বন্ধুদের চাটি খেয়ে তাইকোন্ডা কোচ খড়দহের আরিফ

0

একটা রোগা, লিকলিকে চেহারার ছেলে। দেখলেই বোঝা যায় শরীরে অপুষ্টির ছাপ। ছেলেটার বাড়ি উত্তর চব্বিশ পরগণার খড়দহ-তে। পাড়ায় ওদের বাড়িটাই হয়তো সবচেয়ে জীর্ণ। টালির চাল। দেওয়ালটা পাকা। কিন্তু গা দিয়ে কোথাও শাখা-প্রশাখাও নেমে গিয়েছে। দেওয়ালের কোথাও কোথাও আশ্রয় নিয়েছে ঘন শ্যাওলা। ছেলেটা স্থানীয় একটা স্কুলে পড়তে যায়। বন্দীপুর মেমোরিয়াল হাই স্কুল। কিন্তু পড়তে যাওয়া আর আসা। স্কুলের মাস্টাররাও বিশেষ কিছু বলেন না। তাঁরা জানেন ছেলেটার বাবা রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে গাড়ি চালান। মাইনে? মাত্র দেড়শো টাকা! পরবর্তী কালে তিনি মিশনের লাইব্রেরীতে কাজ পেয়েছিলেন। কিন্তু তখন কি আর তাঁর পক্ষে সম্ভব হতো তাঁর ছেলেকে পড়াশুনার জন্য টাকা দেওয়া? খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। বছর ২৩ আগের এক ছবি। সেই জীর্ণ চেহারার ছেলেটি তখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। স্কুলে তার সহপাঠীদের কাছে প্রায়ই সে শারীরিক নিগ্রহের স্বীকার হয়। শরীর দুর্বল হলে মনের তেজও তৈরি হওয়া কঠিন। তারই প্রতিফলনে, একদিন বেঞ্চিতে বসা নিয়ে সহপাঠীদের কাছে সেই ছেলেকে এমন মার খেতে হয় যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার উপক্রম!


আজ ২৩ বছর পরও সেই সময়ের কথা ভুলতে পারেন না মহম্মদ আরিফ। ৩৪ বছর বয়সী আরিফ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মাঝে মাঝে থেমেও যান। গলা ধরে আসে তাঁর। বলেন, “জন্ম থেকেই তো লড়াই করছি অভাবের সঙ্গে। সপ্তম শ্রেণীতে ওই ঘটনার পর লড়াই আরও বেড়ে গেল। বাড়িতে শুয়ে শুয়ে ভাবতাম এমন কিছু করতে হবে যাতে ওই মার ফিরিয়ে দেওয়া যায়।পাড়ার এক শিক্ষিত অভিভাবক শিখিয়ে দিলেন। মার মানে শারীরিক ভাবে মার নয়। জীবনের যুদ্ধে জিততে হবে। সেই ভদ্রলোকের নাম আজ মনে পড়ে না আরিফের। কিন্তু তাঁর এই পরামর্শে আরিফ ভর্তি হন তাইকোন্ডা স্কুলে। সেই শুরু জীবন যুদ্ধের লড়াইয়ে আরিফের ঘুরে দাঁড়ানোর। আরিফ বলছেন, “শুধু স্কুলের ছেলেদের কাছে মার খাওয়া নয়, সমস্তরকমের কাজকর্মে পিছিয়ে ছিলাম। স্কুলের স্পোর্টসে সকলের শেষে থাকতাম। পড়াশুনায় সকলের চেয়ে খারাপ রেজাল্ট করতাম। তাইকোন্ডা আমাকে আমূল বদলে দিল। শুধু শারীরিক শক্তি নয়, মানসিক ভাবেও প্রচন্ড শক্তিশালী করে দিল। যে কোনও কাজে মনঃসংযোগ বাড়িয়ে দিল। এই খেলায় প্রথম ভর্তি হয়েছিলাম স্কুলের ওই সহপাঠীদের কথা ভেবে। আমাকে ওদের মারটা ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু আমার মাস্টারমশাই গৌতম চৌধুরী আমাকে দিলেন অন্য এক দর্শন।” 

