‘ড্রপ আউট’ হর্ষ মনে করাচ্ছে জোবসের কথা

0

মেধাবী ড্রপ আউটদের নিয়ে যদি বিশ্ব একাদশ তৈরি করা যায়, তবে ক্যাপ্টেন কে হবেন? ‘আধ খাওয়া’ অ্যাপেলের স্টিভ জোবস, মাইক্রোসফটের বিল গেটস নাকি ফেসবুকখ্যাত জুকেরবার্গ? প্রত্যেকেই ‘ড্রপ আউট’ বাই চয়েস। অদূর ভবিষ্যতে সেই টিমে ঢুকে পড়তে পারে ভারতের দুই ছেলে-মেয়ে। হর্ষ সোংরা এবং আফরিন আনসারি। দুজনেরই বয়স ১৯। দুজনেই কলেজ ড্রপ আউট। শ্রেয়া শ্রীবাস্তব নামে এক বান্ধবীকে সঙ্গী করে তারা এমন এক অ্যাপস তৈরি করেছেন, যা নাকি ডাকাবুকোদের চোখ ছানাবড়া করে দিয়েছে। ২০১৫ গুটিকয়েক যেকটা স্টার্ট আপ ‘মোবাইস স্পার্ক’-এর তকমা পেয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে হর্ষদের ‘মাই চাইল্ড অ্যাপ’।


‘‘আমরা এখনও স্টার্ট আপের স্তরে রয়েছি, তবে বিনিয়োগকারীরা আমাদের নিয়ে আশাবাদী। আশা করি কমপ্লিট প্রোডাক্ট হিসাবে মাই চাইল্ড অ্যাপকে আমরা তুলে ধরতে পারব।’’ প্রাথমিক সাফল্যের পরও হর্ষ সংযত। শুধু কালো ফ্রেমের চশমায় যেন ঝিকিয়ে উঠল ড্রপ আউটের হিরে-কুচি চোখ। ইতিমধ্যেই বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা পেয়েছে হর্ষদের সংস্থা। বিনিয়োগকারী অমিত গুপ্তার কথায়, ‘‘নিজেদের দুবর্লতা যারা শক্তিতে পরিণত করতে পারে সেই বিরল প্রজাতির মধ্যে হর্ষ হলেন একজন।’’

শৈশবে হর্ষের মধ্যে ধরা পড়েছিল দিসপ্র্যারক্সিয়ার লক্ষ্মণ। এটা হল এমন এক প্রতিবন্ধকতা যার ফলে স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়। স্পষ্ট হয় না কথা-বার্তা। স্মৃতিকোষে চোরকাটা হয়ে আটকে থাকা স্মৃতিগুলোকে মালার মতো গেঁথে হর্ষ জানালেন, ক্লাস সিক্সে ফেল করার কথা। শিক্ষক-শিক্ষিকারা কোথায় সাহায্য করবেন তা নয়, উল্টে হর্ষের বাবা-মাকে তারা বলেছিলেন, ‘‘ছেলেকে প্রতিবন্ধীদের স্কুলে ভর্তি করুন।’’ ১৬ বছর বয়সে অ্যান্ড্রয়েড প্রোগামিং শিখে হর্ষ ঠিক করেন, প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু একটা করতে হবে। অবশেষে তাঁর চেষ্টার সফল – মাই চাইল্ড অ্যাপ।


চিকিৎসা শাস্ত্র অনুযায়ী, ডিলেড মোটর কোঅর্ডিনেশন কিংবা স্নায়বিক সমস্যা থাকলে সেটা শিশুর ১১ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যেই বোঝা সম্ভব। মাই চাইল্ড অ্যাপের মাধ্যমে বাবা-মায়েদের কাছ থেকে জানা যায় শিশুর বয়স এবং ওজন। শিশু সম্পর্কে এমন কতগুলো প্রশ্ন করা হয়, যার উত্তর হ্যাঁ কিংবা নাতে দেওয়া সম্ভব। ইনপুট সম্পূর্ণ হলে অ্যাপে ভেসে ওঠে – উত্তর। শিশুর সমস্যা না থাকলে জানিয়ে দেওয়া হয় তৎক্ষনাৎ। যদি সমস্যা থাকে তবে দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় পরামর্শ।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী লার্নিং ডিসাবিলিটি কিংবা শেখার সমস্যায় ভুগছে দেশের ১৩-১৪ শতাংশ স্কুলপড়ুয়া। বিশ্বের কমপক্ষে ২০ শতাংশ শিশু-কিশোরের কিছু না কিছু মানসিক সমস্যা রয়েছে। হর্ষের বক্তব্য, ‘‘সময়মতো চিহ্নিত করা গেলে অনেক প্রতিবন্ধকতাই কাটিয়ে ওঠা যায়। এক্ষেত্রে মাই চাইল্ড অ্যাপ হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।’’ গত বছরের ২৬ জানুয়ারি প্লে স্টোরে আত্মপ্রকাশের পর থেকে হর্ষের তৈরি অ্যাপ ডাউনলোড করেছেন কয়েক হাজার অভিভাবক। অনেকের কাছেই তা এখন চিকিত্সক কাম গাইড কাম বন্ধু। এবং আরও অনেক কিছু।

শুরুতেই সাফল্য। স্বপ্নমাখা চোখ দিয়ে বছর উনিশের ছেলে দেখতে পায় মাই চাইল্ড অ্যাপ পৌঁছে গিয়েছে ৫ কোটি মানুষের কাছে। তাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে চিকিত্সক-রোগী এবং অভিভাবকদের এক দারুণ কমিউনিটি। প্রত্যেকে যেখানে প্রত্যেকের জন্য। একজন অভিভাবক অ্যাপের মাধ্যমে পৌঁছে যেতে পারবেন অন্য অভিভাবকের কাছে। পরামর্শ নেওয়া যাবে চিকিত্সকের। হর্ষ বলছেন, ‘‘আর ১০টা বছর সময় দিন। মানসিক প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে একটা নাম হয়ে উঠবে মাই চাইল্ড অ্যাপ।’’

আগামী ১০ বছরে কী হবে, তা জানা নেই। ভবিষ্যৎ কেই বা কবে দেখিয়েছে! তবে মাই চাইল্ড অ্যাপের সাফল্য মনে করিয়ে দিচ্ছে – ড্রপ আউট ছাত্র জোবস, গেটস কিংবা জুকেরবার্গের কথা। আমাদের হর্ষ বোধহয় ওদেরই উত্তরসূরী।

লেখক — সিন্ধু কাশ্যপ

অনুবাদক — তন্ময় মুখোপাধ্যায়