সুদেষ্ণার ‘প্রতিমুখ’ গ্রামবাংলার আয়না

0


প্রতিমুখ। কতগুলি মুখের প্রতিচ্ছবি। প্রতিচ্ছবি এই রাজ্যের গ্রামবাংলার। গ্রামের মানুষের হাসি, কান্না, হার, জিৎ সাফল্যের প্রকাশ এই প্রতিমুখ। প্রতিমুখকে আপনি বলতে পারেন অরাজনৈতিক সংবাদপত্র। যেখানে উঠে আসে প্রত্যন্ত গ্রামের অনামী বাউল শিল্পীর কথা। উঠে আসে প্রচারের অলক্ষ্যে থেকে যাওয়া কারুশিল্পের কথা, কৃষকের চাষবাস থেকে পাথর শিল্পীর কারুকাজ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, অর্থনীতির নানা কথা। শুধু সংবাদপত্রে আটকে না থেকে শিগগিরই মাঠে নেমে কাজ করতে শুরু করছে টিম প্রতিমুখ। গ্রামকে ভিত্তি করেই ইকো ট্যুরিজম, জৈব চাষ, অনলাইন স্টোরও চালু করছে। আর এই সব কিছুর পেছনে মূল উদ্যোক্তা সুদেষ্ণা ভট্টাচার্য, এক সময়ের দাপুটে সাংবাদিক। পেশা বদলালেও মন থেকে সাংবাদিকতাকে বিদায় জানাতে পারেননি কখনও। প্রতিমুখ তাঁরই মস্তিষ্ক প্রসূত। গত এক বছর ধরে প্রতিমুখকে ঘিরে তাঁর স্বপ্নই গোটা টিমকে এগিয়ে চলার রসদ ‌‌যুগিয়েছে।

স্কুলে পড়ার সময় থেকে সানন্দা, আনন্দমেলার মতো জনপ্রিয় ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখতেন। স্নাতক পড়তে পড়তে ৯৬ সালে যোগ দেন সিটিকেবলে। ৯৮ সালে খাসখবরে, সেই সময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যম। কাজ করতে করতেই স্নাতকত্তোর হন। উত্তর নামে একটি কাগজের এডিটর ছিলেন। হঠাৎ পেশা পালটে ফেললেন। যোগ দেন বন্ধন ব্যাঙ্কের জনসংযোগে দায়িত্বপূর্ণ পদে। এখানেই কাজ করতে গিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, খুব কাছ থেকে তাদের জীবনযাত্রা উপলব্ধি করেছেন। বুঝতে পেরেছেন শুধুমাত্র প্রচার পেলে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগুলি এক একটা খনি হয়ে উঠতে পারে। এই ভাবনা থেকে জন্ম ‘প্রতিমুখ’ নামের এনজিওর। খুলে ফেলেন এনজিওর ওয়েবসাইটও, protimukh.org. সুদেষ্ণা বলেন, ‘আমি চাই বিদেশের মানুষ জানুক কী আছে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগুলিতে। তাঁরা এসে থাকুন এখানে। কাছ দেখে দেখুক কী কাজ হচ্ছে এখানকার গ্রামবাংলায়। তাতে যেমন প্রচার হবে, তেমনি গ্রামের মানুষের আয়ের সংস্থান হবে’।

একগুচ্ছ পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিমুখের। বর্ধমান, বাঁকুড়া ছাড়াও নানা জেলার পিছিয়ে পড়া গ্রামগুলির দিকেই মূলত নজর সুদেষ্ণাদের। সংস্থার কর্নধার জানান, ‘পিছিয়ে থাকা কোনও একটি গ্রাম দত্তক নেব আমরা। সেখানকার উন্নয়ন, বাসিন্দাদের আয় বৃদ্ধি, শিক্ষা সবকিছু দেখভালের দায়িত্ব থাকবে আমাদের’। সুদেষ্ণা বলেন, ‘বাঁকুড়ার একটা গ্রামে এত সুন্দর পাথর কেটে কাজ হয়, জানেনই না অনেকে। বেলুড়ে এক শিল্পীকে দেখেছি ঢাকের সঙ্গে বাউল গান করেন। অথচ আমাদের শহর কলকাতার লোকই সেই শিল্পীকে চেনন না। আমি চাই প্রতিমুখের মাধ্যমে তাঁদের প্রচারের আলোয় নিয়ে আসতে। দেশের পাশাপাশি বিদেশের মানুষের কাছে পরিচিতি দিতে’।

