বড়াপাও-ও ব্র্যান্ড হতে পারে শেখালেন ধীরজ গুপ্তা

0

কলকাতার যেমন রসগোল্লা, মুম্বই তথা মহারাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বড়াপাও ঠিক তাই। বড়াপাও আর মহারাষ্ট্র যেন সমার্থক। তবে মারাঠা বলয়ের গণ্ডি পার করে বড়াপাও-কে বিশ্বজনিন করতে চাইছে ‘জাম্বোকিং’। মার্কিনি ব্র্যান্ডদের রমরমার মাঝে ভারত থেকেও ফাস্ট-ফুড ব্র্যান্ড তৈরি যে অলিক কল্পনা নয়, দেখাচ্ছেন তরুণ উদ্যোগপতি ধীরজ গুপ্তা।

শুরুর গল্প

ধীরজ গুপ্তাদের দুই পুরুষের হোটেল ও কেটারিংয়ের ব্যবসা। বেশকিছু মিষ্টির দোকানও রয়েছে। তাই ২০০০ সালে এমবিএ পাস করে নিজের ব্যবসা খোলার পথই বেছেছিলেন ধীরজ। তাঁর প্রথম উদ্যোগ, প্রবাসী ভারতীয়দের মাঝে মিষ্টি রফতানি করা অবশ্য সফল হয়নি। ফর্মুলা বদলে মুম্বইয়ের শহরতলি মালাড়ে চাট ফ্যাক্টরি নামে ফাস্ট-ফুডের আউটলেট খোলেন ধীরজ। পসার জমেছিল ভালই। নানারকম খাবারের মাঝে চাট ফ্যাক্টরির বেস্টসেলার অব্শ্য ছিল বড়াপাও। তাই বড়াপাও-কে কেন্দ্র করেই ব্যবসা বৃদ্ধির নকশা তৈরি করেন ধীরজ। এভাবেই পথ চলা শুরু করে জাম্বোকিং।

২০০১ সালে জাম্বোকিং-এর প্রথম আউটলেটে বড়াপাও বিক্রি হতো ৫ টাকায়। সে সময় রাস্তার ধারের দোকানে বড়াপাওয়ের দাম ছিল ২ টাকা। ধীরজের দাবি, কেন এই দামের ফারাক তা জানার ঔসুক্যই মানুষজনকে জাম্বোকিংয়ের দোকানে টেনে আনত। প্রথম ফারাক অবশ্যই ছিল জাম্বোকিংয়ের পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাবার তৈরি। তারপর চিজ বড়াপাও, বাটার বড়াপাও, সেজওয়ান বড়াপাওয়ের মতো ভিন্ন স্বাদের বড়াপাও বানিয়ে ফ্যানবেস আরও খানিকটা বাড়িয়ে তোলে জাম্বোকিং।

Failure is the pillar of success

শহরের ব্যস্ত জায়গা যেমন বাজার এলাকা, স্টেশন সংলগ্ন এলাকা বেছে নিয়ে জাম্বোকিংয়ের আউটলেট খুলতে শুরু করলেন ধীরজ। কিন্তু এই পরিকল্পনা যে সব সময় কাজে দিল তা নয়। দক্ষিণ মুম্বইয়ের মসজিদ বন্দর স্টেশন সংলগ্ন ফুটব্রিজের নিচে জাম্বোকিংয়ের নতুন দোকান মুখ থুবড়ে পড়ল। অথচ ঢিল ছোড়া দুরত্বে বড়াপাওয়ের অন্য একটি দোকান চুটিয়ে ব্যবসা করছিল। ব্যর্থতার কারণ খতিয়ে দেখতে গিয়ে ধীরজ বুঝলেন, ওই এলাকায় অফিসযাত্রী বা পড়ুয়া প্রায় নেই বললেই চলে। ট্রেনযাত্রীদের অধিকাংশই শ্রমিক শ্রেণির মানুষ। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা দেখার চেয়ে যাদের কাছে পেট ভরানোটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাস্তার ধারে ২ টাকার বড়াপাওই তাদের প্রিয়। জনঘনত্ব মানেই যে ব্যবসা সাফল্য নয়, ক্রয় ক্ষমতাও বিবেচ্য বিষয়, টের পেলেন জাম্বোকিংয়ের কর্ণধার।

২০০৭ সাল থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজি খোলা শুরু করে জাম্বোকিং। ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সাহায্য পাওয়ার সঙ্গে বিনামূল্যে কিছু পরামর্শও পান ধীরজ। যার একটি কাজে লাগাতে গিয়ে ফের হোঁচট খায় ব্যবসা। ফ্র্যাঞ্চাইজি দেওয়ার পাশাপাশি দোকান কিনেও ব্যবসা বিস্তৃত করতে থাকেন তিনি। ৩ বছর এভাবে চলার পর ধীরজ উপলব্ধি করেন, দোকান কিনে ব্যবসা বৃদ্ধির অনেক সমস্যা। ফ্র্যাঞ্চাইজির তুলনায় এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনায় বেশি সময় ব্যয় হয়, অগ্রগতিও শ্লথ হয়ে যায়। ৩ বছরে ২০০ কোটি টাকার ব্যবসার সুযোগ থাকলেও দোকান কিনে ব্যবসা চালাতে গিয়ে তা সম্ভব হয়নি।

