ভারতের সৌর-সম্পদকে সৌরশক্তিতে পরিণত করাই দূষণমুক্তির চাবিকাঠি

0

এই সিরিজে শ্রমনা মিত্র তাঁর লেখা বই ভিশন ২০২০ এর একটি অধ্যায় তুলে ধরেছেন। সেখানে স্টার্ট আপদের জন্য ৪৫টি ভাবনার সুলুকসন্ধান রয়েছে যাতে ভর করে ফুলেফেঁপে উঠতে পারে তাঁদের ব্যবসা। ২০২০ সালে বাণিজ্যের দিশা কী হবে তা নিয়েই কাটাছেঁড়া করেছেন শ্রমনা। এভাবে স্টার্ট আপদের সৃজনশীলতা দিশা পাবে বলেই আমরা আশাবাদী।


আজ থেকে প্রায় বছর দশেক আগে যখন দেশের মেট্রো শহরগুলির আকাশে গাড়ি, বাস বা মোটরসাইকেল থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকাতে শুরু করল, তখনই জীবাশ্ম নির্ভর জ্বালানির নেতিবাচক দিক সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল ছিলাম। প্রত্যেক বছর জীবাশ্ম থেকে প্রস্তুত জ্বালানি ২১০৩ কোটি টন কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে ছাড়ে। ক্রমাগত কমতে থাকা সবুজায়ন এর মাত্র অর্ধেক পরিমাণ ‘গরল পান’ করতে সক্ষম। ফলে বছর বছর ১০৬৫ কোটি টন বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে মিশছে। এই কার্বন ডাই অক্সাইডই যে বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী তা বুঝতে খুব বেশি সময় লাগেনি বিশেষজ্ঞদের। এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৬ সালে ৮৬% ক্ষেত্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হত জীবাশ্ম (এরমধ্যে পেট্রোলিয়াম ৩৬.৮%, কয়লা ২৬.৬% এবং প্রাকৃতিক গ্যাস ২২.৯ %) । এরপরই আমেরিকা এবং পশ্চিম ইউরোপ পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনে তৎপর হয়। দিনরাত গবেষণা চালাচ্ছে চিনও। জার্মানির মূল শহরগুলির উপকণ্ঠে খাড়া করা হয়েছে একের পর এক উইন্ড ফিল্ড। ফ্রান্সে গতি পেয়েছে পরমাণু শক্তি উৎপাদন প্রকল্প। এতসব সত্ত্বেও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না বিশ্বের কোনও দেশ। জৈব জ্বালানি তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে ব্রাজিল। কিন্তু ভারত ? বিশ্বজুড়ে যেখানে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কার্বন নির্গমন রোধের তোড়জোড় শুরু হয়েছে, সেখানে ভারত তাদের মূল সম্পদ সৌরশক্তি নিয়ে সেভাবে ঝাঁপাচ্ছে না।

২০০৭ সালের শেষশেষি সবুজ বিপ্লব বিশ্বের নজর কেড়েছিল। অ্যাল গোরের লেখা ইনকনভিনিয়েন্ট ট্রুথ পড়ে সাধারণ মানুষ সৌর-শক্তি সম্পর্কে সচেতন হয়েছিলেন। কীভাবে বাড়ির ছাদেই সোলার প্যানেলের সাহায্যে মানুষ সৌরশক্তি উৎপাদনে সক্ষম তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন অ্যাল গোর। এই ভাবনা আরও প্রসার পেল যখন গোর নিজের কাজের জন্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার এবং নোবেল দুইই পেলেন। ২০০৯ সালের অগাস্টেই আমেরিকার বাড়িতে বাড়িতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠল সোলার প্যানেল। প্রেসিডেন্ট ওবামা বললেন, ‘আমি আমেরিকাকে বিশ্বের সর্বাধিক সৌরশক্তি রফতানিকারক দেশ হিসেবে দেখতে চাই।’ নিউ ইয়র্ক টাইমস ফলাও করে ছেপেছিল প্রেসিডেন্টের সেই বার্তা।

ভারত বছরে প্রায় ২০০ টি রৌদ্রোজ্জ্বল দিন পায় এবং সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বছরে ৫০০০ ট্রিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা শক্তি উৎপন্ন করতে পারে। এই আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও ভারত তার সৌরশক্তিকে সেভাবে কাজে লাগিয়ে উঠতে পারছিল না। শক্তি সংরক্ষণ প্রযুক্তির অভাবের পাশাপাশি এরজন্য দায়ী সরকারি স্তরের অনীহাও। ফিড-ইন-ট্যারিফ‍ এর মাধ্যমে জার্মানি আর স্পেন বিপুল সংখ্যক দেশবাসীকে সৌরশক্তি ব্যবহারে উৎসাহ জুগিয়েছে। অথচ ভারতের বেশিরভাগ গ্রাম ছিল বিদ্যুৎবর্জিত। কেন এই বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গ্রামীণ ভারতের কপালে বিদ্যুৎ জুটল না, তার উত্তর দিতে অপারগ প্রশাসন।

