গুগল হোক বা ফ্ল্যাশড্রাইভ - ডিজিটাল দুনিয়ার বিবর্তনে ভূমিকা নিয়েছেন যেসব ভারতীয়রা

0

অনেকসময়ই এরকমটা দেখা গেছে যে একটা ছোটো বদল বড়সড় পরিবর্তন এনেছে মানবসভ্যতার ইতিহাসের গতিপথে। ‘মেকানিকাল’ এর পরিধি ছেড়ে আমরা পা রেখেছি ডিজিটাল দুনিয়ায়। আগে যেসব কাজ করার জন্য বিবিধ যন্ত্রপাতি, গিয়ারের প্রয়োজন হত, এখন সেই সমস্তটাই করা সম্ভব হচ্ছে ট্রানজিস্টর মারফত। মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে ফ্লপি ডিস্ক ও সিডি ছেড়ে আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি মেমরি কার্ডের ব্যবহারে। সেলফোন এবং ঘড়িও আজ কম্পিউটারের থেকে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছে। সেই কম্পিউটার, যা অতীতে ঠান্ডা যুদ্ধের আমলে ব্যবহৃত হত মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর জন্য।

প্রযুক্তিজগতে অবদানের নিরীখে ভারতের ভূমিকা রীতিমত তাৎপর্যপূর্ণ – তা সে নতুন কোনো প্রোটোকল তৈরি করা হোক কিংবা সময় বাঁচানোর জন্য কোনো নতুন উদ্ভাবনীই হোক। এবং বিশ্বজুড়ে ব্যপকভাবে ব্যবহৃতও হচ্ছে এই উদ্ভাবনগুলি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেটা হয় যে, দৈনন্দিন জীবনে আমরা নানান প্রযুক্তির ব্যবহার করলেও, সে প্রযুক্তি তৈরি করার পিছনে যাদের শ্রম জড়িয়ে রয়েছে, বিস্মৃত হই সেইসব মানুষগুলির কথা। আসুন, এমন ছয় জন ভারতীয় উদ্ভাবকের কথা বলা যাক, যাঁদের সৃষ্টি সহজ করেছে আমাদের জীবনকে।



বাঁদিক থেকে - শিব আইয়াদুরাই, কৃষ্ণা ভারত, অজয় ভাট, ডঃ নরিন্দর সিং কাপানি, অমিত সিঙ্ঘল, অরুণ নেত্রাবলি
বাঁদিক থেকে - শিব আইয়াদুরাই, কৃষ্ণা ভারত, অজয় ভাট, ডঃ নরিন্দর সিং কাপানি, অমিত সিঙ্ঘল, অরুণ নেত্রাবলি

অজয় ভাট – অজয় ভাট USB (ইউনিভার্সাল সিরিয়াল বাস) স্ট্যান্ডার্ড এর উদ্ভাবক। ইন্টেলের ওনাকে নিয়ে একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করার মধ্যে দিয়ে উনি উঠে আসেন প্রচারের আলোয়। USB ছাড়াও অজয়ের উদ্ভাবনের তালিকায় রয়েছে PCI এবং AGP (অ্যাক্সিলারেটেড গ্রাফিক্স পোর্ট) ইন্টারফেস। AGP ইন্টারফেস কম্পিউটারের সাথে এক্সটার্নাল গ্রাফিক্স কার্ডের আদানপ্রদানের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।

শিব আইয়াদুরাই – শিব আইয়াদুরাই মাত্র ১৪ বছর বয়সেই ইমেল তৈরি করেন। এটা কিন্তু ইলেকট্রনিক মেসেজিং এর কথা বলা হচ্ছেনা। বলা হচ্ছে ‘ইমেল’ এর কথা। কিন্তু ইমেল এর আবিষ্কর্তা হিসাবে ওনার কথা উল্লেখ করে ওনাকে নিয়ে অনলাইনে কোনো লেখা প্রকাশিত হলে অনেকেই সেটার সত্যতা মানতে চাননি। এবং অনেকক্ষেত্রে অপপ্রচারও হয়েছে তাঁকে নিয়ে। আইয়াদুরাইয়ের ইমেল উদ্ভাবন নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত একটি লেখায় পরবর্তীতে একটি সংশোধনী আনা হয়, যা রীতিমত বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল।

এই লেখাটির মূল শিরোনামেই দেওয়া হয়েছিল ভুল তথ্য । লেখা হয়েছিল যে, “ইমেলের আবিষ্কর্তা হিসাবে” আইয়াদুরাইকে “স্মিথসনিয়ান সম্মানিত করেছে।” কিন্তু ঘটনা হল, ডক্টর আইয়াদুরাই কিন্তু ইলেকট্রনিক মেসেজিং আবিষ্কারের জন্য এই সম্মান পাননি।