ব্যর্থতার পাঠ আরও পেয়েছেন ধীরজ। একটা সময়ে রিলায়েন্স, স্পেন্সার্স, ম্যাকডোনাল্ডের রিটেল চেইন বৃদ্ধি দেখে জাম্বোকিংয়ের বিজনেস চেইন বাড়ানোর কথা ভাবেন সংস্থার কর্ণধার। সে সময় সারা দেশে সংস্থার ছিল মাত্র ১০টি আউটলেট। বড় সংস্থাগুলির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা বাড়াতে গিয়েও জাম্বোকিংকে লোকসান করতে হয়েছে বলে ধীরজ জানিয়েছেন। শেষমেশ কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকে ব্যবসা সামাল দিতে হয়।

জাম্বো সাইজের স্বপ্ন দেখে বড়াপাও কিং ধীরজ

মার্কিন সংস্থা ম্যাকডোনাল্ড্স-এর ব্যবসা পদ্ধতির গুণমুগ্ধ ধীরজ। জাম্বোকিংকেও তিনি নিয়ে যেতে চান ম্যাকডোনাল্ডস-এর উচ্চতায়। তাই স্রেফ নানা রকমের বার্গার বেচে যেভাবে মার্কিন ব্র্যান্ডটি সারা বিশ্বে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, সেভাবে শুধুমাত্র বড়াপাও-কে কেন্দ্র করেও জাম্বোকিং-কে বিশ্ববিখ্যাত করতে চান ধীরজ। ম্যাকডোনাল্ডের প্রাণপুরুষ রে ক্রক-এর জীবনীকে ধীরজ ধর্মগ্রন্হের মতো দেখেন। তাঁর মতে কোনও এক ধরণের খাবার বানালে অটোমেশন প্রয়োগ করা যায়, যাতে কম সময়ে অনেক বেশি পরিমাণে খাবার বানানো সম্ভব। তাই লোকে যখন বলে ম্যাকডোনাল্ডের বার্গার জনপ্রিয় হলেও বড়াপাওয়ের দ্বারা তা সম্ভব নয় তখন আত্মবিশ্বাসেই ভরসা রাখেন ধীরজ।

হাল ছেড়ো না...

এমিবএ-র পর ব্যাচমেটরা যখন মোটা মাইনের চাকরিতে বিভিন্ন জায়গায় যোগ দিচ্ছিলেন, তখন ধীরজ বুঁদ ছিলেন তাঁর স্বপ্নকে সত্যি করতে। বড়াপাও নিয়ে ধীরজের পরিকল্পনার কথা যেনে অনেকেই তাঁকে নিরুৎসাহ করেছেন। ফুটপাথের খাবার বিক্রেতাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কেন ধীরজ তাঁর এমবিএ ডিগ্রি নষ্ট করছেন! বিস্ময়ের সুরে বলেছেন কেউ কেউ। তাই ব্যবসার শুরু প্রথম তিনটে বছর তাঁর পক্ষে মানসিকভাবে খুব কঠিন ছিল বলে ধীরজ জানিয়েছেন। তবে শুরু থেকেই স্ত্রী রীতাকে পাশে পেয়েছেন তিনি। জাম্বোকিংয়ের ব্র্যান্ডিং থেকে বিপণন, সবেতেই ওতপ্রত জড়িয়ে ম্যানেজমেন্টের স্নাতক রীতা।

বড়াপাও-এক বিশ্বজনিন করার লক্ষ্যে জাম্বোকিং মুহারাষ্ট্রের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে দিল্লি, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদে। ১৪ বছরে দেশের ১৪টি শহর মিলিয়ে ১০০ আউটলেট রয়েছে জাম্বোকিংয়ের। ১৫ টাকা থেকে শুরু করে ৭৫ টাকা পর্যন্ত দামের বড়াপাও পাওয়া যায় তাদের দোকানে। মেনুতে টুকটাক এক্সপেরিমেন্টও চলছে। রয়েছে সিঙ্গারা-র হাইব্রিড – জাম্বোসা। সংস্থার উৎপাদন কেন্দ্রে ঘণ্টায় কয়েক টন খাবার তৈরি করা যায়। ‘India‘s Most Attractive Brands 2015 Report’ অনুযায়ী দেশের প্রথম ১০০০টি ব্র্যান্ডের মধ্যে এই বড়াপাও মেকারের স্থান ৪৫৮ নম্বরে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ১০ কোটি বড়াপাও বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে জাম্বোকিং।

অনেক ব্যর্থনার মধ্যে দিয়ে জাম্বোকিং-এর এই সাফল্য ধীরজ গুপ্তাকে শিখিয়েছে - সাফল্যের কোনও শর্টকাট হয় না। সফল তারাই হয়, যারা নিজেদের স্বপ্নে বিশ্বাস রাখে।


লেখা - প্রীতি চামিকুট্টি

অনুবাদ - ঋত্বিক দাস