কী সেই দর্শন? তাইকোন্ডা প্রতিশোধ নেওয়ার খেলা নয়। প্রতিরোধ গড়ে তোলার খেলা। শুধু শারীরিক প্রতিরোধ নয়। মানসিকভাবে ও সমস্ত রকম অসৎ ও অসাধু কাজকর্মের বিরুদ্ধে নিজেকে সংহত রাখার খেলা তাইকোন্ডা। তাই হয়ত আরিফ বললেন, “কত দুশ্চরিত্র মানুষের সান্নিধ্যে এসেছি। কিন্তু যখনই বুঝেছি তারা সঙ্গী হতে পারে না, নিজেকে তাদের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছি।”

খেলোয়াড় হিসাবে যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত হন আরিফ। জাতীয় পর্যায়ে সাফল্যও পান। যার ফল দু’বার আরিফের সামনে এসেছিল দেশের জার্সিতে দক্ষিণ কোরিয়ায় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে নামার সুযোগ। কিন্তু ওই যে, তাইকোন্ডা তখনও আরিফের জীবনের অন্যতম সমস্যা মেটাতে পারে নি। সেটা হল আর্থিক সমস্যা। ততদিনে বাবা মারা গিয়েছেন আরিফের। সংসার চালানোর জন্য টিটাগড়ে একটি বেসরকারি সংস্থায় যৎসামান্য মাইনেতে চাকরিও করতে হচ্ছে আরিফকে। তবু, তারই মধ্যে খেলোয়াড় আরিফ হয়ে উঠেছেন কোচ। চালু করেছেন গোটা তিনেক কোচিং ক্যাম্প। যার মধ্যে অন্যতম ক্যাম্প রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে। কিন্তু কোচিং ক্যাম্প বাড়লেও আরিফের রোজগার বাড়ছে না! কারণ, তাঁর অতীতের অমানুষিক লড়াইয়ের দিনগুলোর কথা তো ভোলেননি আরিফ। তাঁর কোচিং ক্যাম্পেও দেখছেন অধিকাংশ ছেলের শরীরে একসময়ের আরিফের মতোই অপুষ্টির ছাপ। জীর্ণতার ছবি। আরিফ বললেন, “তাই ওদের কাছ থেকে আমি কীভাবে টাকা নেব? বরং ওদেরকেও তৈরি করে যাই। যাতে ওরাও বড় হয়ে এই স্বার্থপর পৃথিবীতে হিংস্র মানুষের হাত থেকে শারীরিক আর মানসিকভাবে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।” এখন আরিফের পরিচালনায় গোটা চারেক কোচিং ক্যাম্প। সব মিলিয়ে প্রায় দু’শো থেকে আড়াইশো খুদে তাইকোন্ডা খেলোয়াড়। তাদের নব্বই শতাংশ ছেলে, মেয়ের কাছে কোনও টাকা নেন না আরিফ। বেসরকারি সংস্থার যৎসামান্য বেতনের প্রায় কিছুই ঘরে ফেরে না। সেই নিয়ে আরিফের সংসারে অশান্তিও কম নয়। তবু, তাইকোন্ডা শিক্ষকের মুখে হাসি। বলছেন, “একটাই জীবন। যতদিন বেঁচে থাকব, চারপাশের মানুষগুলোর অন্তত নুন্যতম আশীর্বাদ নিয়ে বেঁচে থাকি। ক্যাম্পের গরীব ছেলেমেয়েগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হয় আমার ক্যাম্পে থাকলে ওদের অসহায় মুখগুলোতে যদি একটু প্রাণশক্তি ফিরে আসে সেটাই আমার প্রাপ্তি।”

ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই আরিফ তাঁর ক্যাম্পে নিয়ে এসেছিলেন দক্ষিণ কোরিয়া থেকে একজন অভিজ্ঞ শিক্ষককে। তিনদিন ধরে চলা তাঁর ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা এবং এলাকার তাইকোন্ডা শিক্ষকরাও জানলেন খেলার টেকনিক্যাল দিকগুলো।আচ্ছা ২৩ বছর আগে, তাঁকে প্রচন্ড মারা ওই সহপাঠীদের মুখগুলো তো আপনি ভোলেন নি। ওদের পাল্টা মারও তো দেওয়া হয়নি। আরিফ হেসে বললেন, “মুখ গুলো হয়তো সারাজীবন ভুলতে পারব না। কিন্তু পাল্টা মার না দিয়ে আমি ওদের ক্ষমা করে দিয়েছি! তাইকোন্ডা আমাকে এটাই শিখিয়েছে!"