সংস্থার বয়েস এক বছর হলেও, গত পাঁচ বছর ধরে চলছে ভাবনাচিন্তা, গবেষণা। প্রথম থেকে এই লড়াইয়ে সঙ্গে ছিলেন আরও তিন তরুণ তুর্কী। সায়ন্তনী, পুলমা, তৌহিদুল। সেই লড়াইয়ে এখন সামিল আরজে স্বাগতা আর ডিজাইনার অমৃতা। এদের অনেকেই কর্পোরেট সেক্টরে মোটা মাইনের নিশ্চিন্ত চাকরির হাতছানি উপেক্ষা করেছেন শুধুমাত্র প্রতিমুখের সঙ্গে থাকবেন বলে। ‘নেশার মতো কাজ করে ওরা সবাই। ওদের দেখে আমিও প্রেরণা পাই’, বলেন সুদেষ্ণা। আর আছেন সংস্থার সিইও শৈলেশ নায়ার। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে থাকেন। শৈলেশ বলেন, ‘কাজের সূত্রে দূরে থাকলেও মন পড়ে থাকে কলকাতার এনজিওটির কাছে। সংস্থার বড় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছি নিজেই। প্রতিমুখের জন্য ফান্ডের ব্যবস্থা করা থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির ভার আমার ওপর’। প্রতিমুখ নিয়ে অনেক ভাবনা, অনেক স্বপ্ন দেখেন এই প্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার। তিনি বলেন, ‘প্রতিমুখ বিপ্লব করতে পারে না, একটা ট্রেন্ড সেট করে দিতে পারে। যা করবে, মানুষই করবে। আমরা পথ দেখিয়ে দেব’। পাশে দাঁড়িয়েছেন আইওসির প্রাক্তন শীর্ষ কর্তা অরুণাচলম। এভাবে সাংবাদিক থেকে শুরু করে নাট্যকার, সংগীত শিল্পী, চিত্রশিল্পী, ব্যবসায়ী নানা জগতের মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন প্রতিমুখের দিকে, শুধুমাত্র সুদেষ্ণা এবং তাঁর সঙ্গীদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে, গ্রামের খেটে খাওয়া হত দরিদ্র মানুষগুলোকে একটু সাচ্ছন্দ্য দিতে।

পরিকল্পনায় রয়েছে ব্রেইল বিপ্লব। কেমন এই বিপ্লব? টিম প্রতিমুখ চায় সব জিনিসের প্যাকেটে অন্য সবকিছুর সঙ্গে ব্রেইল লেখাও থাকবে। বিশেষ করে ওষুধের প্যাকেটে। তার ফলে দৃষ্টিশক্তিহীনদের কোনও প্যাকেটের ওপরে লেখা পড়ার জন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হবে না। সুদেষ্ণা বলেন, ‘একটা প্যাকেটের গায়ে হাবিজাবি কতকিছুই তো লেখা থাকে। তাতে ব্রেইলের জায়গা হবে না, এটা হতে পারে না’। তাছাড়া গ্রামে গ্রামে বাল্য বিবাহ, নাবালিকাদের বিয়ে রোখার ক্ষেত্রেও প্রচার চালাবে প্রতিমুখ। সুদেষ্ণা বলেন, ‘আমি চাই এভাবে গ্রামের সঙ্গে গ্রামকে জুড়ে দিতে। প্রতিমুখ হবে তার আয়না। সেই আয়নায় এই রাজ্যের গ্রামকে দেখবেন বিদেশের মানুষ। একাত্ম হয়ে যাবেন এখানকার মানুষ আর সংস্কৃতির সঙ্গে’।

প্রতিমুখ বাংলার কারুশিল্পীদের মঞ্চ তৈরি করে দেবে, যেখানে তাঁরা নিজেদের পণ্য বিক্রি করতে পারবেন নিখরচায়। পণ্য বিক্রির টাকার একটা অংশ যাবে বাংলার কারুশিল্পীদের উন্নয়নের জন্য। পর্যটকদের জন্য প্রকৃতির কোলে ইকো টুরিজমের ব্যবস্থা করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। গ্রামের বাসিন্দাদেরই কারও বাড়িতে থাকা, সেই বাড়ির বাগানের সবজি খাওয়া, কাছ থেকে চাষবাস দেখা অর্থাৎ পর্যটনের সংজ্ঞাটাকেই পালটে দিতে চান সুদেষ্ণা অ্যান্ড কোং। আরও এক অভিনব উদ্যোগের পরিকল্পনা রয়েছে এই এনজিওর। বাউল, সাঁওতাল, ভাওয়াইয়া, টুসু, ভাদু, সুফি গানের অনলাইন বাজারের ব্যবস্থা করবে প্রতিমুখ। এই শিল্পীরা যাতে প্রচার পান তার জন্য টেক স্যাভি সমাজকে মাটির কাছাকাছি নিয়ে আসার এই উদ্যোগ প্রশাংসার দাবিদার। চাষিদের পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ফড়েদের রাজত্ব ভেঙে দিতে ক্রেতার সঙ্গে বিক্রেতার সরাসরি যোগাযোগ করিয়ে দেবে। এতে কৃষক যেমন পণ্যের সঠিক দাম পাবেন, তেমনি ক্রেতাও সব দেখে শুনে নিজে পরখ করে কেনার ফলে ঠকার আশঙ্কা নেই বললেই চলে।

সমস্যা একটাই। ফান্ডিং। সুদেষ্ণা নিজের পুঁজির ওপর নির্ভর করে অলাভজনক এই সংস্থা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। বিদেশে সুদেষ্ণার এনজিও ইতিমধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। কাজের ধরন পছন্দ হয়েছে অনেকের। ফলে অনুদান নিয়ে এগিয়েও এসেছেন কেউ কেউ। সুদেষ্ণা যদিও বলেন, ‘টাকা কোনও বাধা হবে না। টিমওয়ার্ক আর মনোবলটাই আসল প্রতিমুখের এগিয়ে চলার জন্য’।