আত্মবিশ্বাস সমর্পণের বিশ্বজয়ে তুরুপের তাস

0

ক্লাস টেনে পড়ার সময় বাড়িতে প্রথম টিভি আসে। টিভি মানে গোটা বিশ্বের জানালা। রিমোটে আঙুল বোলালেই ফ্যাশন চ্যানেল। নিজেকে আবিষ্কার করে এই মেধাবী ছেলেটি। বড় হয়ে কী হবেন সেটা স্থির করে ফেলেন। ব়্যাম্পে হাঁটবেন। কারণ ওকে ওই ব়্যাম্পই বেশি টানত। পুরুষ মডেলদের স্টাইল, মাসেল আর পারসোনালিটি ওকে মুগ্ধ করে রাখত। বুঝতে পারছিল মহিলা নয়, পুরুষরাই ওঁর আকর্ষণের কেন্দ্র। বাকি অনেকের মতো নিজের সত্ত্বা লুকোয়নি সমর্পণ মাইতি। কাঁটা বিছানো পথ পেরিয়ে এসে প্রমাণ করেছেন মানুষ হিসেবে এই পৃথিবীতে সবার অধিকার সমান। যার কথা বলছি তিনি কলকাতার ছেলে সমর্পণ মাইতি, মিস্টার গে ওয়ার্ল্ড ইন্ডিয়া, ২০১৮-র শিরোপা জিতেছেন সম্প্রতি। একদিকে মডেলিং অন্যদিকে ক্যান্সার গবেষণায় একের পর এক রিসার্চ পেপারে সমর্পণ রীতিমতো বাংলার গর্ব।

মাত্র ২৯ বছর বয়েস। পূর্ব মেদিনীপুরের সিদ্ধা গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন এই ছেলে। ব্রেন ক্যানসারের ওষুধ নিয়ে রিসার্চ করছেন। সেই পেপারের সুবাদেই মেধাবী এই গবেষকের বিদেশে পড়ার দরজাও খুলেছে। সাফল্য ওকে স্পর্শ করেছে। কখনও ও সাফল্যকে ছুঁয়ে দেখেছেন। নিজের শরীরের প্রতি গভীর ভালোবাসা বোধ করেন, পৌরুষের পূজারি এই সমকামী তরুণ জীববিদ্যার গবেষক। বলছিলেন, এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মিস্টার গে ওয়ার্ল্ড ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতার মঞ্চ। সেখানে শিখেছেন অনেক। জীবনের চরম শিক্ষাটাই এসেছে ওখান থেকে। তার নাম কনফিডেন্স। ফাইনাল রাউন্ডে বিচারকরা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তোমার কাছে প্রেমের অর্থ কী?’

বাংলা মিডিয়ামের ছাত্র। ফড়ফড় করে ইংরেজি বলার অভ্যাস নেই। বলছিলেন, প্রথমে বাংলায় ভেবে, তারপর ইংরেজিতে অনুবাদ করে সন্তর্পণে বলেন, প্রেম হল নিজেকে না পাল্টে মনের ভিতর এক অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পাওয়া। দারুণ দর্শন। কিন্তু ইংরেজিটা সড়গড় ছিল না। মুখের ওপর এক বিচারক বলেই বসলেন এই ত্রুটির কথা। মনটা খারাপ হয়ে যায়। গোটা‍ বিকেলটা মনমরা কাটে। সাহস যোগালেন সঞ্চালিকা রোহিণী রামানাথন। বললেন ‘ইংরেজি ভুলে যাও। ভাষা নিয়ে ভাবার কিছু নেই। এখানে ইংরেজি শিক্ষার পরীক্ষা দিতে আসোনি তুমি’, ব্যাস। পেয়ে যান আত্মবিশ্বাসের দাওয়াই। গোটা আবহাওয়াটাই এক লহমায় পাল্টে যায়। একই উত্তর দেন এবার বাংলায়, সবাই মুগ্ধ হয়ে শোনেন, জয়ী হন। পূর্ব মেদিনীপুরের সমর্পণ মে মাসে সাউথ আফ্রিকায় মিস্টার গে, ২০১৮ এর প্রতিযোগিতায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন। সুদর্শন এবং মেধার মেলবন্ধন এই তরুণ মেধাবী যুবক। সমাজের বিরুদ্ধে সত্ত্বার লড়াই করছেন এমন একটি দেশে যেখানে সমকামিতা এখন গোপন বিষয়। এখনও সমাজ সমকামী যুগলকে খোলা মনে মেনে নেয় না। এখনও দুজন মানুষের প্রেমের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় গোটা সমাজ ব্যবস্থা। অথচ কী নিষ্ঠুর পরিহাস দেখুন এই দেশের আইন খোলা মনে মেনে নিয়েছে সমকামিতার দর্শন।

