দুর্ভাগ্যের চোয়াল ভেঙে দিতে চান বক্সার পুই

0

সবার মুখে এখন পুই। মেরি কমের পর আরও একটি তারা খুঁজতে চাইছে ভারত। যে ঘুসি মেরে ভেঙে দিতে চায় হতভাগ্য দারিদ্রের দাঁত। পুইকে এখন সবাই চেনেন। উত্তরপূর্বাঞ্চলের অসংখ্য নিরন্ন দরিদ্র মেয়েদের মতোই পুইয়ের মায়ের জীবন। হত-দরিদ্র মত্ত বাবা একদিন ছেড়ে চলে গিয়েছে। চারচারটে ভাই বোনকে নিয়ে অথৈ অসহায়তায় পড়েছেন পুইয়ের মা। তিনজনকে আত্মীয়দের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে রীতিমত তাদের দুবেলা দুমুঠোর জন্যে রীতিমত খেটে খেতে হয়। আর ছোট মেয়ে পুই, পুরো নাম ভানলালহৃয়াতপুই এতই ছোট যে খেটে খাওয়ার মুরোদ নেই। তাই তাকে কেউ নিতে চায়নি। অসহায় মা রাগে দুঃখে বছর চোদ্দর মেয়েকে রাস্তায় বের করে দিয়েছেন। পুইয়ের জীবন এভাবেই শুরু। তারপর মিজোরামের এই ছোট্ট মেয়েটির সঙ্গে ওই রাস্তাতেই দেখা হয়ে যায় ভাস্কর চন্দ্র ভট্ট নামের এক বক্সিং কোচের। তিনিই বলেন, বক্সিংটা লড়তে পারলে হিল্লে হয়ে যাবে। বক্সিং রিংয়ে ট্রায়ালে পাশ করতে পারলে থাকা খাওয়ার সমস্যা থাকবে না। মাথা গুজতে পারবে পুই। তাই গিয়ে ট্রায়াল দিল ছোট্ট মেয়েটা। লম্বা লম্বা হাত। শরীরে চিতার মত তেজ। চোখগুলো জ্বলছিল। লড়াকু তেজি পুইয়ের মধ্যে জান খুঁজে পেলেন সাইয়ের সিলেকশন কমিটি। এক মুহূর্তে বদলে গেল জীবন। শুরু হল নিরাশ্রয় ভানলালহৃয়াতপুইয়ের বক্সার পুই হয়ে ওঠার কাহিনি। সাইয়ের সৌজন্যে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেল পুই। দুবেলা দুমুঠো খাবার পেল।

পুই সাফল্য না পেলে হয়ত এই কাহিনি ব্যাখ্যা করে বলার অবকাশ তৈরি হত না। কিন্তু পুই ওর ছোট্ট হাতের শক্ত মুঠি দিয়ে তুবড়ে দিয়েছে সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে। একের পর এক প্রতিযোগিতায় সোনা নিয়ে এসেছে। কোচ ভাস্কর চন্দ্র ভট্টর মুখ উজ্জ্বল করেছে মেয়েটি। ২০১৪ সালের সেই পুই এখন পরিণত বক্সার। স্কুল গেমসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সার্বিয়ায় ৬০ কেজির ক্যাটাগরিতে জুনিয়র আন্তর্জাতিক চ্যাম্পিয়নশিপ ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ টুর্নামেন্টে সোনা জিতে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সবাইকে। সেমিফাইনাল আর ফাইনালে রাশিয়ার সেরা বক্সারদের সঙ্গে মরণ পণ লড়েছে। দেশে যে কজন আলোড়ন সৃষ্টিকারী বক্সার এসেছেন তাদের সঙ্গে প্রায় একই সারিতে বসার জন্য তৈরি হচ্ছে পুই। লড়াইয়ের রিংয়ে তুখোড় মেধাবী আর জেতার খিদেতে ছটফট করা মেয়েটাকে নিয়ে আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন ভারতীয় মেয়েদের ‘ইয়ুথ’ অর্থাৎ অনূর্ধ্ব-১৮ বক্সিং দলের প্রধান কোচ ভাস্কর চন্দ্র। ২০০৫ থেকে ২০১২ পর্যন্ত মেয়েদের সিনিয়র দলের দায়িত্বেও ছিলেন বলে মেরি কম, সরিতা দেবী, পিঙ্কি জ্যাংগরা-দের দেখেছেন। তাঁর অধীনেই এখন আছে পুই। ভট্ট বলছিলেন, ওর নিখুঁত পাঞ্চ, অ্যাগ্রেসিভ মুভমেন্ট দেখেই প্রতিপক্ষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে বাধ্য। তারপর তো টেকনিক আছেই। পাশাপাশি ওর ক্ষিপ্রতা আর ওর উচ্চতাও ওকে বাড়তি সুবিধে দেয়। তবে এখনও অনেক রাস্তা যাওয়া বাকি। ১৭ বছরের পুইয়ের সামনে পাখির চোখ হওয়া উচিত অলিম্পিকসে মেডেল। দেশের জার্সি গায় দিয়ে রিংয়ে নামার স্বাদটাই অন্য রকম। পুই বক্সিং বলতে প্রথম প্রথম বুঝত কিক বক্সিং, টাকা রোজগারের মাধ্যম, কারণ টাকার কী মূল্য নিরন্ন নিরাশ্রয় অবস্থায় টের পেয়েছেন মেয়েটা। কিন্তু এখন জীবনে অন্য একটা খিদে ওকে তাড়িয়ে মারছে। সেটা হল সাফল্যের খিদে। দুর্ভাগ্যের চোয়াল ভেঙে দেওয়ার প্রতিস্পর্ধা।