সিলিকন ভ্যালিতে এক ভারতীয় মহিলার জয়জয়কার

0

এক সদ্যোজাত সন্তান থাকা আর এক নতুন ব্যবসা চালু করার মধ্যে অনেক মিল আছে। কারণ এদের বড় করে তোলার হ্যাপাগুলো অনেকটা একরকম। অন্তত এমনই মনে করেন এক সদ্যোজাত সন্তানের মা ও ১২ মাসের একটি ব্যবসার অন্যতম জন্মদাতা রায়না কুমরা। নিজের বক্তব্য ‌যে কতটা সঠিক তার প্রমাণ দিতে গিয়ে বেশকিছু উদাহরণ তুলে ধরেছেন তিনি। যেমন, প্রতি ছ’সপ্তাহে শিশুদের দাঁত ওঠার ব্যথা হয়। আর প্রতি ছ’মাসে মনে হয় সব সমস্যা মিটে গেছে। আবার কখনও মনে হয় সন্তান খুব দ্রুত বেড়ে উঠছে। এককথায় সন্তানের বেড়ে ওঠা হোক বা ব্যবসার বেড়ে ওঠা। দুই ক্ষেত্রেই দম নেওয়ার ফুরসত পাওয়া দুর্লভ।

ইন্টারনেটের ডেটা খরচের অঙ্কটা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অনেকটা কমিয়ে এনে পরিষেবা দিতে সিলিকন ভ্যালিতে জন্ম নেয় মাভিন। সেই নতুন সংস্থা দেখতে কেমন হবে তা ডিজাইন করা থেকে শুরু করে ব্যবহারকারীদের কেমন লাগছে তা বোঝা, সবই ছিল রায়নার দায়িত্বে। সেইসঙ্গে তাঁকে সংস্থার ব্রান্ড ও মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিও সামলাতে হত সমানতালে। কিন্তু মাভিনে তাঁর কাজ সম্বন্ধে জানার আগে রায়নার প্রথম জীবন ও পদে পদে সামনে আসা চ্যালেঞ্জগুলোকে অতিক্রম করে তাঁর সামনের দিকে এগিয়ে ‌যাওয়ার দিনগুলোয় চোখ রাখা জরুরি।

ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্ম হলেও ভারতের সঙ্গে নাড়ির টান তাঁকে প্রতি বছর টেনে আনত এখানে। লুধিয়ানায় তাঁর ঠাকুরদা ঠাকুমার কাছে প্রতি বছর ছুটিতে বেড়াতে আসতেন রায়না। বড় শহর তাকে সব সময়ে আকর্ষিত করত। রায়নার বিশ্বাস বৈচিত্রের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সৃজনশীলতা বীজ। বিশ্বর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কাজের সুবাদেই অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ হয়। আর সেই অভিজ্ঞতার হাত ধরেই আজ তিনি সফল বলে মনে করেন রায়না।

মার্কিন মুলুকে বিবিজি বা ব্রডকাস্টিং বোর্ড অফ গভর্নরসের ইনোভেশন বিভাগের কো-ডিরেক্টর হিসাবে কাজ করেছেন তিনি। মিডিয়ার ভবিষ্যত নিয়ে বারাক ওবামার জন্য একটি উপদেষ্টা মণ্ডলের সদস্য হিসাবেও কাজ করেছেন রায়না। এভাবে চলতে চলতে ২০০৬ সালে রায়না কুমরা শুরু করেন একটি উদ্ভাবনী কনসালটেন্সি ‘জুগারনাট’।

ফিল্ম এণ্ড টেলিভিশন নিয়ে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএস করেন রায়না। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারঅ্যাকটিভ টেলিকমিউনিকেশনসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান। এছাড়া ডিজাইন স্টাডি নিয়েও পড়াশোনা করেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত রায়না কুমরা।

রায়নার মতে, তিনি এবং তাঁর তৈরি টিম চাইছিল ইন্টারনেটকে সকলের কাছে পৌঁছে দিতে। সেই লক্ষ্যেই জন্ম নেয় মাভিন। কারণ তাঁদের মনে হয় আধুনিক দৈনন্দিন জীবনে ইন্টারনেট একটি আবশ্যিক উপাদান। যা ছাড়া এক মুহুর্তও চলা কঠিন। অথচ খতিয়ান বলছে এখনও বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন না। সকলের কাছে সহজে ও কম খরচে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার জন্যই একটি সিম্বলিক সিস্টেম তৈরি করেন তাঁরা।মাভিনের তৈরি পণ্য ‘জিগাটো’ একটি এমন অ্যাপ ‌যা ব্যবহারের সুযোগ কেবলমাত্র প্রিপেড ব্যবহারকারীরাই পাবেন। অ্যান্ড্রয়েডের জন্য যা বিনামূল্যে ইন্টারনেট ডেটা দিয়ে থাকে। গুগুল ও মাইক্রোসফটের থেকে আসা প্রায় ১০ জন দক্ষ ব্যক্তিকে নিয়ে গড়ে ওঠে মাভিন। ‌যারমধ্যে ছিলেন সৃজনশীল দিক দেখার লোক, ডিজাইনার ও প্রোডাক্ট নিনজা।

একজন উঠতি ব্যবসায়ীর মতই তাঁকে ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। সে লগ্নি নিয়েই হোক বা কাউকে তাঁর সংস্থায় আনাই হোক, সে মাল্টিটাক্সিং হোক বা স্কেলিং। প্রযুক্তির জগতে মহিলাদের সংখ্যা যে নগণ্য তা মেনে নিচ্ছেন রায়নাও। তাই সুচিন্তিতভাবেই সংস্থায় মহিলাদের নিয়োগ, তাঁদের যাবতীয় দিক থেকে সহযোগিতা করার দিকে বিশেষ নজর রাখেন রায়না । রায়নার মতে, প্রয়ুক্তির জগতে কোনও মহিলা যাতে তাঁর অভিষ্ট লক্ষ্য ছুঁতে পারেন সেদিকে তিনি বিশেষ নজর রাখেন। জীবনে দু’টি নিয়ম তিনি মেনে চলেন। নিয়ম এক, তিনি কখনও বিনা পয়সা কোনও কাজ করেন না। আর নিয়ম দুই, বিনা পয়সায় তখনই কাজ করেন য‌খন কোনও মহিলাকে তাঁর সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে তিনি উপদেশ থেকে অন্যান্য সাহা‌য্য দিয়ে থাকেন।

রায়না কুমরার কাছে তাঁরাই হিরো যাঁরা স্বপ্ন দেখেন, সেই স্বপ্নকে সার্থক করার পিছনে ছোটেন, সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেন এবং বিশ্বকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যান। নিজের জীবনে সব চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করে এগিয়ে চলা রায়না তাঁর সাফল্যের পিছনে স্বামীর অবদানকে অকুণ্ঠভাবে স্বীকার করতে ভালবাসেন। তাঁকে সঠিকভাবে বোঝা এবং তাঁকে একজন ভাল মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য স্বামীকে সব কৃতিত্ব দিতে চান রায়না কুমরা।

Related Stories