নাতালিয়া পোর্টম্যান, হেডি ল্যালমার এবং গণিতশাস্ত্রের শিক্ষক পিয়েট্রো বোসেলির ভাবশিষ্য এই তরুণ শরীর চর্চার পাশাপাশি দিনের অধিকাংশ সময় কাটান ল্যাবে। নিজের পড়াশুনোর ভিতর। রিসার্চের বিষয় হল গ্লিওব্লাস্টোমা মাল্টিফর্ম, এক ধরণের ক্যান্সার ফর্ম যার শুরু হয় ব্রেন থেকে। পিএইচডি থিসিস প্রায় শেষ। ডিগ্রিটা পেতে সময় লাগবে আরও কিছুদিন। ছেলেবেলার মত টেনশনও করছেন। কলকাতার নামী ইন্সটিটিউটে গবেষণা করেন। আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চের জন্য প্রথম দফা ইন্টার্ভিউ সাফল্যের সঙ্গে পার করে দিয়েছেন। সমর্পণের বাবা—মা কখনও চাননি ছেলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হোন। ছেলেকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। স্বাধীন ভাবে বেড়ে ওঠার মত পরিবেশ দিয়েছেন। বাবা সুদর্শন মাইতি চাইতেন ছেলে লেখক হোক নিদেন পক্ষে সাংবাদিক। লেখা লিখির অভ্যাস ছিল। লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে ওর কবিতা। কিন্তু ওর পছন্দের বিষয় বিজ্ঞান। আর যে কোনও রকম পরীক্ষাই দারুণ এক্সাইটেড লাগে। আইআইটি, IISc বেঙ্গালুরুতে সুযোগ পান। মজা করে তিন তিনবার NET দেন। NET দেওয়ার জন্য মাস্টার্স করা জরুরি নয়। তাই মাস্টার্স পড়তে পড়তেই ২ বার NET দেন, বিদেশি জার্নালে ইতিমধ্যেই স্থান পেয়েছে এই তরুণের দুটি পেপার।

২০১৫ সাল থেকে রোজ ঘণ্টা দেড়েক জিমে সময় কাটান। নিজেকে তৈরি করছেন চূড়ান্ত সাফল্যের জন্যে। মিস্টার গে প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি হচ্ছেন সমর্পণ। স্বপ্ন দেখেছিলেন মডেলিং করবেন। নিজের মধ্যে বদল টের পান ছোটবেলায়। প্রথম লিঙ্গ সত্ত্বা অনুভব করেন তখন তিনি স্কুলে। স্কুলের বাচ্চাদের যৌন শিক্ষার ব্যবস্থা করা ভীষণ জরুরি সেটা নিজের জীবন থেকে টের পেয়েছেন সমর্পণ। কলেজে পড়ার সময় পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গ ভালো লাগত। পেটানো শরীর আর সারল্য মাখা মুখ মহিলাদেরও নজর কাড়ত। নানান মন্তব্য করত মেয়েরাও। মিস্টার গে ওয়ার্ল্ড ইন্ডিয়া জেতার পর সেটা আরও বেড়েছে। অরিয়েন্টেশন বদলের অনুরোধ করে কিছু কিছু এসএমএসও পাচ্ছেন সমর্পণ।

Related Stories