বিপন্ন চেন্নাই দেখল সুহৃদের মুখ

0

ঘন অন্ধকার। ল্যাপটপের চার্জও ফুরিয়ে এসেছে। জানলার পাশে বসে জলমগ্ন অচেনা শহরটাকে দেখতে দেখতে চোখ বোলাচ্ছিলাম বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট, টুইটারে। প্রিয়জনকে খুঁজে পাওয়ার আকুতি, দুর্গতদের সাহায্যের বার্তায় ভরে উঠেছিল ইনবক্স। দক্ষিণ চেন্নাইয়ের একটি চারতলা আবাসনের সবথেকে উঁচু ফ্লোরে আমার ঠিকানা। তাই এ যাত্রায় বেঁচে গিয়েছি আমি। একতলার প্রতিবেশীরা কোমর জলে থইথই করছেন।

মাসখানেক আগেও অনাবৃষ্টির জন্যে ঈশ্বরের ওপর কম অভিমান দেখায়নি চেন্নাইবাসী। কিন্তু এখন যা ঘটল তা আসুরিক। মৃতের সংখ্য়া লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এই পরিস্থিতির জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিল না চেন্নাই। বাড়িতে খাবার ছিল, কিন্তু তাতে সাকুল্যে একদিন চলত। ওয়াচম্যান জানাল, ট্যাঙ্কে যা জল রয়েছে তাতে কোনওরকমে রাতটা কাটবে। এদিকে ওভারহেড তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ভয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে আগেই। 

ল্যান্ডলাইন ‘মৃত’। তথৈ বচ মোবাইল নেটওয়ার্কের। ফলে বন্যার প্রথম সন্ধেতেই টের পেলাম কিছুক্ষণের মধ্যে প্রযুক্তি থেকে যোজন দূরে চলে যাব আমরা।

বাড়ির চার দেওয়ালের বাইরে পরিস্থিতি যে আরও ভয়াবহ সেটা আঁচ করতে অসুবিধা হল না। নদী ফুঁসছে। ফলে বাঁধ থেকে গ্যালন গ্যালন জল ছাড়া হচ্ছে। তাতে ভেসে যাচ্ছে সেতু, বড় রাস্তা। কোথাও বাইক সমেত ভেসে যাওয়া অপরিচিত আরোহীকে হাত বাড়িয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন স্থানীয় মানুষ। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ঘর দোড় ফেলে আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়েছেন। লোকমুখে খবর আসছে। 

প্রিয় শহরকে এভাবে প্রকৃতির কাছে পরাজিত হতে প্রথম দেখলাম। শুধু আমি কেন, গত একশ বছরে এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখেনি চেন্নাই। একইসঙ্গে দেখেনি মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা, সাহায্য করার তীব্র বাসনা। এমন আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ দেখে আমরা বিমোহিত। পাশাপাশি সরকারের ব্যর্থতাও দ্রুত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কোনও আগাম পূর্বাভাস ছিল না। ফলে জরুরি ওষুধও সঙ্গে রাখা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে দোকানে বলেও লাভ হত না। কিন্তু আমার অন্যান্য আত্মীয়দের কথা চিন্তা করে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। বিশেষ করে আমার এক মাসি ও তাঁর পক্ষাঘাতে আক্রান্ত স্বামীর দুরাবস্থার কথা ভেবে উদ্বেগ হচ্ছিল। তাঁদের ফোন সুইচড অফ। খোঁজখবর নেওয়ার কোনও উপায়ও ছিল না।

আমার বন্ধু দীপক মার্কিন নিবাসী। ছুটি কাটিয়ে গত সপ্তাহেই চেন্নাই ফিরল। গত চব্বিশ ঘণ্টায় এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্রাম নেয়নি সে। ফোন আর ফেসবুক মারফত উদ্ধারকাজে সহায়তা করার পাশাপাশি, আটকে পড়া মানুষদের কাছে খাবারও পৌঁছে দিচ্ছে। কখনও প্রসব যন্ত্রণায় কাতর মহিলাকে সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছে। আবার অসুস্থ মায়ের জন্য হন্যে হয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার খুঁজতে থাকা ছেলেকে সাহায্য করছে।

সেই দীপক কালিয়াপ্পনই জানাল আমার আত্মীয়েরা যেখানে থাকেন সেখানে সেনা উদ্ধারে পৌঁছেছে। এই খবরে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত না হলেও কিছুটা চিন্তামুক্ত হলাম। গোটা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন। তবু বাইরে থাকা মানুষগুলির সঙ্গে এই দুর্যোগের দিনে কীভাবে যেন একাত্ম হয়ে গেলাম। হলফ করে বলতে পারি, প্রকৃতির রোষ শহরকে স্তব্ধ করেছে ঠিকই, কিন্তু মানবতাকে নয়।

(চেন্নাই থেকে লিখছেন ইভলিন রত্নকুমার, ছবি তুলেছেন তামিল ইওর স্টোরির সাংবাদিক নিশান্ত ক্রিশ, বাংলা অনুবাদ শিল্পী চক্রবর্তী)