জীবনের শুরুয়াতি থেকেই লড়াই নাসিরুদ্দিন, নীলমদের

0

আলাপ করুন নাসিরুদ্দিনের সঙ্গে ও পড়ে কলকাতার বড়তলা হাইস্কুলে। পাশাপাশি সকাল-সন্ধ্যা মিলিয়ে বেশ কয়েক ঘণ্টা ঠোঙা বানায়। যে টাকা রোজগার হয়, তা দিয়ে পড়াশোনার খরচ উঠে আসে। ওর মতই ১৭ বছরের নীলম সাউ। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। নীলম একমনে ঠোঙা বানায়। নানা ধরনের হাতের কাজের মজুরি তুলে বাড়িতে নিজের ভরণপোষণের খরচ তুলে দেয়। নীলম বা নাসিরুদ্দিনদের অনেক মিল। মানসিক প্রতিবন্ধী। মনোবিকাশের ছাত্রী নীলমের মা পুষ্পা সাউ বলছিলেন, তিনিও ঠোঙা বানান। স্বামী অসুস্থ। এককেজি ঠোঙা বানালে ৬ টাকা হয়। তাই বা কে যেচে দেয়!

এখান থেকেই নীলম, পরী, স্বান্তনা বা জীবন, তাপস, নাসিরুদ্দিনদের গল্প শুরু করলাম। ওরা একা নয়, ওরা অনেক। ওরা কলকাতার সন্তান। ঘিঞ্জি গলির, ধুলোয় ধুসরিত বস্তির বাসিন্দা। অনুন্নত এলাকার দরিদ্র পরিবারের সন্তান-সন্ততি। এটাই একমাত্র পরিচয় নয়। আরও পরিচয় আছে। এই প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোররা সকলেই স্কুলে পড়ে। কেউ দৃষ্টিহীনদের স্কুলে, কয়েকজন পড়ছে মানসিক প্রতিবন্ধীদের স্কুলে। তবে চেহারায় বা আচরণে কোনও হীনমন্যতার ছাপ নেই। কারণ ওরা কাজ করে। 

কামাই না করে স্কুলে যাওয়া, পাঠ্যবইয়ের পড়া আত্মস্থ করার পরে যেটুকু সময় বেঁচে যায়, ওরা সেই সময়ে কাজ করে। 

কেউ ঠোঙা তৈরি করে। কেউ পুঁতির মালা গাঁথে, কেউ বা পেপারব্যাগ বানায় কিংবা ফাইল তৈরি করে। রোজগার স্বল্প। যেমন, ১৫০ পিস ঠোঙা বানিয়ে ৬ টাকা মেলে। ওই টাকায় যেভাবে চলার কথা সেভাবেই চলে পড়ার খরচ। ওরা পড়তে চায়। আর পাঁচজন স্বাভাবিক মানুষের মতো মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায়। নাসিরুদ্দিন মল্লিক ওদেরই একজন। মা বাড়ি বাড়ি পরিচারিকার কাজ করেন। বাবার রোজগার অনিয়মিত।

সোসাইটি ফর ভিস্যুয়াল হ্যান্ডিক্যাপডের স্পেশাল এডুকেটর স্মৃতি মাকড় এবং রীতা রায় জানালেন, দরিদ্র মানুষ প্রতিবন্ধী হওয়া মানে সামাজিক নানান ক্ষেত্রে তার পিছিয়ে পড়া। ছেলেমেয়েরা দরিদ্র এবং প্রতিবন্ধী হিসাবে চিহ্নিত হয়ে যাতে আরও পিছিয়ে না পড়ে, সেই উদ্দেশ্যে কাজ করছি আমরা। ওদের পাশে থাকার জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মানসিক প্রতিবন্ধীদের ভোকেশনাল ট্রেনিং আরও জরুরি। না হলে ওরা জীবনের মৌলিক স্কিল হারিয়ে ফেলবে। নানান সময় রাজ্যজুড়ে যে মেলা হয়, সেখানে প্রদর্শিত হয় প্রতিবন্ধীদের হাতের কাজ। অনেকেই কেনেন। রীতা জানালেন, পুঁতির মালার দাম ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের হাতের তৈরি ফাইল কিনছে।

প্রতিবন্ধীদের একটা বড় অংশ নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়ে। শিক্ষা-সহ অন্যান্য প্রাথমিক যোগ্যতা লাভ করতে একজন প্রতিবন্ধীর তত্ত্বাবধায়ক বা স্পেশাল এডুকেটরের সহায়তা লাগে। দৃষ্টিহীন পড়ুয়া রাইটার ছাড়া পরীক্ষা দিতে পারবে না। রাইটার ছাড়াও বধিরান্ধদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন একজন ইন্টারপ্রেটার। বহিরান্ধ ছেলেমেয়েরা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে কথা বলেন। ওদের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত এডুকেটরের। প্রতিবন্ধীদের সুষ্ঠভাবে লালন-পালন করাটা যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ।

স্পেশাল এডুকেটর স্মৃতি মাকড় জানালেন, একজন শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোরের দেখভালের জন্যে অভিভাবকদের পৃথক বাজেট রাখতে হয়। ইচ্ছা থাকলেও দরিদ্র অভি‌ভাবকরা বহুক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের জন্যে দরকারি খরচও জোটাতে পারেন না। ফলে সেই ছেলেটি বা মেয়েটি জীবনযুদ্ধে নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। সোসাইটি ফর দি ভিস্যুয়ালি হ্যান্ডিক্যাপড বা এসভিএইচ-এর কলকাতার অফিসে বেলা বারোটার পরে গেলে দেখতে পাবেন, কিছু টাকা রোজগারের আশায় প্রতিবন্ধী কিশোর-কিশোরীরা হাতের কাজ করছেন। 

প্রতিবন্ধীদের তৈরি জিনিসপত্রগুলি দেখতে ভালো এবং শিল্পসন্মত। রুচির স্পষ্ট ছাপ আছে। তা সে সুতির রুমা‌লই হোক কিংবা রঙিন পামথরের ছোট মালা, সবেতেই যেন শিল্পসুষমা ছুঁয়ে আছে। আর্থ-সামাজিক নিরিখে এখনও ওরা অকিঞ্চন। 

তবে জীবনের শুরুয়াতিতেই ওরা টের পেয়েছে, লড়াই না করলে পায়ের নীচে মাটি আসে না। তথাকথিতভাবে প্রতিবন্ধী বলি যাদের, তাদের বোধশক্তি য‌ে‌ কোনও সাধারণ মানুষের শিক্ষণীয় হতে পারে।