সংশোধনীতে বলা হয় যে, তারা ভুল করে আইয়াদুরাইকে ইমেলের উদ্ভাবক বলে উল্লেখ করেছিল এবং আইয়াদুরাইকে ইলেকট্রনিক মেসেজিং এর জন্য সম্মানিত করা হয়নি। কিন্তু ডক্টর আইয়াদুরাই কখনোই নিজেকে ইলেকট্রনিক মেসেজিং এর নির্মাতা বলে দাবি করেননি। বরং তিনি স্বীকৃতি চেয়েছিলেন ইমেলের আবিষ্কর্তা হিসাবে। কিন্তু এখানে ইলেকট্রনিক মেসেজিং এর সাথে ইমেলকে গুলিয়ে ফেলার মধ্যে দিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি।

অরুণ নেত্রাবলি – HDTV স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করার মধ্যে দিয়ে আমাদের দূরদর্শনে আরো স্বচ্ছতা নিয়ে আসার পিছনে রয়েছে যে মানুষটির ভূমিকা, তিনি হলেন অরুণ নেত্রাবলি। বেল ল্যাবরেটরীতে তিনি অনেক যুগান্তকারী কাজ করেছেন, এবং তার মধ্যে দিয়েই গড়ে উঠেছে আজকের HDTV টেকনলজি। অসংখ্য টিভি চ্যানেল নিজেদের ব্রডকাস্টের জন্য অরুণের তৈরি করা ভিডিয়ো এনকোডার ব্যবহার করে। উনি NASA তে কাজ করেছেন। পড়িয়েছেন MIT তেও। এবং প্রযুক্তি দুনিয়ায় অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন ভারত সরকারের পদ্মভূষণ সম্মান।

কৃষ্ণা ভারত – ২০০১ এর ১১ সেপ্টেম্বর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বিমান হানার ঘটনার সময় কৃষ্ণা ভারত ইন্টারনেটে এই বিমান হানার ঘটনার উপর সংবাদ খুঁজছিলেন। এবং সেইসময় পর্যাপ্ত পরিমাণ সংবাদ সূত্রের অনুপস্থিতি দেখেই তিনি পরিকল্পনা করেন গুগল নিউজ গড়ে তোলার। তিনি গুগলের একটি রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্ট সেন্টারও তৈরি করেছেন বেঙ্গালুরুতে। তাঁর উদ্ভাবনীর তালিকায় আরো যা রয়েছে, তা হল হিলটপ অ্যালগোরিদম। গুগল নিউজে সংবাদগুলির ক্রম কেমন হবে, তা নির্ধারণের জন্য এই অ্যালগোরিদম ব্যবহৃত হয়।

অমিত সিঙ্ঘল – কৃষ্ণা ভারতের অনুরোধে গুগলের সাথে যুক্ত হওয়া অমিত সিঙ্ঘলের উপর অনেকখানি নির্ভর করছে গুগলের ব্যবসায়িক আদানপ্রদান ও সাফল্য। গুগল সার্চের বিষয়টি সম্পন্ন হয় ওনার তত্ত্বাবধানে। গুগলের কুখ্যাত ‘পেজ র্যা ঙ্কিং অ্যালগোরিদম’, যা একভাবে দেখলে বিশ্বের বিপুল অংশের জনমত গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, সেই অ্যালগোরিদম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রয়েছে অমিতের উপর। ২০০১ এ তিনি ‘গুগল সার্চ’ কে তিনি নতুনভাবে সজ্জিত করেন। এবং এই কাজের জন্য ভূষিত হন ‘গুগল ফেলো’ সম্মানে। সাম্প্রতিক একটি ঘোষণায় অমিত কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ডক্টর নরিন্দর সিং কাপানি – কমিউনিকেশান ব্যবস্থাকে আরো দ্রুততর করে তোলার পিছনে ডক্টর নরিন্দর সিং কাপানির ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যে প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে ফাইবার অপটিক কেবল তৈরি হয়েছে, ডক্টর কাপানি ছিলেন সেই প্রযুক্তি নির্মাতাদের মধ্যে একজন। ফাইবার অপটিকস এর পথিকৃৎ হিসাবেও তিনি পরিচিত। ১০০’র অধিক পেটেন্ট রয়েছে ওনার নামে এবং উনি ব্রিটিশ রয়াল অ্যাকাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এর একজন ফেলো।

উদ্ভাবনী ও সৃজনশীলতার নিরীখে ভারতীয়রা সর্বদাই এগিয়ে রয়েছে। আমাদের যেটা দরকার, সেটা হল কেবলমাত্র একটা উপযুক্ত পরিবেশ। এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, যে এতক্ষণ আমরা যেসমস্ত ভারতীয় উদ্ভাবকের কথা বললাম, তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই তাঁদের উদ্ভাবন সম্পন্ন করেছেন ভারতের বাইরে। এবং ভারতের ক্ষেত্রে দেখলে, এখানে অনেককিছু তৈরি হলেও, অনেক নতুন জিনিস গড়ে উঠলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা সামনে আসেনা, প্রচারে আসেনা।



লেখক – আদিত্য ভূষণ দ্বিবেদী

অনুবাদ – সন্মিত চ্যাটার্জী