এদিকে উৎপাদনের ক্ষেত্রে আলোকতড়িৎ সেল বা ফটোভোলটেইক সেল ইন্ডাস্ট্রি বেশ কয়েকটি প্রযুক্তিগত বাধা টপকাতে সক্ষম হতে লাগল। এটি সবথেকে সস্তা প্রণালী না হলেও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সূত্র ছিল তা বলাই ‌যায়। আদিশক্তি ছিল এমনই একটি উদ্যোগ। থিন ফিল্ম ফোটোভোল্টেইক সেল তৈরি করেছিলেন এমআইটি‍-র এনার্জি ডিপার্টমেন্টের বিজ্ঞানী। ওবামা প্রশাসনের আর অ্যান্ড ডি গ্রান্টস আর্থিক সহায়তা করেছিল। এই উদ্ভাবনের লক্ষ্যই ছিল ভারতীয় বাজার। সস্তায় এত দক্ষ শ্রমিক বিশ্বের আর কোন দেশই বা দিতে পারে।

আমি এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলাম একেবারেই অন্য উদ্দেশ্যে। লক্ষ্য ছিল, গ্রিড ইলেকট্রিসিটির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে এমন প্র‌ যুক্তির সন্ধান করা যা ভারতে লোভ্য সস্তার মানবসম্পদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে। জার্মানি তার ব্যয়বহুল মানব সম্পদের জন্য ২০১৮ সালেও গ্রিড প্যারিটি-তে পৌঁছতে পারবে না। ভারত কিন্তু ধীরে ধীরে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সক্ষম হবে।

আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, ভারতে থিন ফিল্ম সোলার সেল উৎপাদন করা হবে। উৎপাদন ক্ষেত্র প্রসারের এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছিলাম না আমরা।

সোলার সেল প্ল্যান্ট অনেকটা সেমিকনডাক্টর ফ্যাবের মতোই দেখতে। ৫০ হাজার বর্গ ফুট এলাকা জুড়ে তৈরি করা হয় প্ল্যান্টটি। প্রতিটি ফ্যাব থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল ৫০ মেগাওয়াট।

প্রতি মেগাওয়াটে একটি সোলার সেল প্ল্যান্ট তৈরির আনুমানিক খরচ ২০ লক্ষ মার্কিন ডলার। আমরা ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু এবং মহারাষ্ট্রে নটি থিন ফিল্ম সোলার সেল তৈরি করলাম। আর্থিক সহায়তা মিলেছিল, ইন্ডিয়া ইনফ্রাস্ট্রাকচর ফিন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড, এডিবি, আইএফসির মতো সংগঠনের থেকে।

ইতিমধ্যেই ‘গ্রিন বিল্ডিং’ কনসেপ্টটি গতি পেতে শুরু করেছিল। তাই নগরকেন্দ্রিক বাজারিকরণের ক্ষেত্রে আমাদের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠল নির্মাণ সংস্থা এবং রিয়েল এস্টেট ডেভেলপাররা। ধীরে ধীরে আবাসন বা কর্মসূত্রে ‘গ্রিন বিল্ডিং’-এরসঙ্গে ‌যুক্ত হওয়া ফ্যাশনদুরস্ত গ্রাহকের পরিচায়ক হয়ে উঠল।

ভারত সরকারও উৎসাহ দিতে ডেভেলপার এবং কনজিউমারদের জন্য একইরকম ইনসেনটিভ ঘোষণা করল। যেমন, সোলার ওয়াটার হিটারকে জুড়ে দেওয়া হল বাড়ির মিটারের সঙ্গে। ফলে বিদ্যুৎ বাঁচাতে উদ্যোগী গ্রাহকরা উপহারস্বরূপ বিদ্যুৎ বিলে রিবেট পেলেন। অন্যদিকে ডেভেলপাররা তাঁদের নির্মাণ শিল্পে সোলার ফিটিংস ব্যবহার করলে লোভনীয় কর ছাড় পাচ্ছেন।

এরপর আমাদের লক্ষ্য ছিল গ্রাম। তবে অন্যভাবে। যে সমস্ত গ্রাম কোনওদিন বিদ্যুৎ দেখেনি, সেখানকার বাসিন্দারাও বাল্বের আলো, গরম জল, টিভি এবং অন্যান্য প্রযুক্তির ছোঁয়া পেল। তখন আর প্রচণ্ড গরমে বৈদ্যুতিন পাখার লোভে সম্পন্ন বাড়িতে ঘেঁষতে হত না। কার্পেট, ঝুড়ি বানিয়ে যাঁদের দিন গুজরান হয় তাঁদের আর সূর্যের আলোর জন্য হাপিত্যেশ করতে হল না। সন্ধে এমনকী রাত জেগেও কাজ করে বাড়তি উপার্জন করতে লাগলেন তাঁরা। ধীরে ধীরে ভারতের গ্রামে গ্রামে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে সৌরশক্তি। সরকারি নীতিতে বরাদ্দ জুটছে। গ্রামীণ ভারতে সোলার প্যানেল এখন জল-ভাত।

আদিশক্তি আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কর্পোরেশন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। শুধু লাভ করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। খিদে ছিল উন্নতির, চ্যালেঞ্জ ছিল সমাজকে এগিয়ে নিয়ে ‌যাওয়ার। ২০৫০ সালের মধ্যে ১০০ শতাংশ সৌরশক্তি নির্ভর অর্থনীতি হিসেবে ভারতকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তা গ্রামীণ ভারতের ‘রুরাল ইউটিলিটি‍’ হোক বা শহরের ‘গ্রিন বিল্ডিং’। আশাবাদী, অন্ত্রেপ্রেনিওর থেকে সরকারি আধিকারিক—সকলেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করে দেশকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের লক্ষ্যে নিয়ে ‌যাওয়ার জন্য ঝাঁপাবেন।

লেখক শ্রমনা মিত্র

অনুবাদ শিল্পী চক্রবর্তী