেন্সের সমস্যাগুলো টের পান। অনলাইনে ইনসিওরেন্স কেনার চেষ্টা করে দেখেন সেটা এদেশে খুব একটা সোজা কাজ নয়। তার ওপর দিদিকে একটা গাড়ি কিনে দিয়েছিলেন, সেই গাড়ির বীমাও ফুরিয়ে এসেছিল। কার ইনসিওরেন্স রিনিইউ করাতে গিয়েও দেখলেন নানান হ্যাপা। ঘরে বসে অনলাইনে সব কাজ করার অভ্যাস ততদিনে রপ্ত করে ফেলেছেন সুবীর। আর বিদেশে বসে বসে পরিবারের নানান প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করতেন। কিন্তু ভারতে বীমা কেনার ব্যাপারে সেটা খাটছিল না। দুএকটি সংস্থা অনলাইনে পলিসি বিক্রির ব্যবস্থা করলেও সেসব খুব একটা লাভদায়ক ছিল না। কারণ অনেক সংস্থার অনেক প্রোডাক্টের মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনা করার অবকাশ থাকে না। এখানেই সাধারণ গ্রাহকদের পেইন পয়েন্ট ধরে ফেললেন উদ্যোগপতি সুবীর।

শুরু করে দিলেন তাঁর নিজের সংস্থা গ্রিনলাইফ ইনসিওরেন্স ব্রোকারেজ লিমিটেড। ২০১০-১১ সালে ভাবনাচিন্তা শুরু করেন। ২০১৩ য় অনলাইনে ইনসিওরেন্স বিক্রির লাইসেন্স পান। পুরোদমে শুরু হয় কাজ। GIBL এখন গোটা দেশ জুড়ে ব্যবসা করছে।

ভুল বুঝিয়ে পলিসি বিক্রির দিন শেষ। হাতের মোবাইল ফোন থেকে যেকোনও সময় এখন চাইলেই পলিসি কেনা যায়। ক্লেম পাওয়াও সোজা করে দিয়েছে সুবীরের সংস্থা। এর ফলে কাস্টমারের সময় এবং পয়সা যেমন বাঁচে তেমনি কোনও সমস্যা ছাড়াই হাজার একটা ডকুমেন্ট ছাড়াই কেনা যায় কার্যকরী বীমার পলিসি। ওদের অ্যাপের মারফত আপনি যোগাযোগ করতে পারেন ইনসিওরেন্স এক্সপার্টের সঙ্গে। তাও ২৪ ঘণ্টা ৩৬৫ দিন।

বারো মাসেই ৫০০০% গ্রোথ রেট। ৯০ হাজার পাতার বিশাল পোর্টাল। এখনই এক লক্ষেরও বেশি রেজিস্টার্ড ইউজার। প্রতিমাসেই গ্রাহক বাড়ছে হুহু করে। দু লক্ষ নতুন ভিজিটার প্রতিমাসে তাঁদের সাইটে আসেন। 

সকলেই পরিযায়ী পাখী নন। তাদের অনেকেই পলিসি কেনেন, উপদেশ চান। অনলাইন ইনসিওরেন্স বাজারের তালিকায় ইতিমধ্যেই দেশের তৃতীয়। প্রতিযোগিতা আছে, কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার রেটটাও আকাশ ছোঁয়া। একগাল হেসে একথাই জানালেন সুবীর। তবে আরও সাফল্যের জন্যে সুবীর এবার খুঁজছেন ভিসি ফান্ডিং। অ্যাঞ্জেল রাউন্ড পার করে দিয়েছেন নিজের পকেট থেকেই। এবার ফান্ডিং পেলে দেশের কোণায় কোণায় পৌঁছে যাবেন দুর্গাপুরের সুবীর এবং তাঁর সংস্থা গ্রিনলাইফ ইনসিওরেন্স ব্রোকারেজ প্রাইভেট লিমিটেড