গোকুলবাবুর মেয়েরা ঢাক বাজান বিদেশে

0

কথায় আছে নিজের ঢাক পেটাতে নেই। কিন্তু সেই ঢাক পেটাতে ঈর্ষণীয় পারিশ্রমিক দিয়ে মছলন্দপুরের ছেলেমেয়েদের নিযে যাচ্ছেন দেশ বিদেশের বাঙালিরা। ভালো ঢাকির খোঁজে পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে ঘুরছেন অনেক পুজো কমিটি। সেই কারণেই ঢাক বাজানোর আগ্রহ বাড়ছে উত্তর চব্বিশ পরগনার মছলন্দপুর ও সংলগ্ন এলাকার নতুন প্রজন্মের মধ্যে। এক স্বনামধন্য ঢাকির থেকে তিন মাসের কোর্স করছেন তাঁরা। তাতেই কেল্লা ফতে। পুজোর মরসুমে হাজার হাজার টাকা রোজগারের সুযোগ। পুজোর পর আইএসএল, আইপিএলেও ডাক পড়ে। এমনকি রিয়্যালিটি শোতেও সমান কদর। এমন উজ্জ্বল পেশার হদিশ পেয়ে ঘরের বউরাও ঢাক নিয়ে হাজির। স্কুল, কলেজ ছাত্রীরাও সেই পথে। শুধু ঢাক নয়, কাঁসর, ঢোলেও তাঁরা হাত পাকাচ্ছেন। আর এই সুরেলা বাদ্যযন্ত্রের হাত ধরে প্রত্যেকেই স্বপ্ন দেখছেন বিদেশে যাওয়ার।

পুজোর সময় অনেক উদ্যোক্তাই ঢাকির খোঁজে কিছুটা সমস্যায় পড়েন। ঠিকঠাক ঢাকি না হলে যে পুজো জমে না। ভাল ঢাকির সন্ধান করলেও পুরনো কিছু মুখই তাদের ভরসা। এই ফাঁকা জায়গাটাই ধরেছিলেন গোকুলচন্দ্র দাস। যিনি এরাজ্যের প্রথম সারির ঢাকিদের একজন। ২০০৪ সালে তিনি ঢাকি সম্রাট উপাধি পেয়েছিলেন। উত্তর ২৪ পরগনার মছলন্দপুর বিধান পল্লির এই বাসিন্দা ঠিক করেন ভাল ঢাকি তৈরি করলে বাজার নিয়ে ভাবতে হবে না। কৃষিজীবী প্রধান এলাকা মছলন্দপুরের মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন ঢাক অনেক কিছুই দিতে পারে। মেয়েরা এর তালিম নিলে ভাল বাজিয়ে হয়ে উঠবে। কেউ ফোন করছে কলকাতার কোনও নামী মণ্ডপ থেকে, কারও ফোন দিল্লি বা মুম্বই থেকে। সব্বাই চাইছেন গোকুল দাসের ছাত্র-ছাত্রীদের। এর মধ্যেই ৬জন মহিলা ও কয়েকজন ছেলেকে নিয়ে শুরু হয় তাঁর মিশন। মাস তিনেকে ওই ছেলে-মেয়েদের গড়েপিঠে তোলার পর শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে স্রোতের মতো আসতে থাকে কাজের সুযোগ। এখন ওই এলাকার অভিভাবকরা চাইছেন মেয়েরা ঢাক বাজাক। আরও বেশি করে এই পেশায় আসুক। এই মহিলা ঢাকিদের নিয়ে এখন বিস্তর কৌতুহল পুজোকর্তাদের। প্রতিদ্বন্দ্বীদের টেক্কা দিতে তাঁদের বাজি মহিলা ঢাকিরাই। ঢাক বাজাতে পুরুষদের রমরমা থাকলেও সেভাবে মেয়েদের দেখা যায় না। মছলন্দপুর, গোবরডাঙা, হাবরার মেয়েরা সংসার সামলে ঢাক বাজানো শিখেছেন। তাঁরা বুঝেছেন এর থেকে অনেক কিছু পাওয়ার আছে।

আর এভাবেই গোকুল দাসের গুরুকূল-এর শিল্পীরা বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিচ্ছেন ভারতীয় সংস্কৃতির সনাতনী বাজনাকে। বিগত সাত বছর ধরে আমেরিকা, ফ্রান্স, লন্ডন, নরওয়ে এবং ইন্দোনেশিয়ায় থাকা প্রবাসী বাঙালীদের দুর্গাপুজোয় ঢাক বাজিয়ে মন জয় করেছেন মছলন্দপুরের অনেক বাজিয়ে। এ বছর ঢাক, ঢোল ও কাঁসরের তালে মণ্ডপ মাতাতে হংকং-এর একটি বাঙালি ক্লাবের পুজোয় ইতিমধ্যেই চলে গিয়েছেন মছলন্দপুরের চার যুবক।আর ভোপাল ও অসমে যাচ্ছেন পনেরো জনের দুটি দল। এই দুই দলে ছেলেদের সঙ্গে আছেন মেয়েরাও। কলকাতার নামী মণ্ডপে ঢাক বাজাবেন গোকুল দাসের ষাট জনের দশটি দল। যারা ঢাক, ঢোল ও কাঁসর বাজাবে।

সেতার সম্রাট রবিশঙ্কর এবং তাঁর মেয়ে অনুষ্কাˆশঙ্কর ও ওস্তাদ জাকির হোসেনের সঙ্গে ইউরোপ, আমেরিকায় প্রায় অর্ধ শতাধিক শো করেছেন গোকুলবাবু। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা ইন্দোনেশিয়াতে ও একাধিকবার ঢাক বাজিয়ে দর্শকদের মন জয় করেছেন তিনি। গোকুলবাবুর বাবা মতিলাল দাসও পেশায় ঢাকি ছিলেন। গোকুলবাবু এবং তাঁর দুই ছেলে সেই ধারাটিকেই বজায় রেখে শিল্পের ভিতটাকে আরও মজবুত করার চেষ্টা করে চলেছেন।

গোকুলবাবু তাঁর এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এলাকার মেয়ে-বউদেরও ঢাক বাজানোর কদর বোঝাতে পেরেছেন। ছেলে-মেয়েদের তিন-চার মাসের তালিম দিয়ে পাকা শিল্পী তৈরি করেন গোকুলবাবু। একদম বিনা পয়সায়। তাঁর ইচ্ছে এভাবেই মেয়েরা স্বনির্ভর হোক। এরপর তাঁদের দেশবিদেশের নানা মণ্ডপে ঢাক, ঢোল এবং কাঁসর বাজাতে পাঠিয়ে দেন। তবে পুজো কমিটির সঙ্গে আর্থিক চুক্তি করেন গোকুলবাবু নিজেই। সেখান থেকে শিল্পীদের পারিশ্রমিক হিসাবে পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে দেন তিনি। শিল্পী জানান, এই ভাবে দল ভাড়া দিয়ে পুজোর মরসুমে দেড় থেকে দু লক্ষ টাকা আসে। তাঁর বাজনার দলের সুনামের সঙ্গে চাহিদা বাড়ায় সুবিধা পাচ্ছেন বনগাঁ মহকুমার অজস্র ঢাকি। হাবরা, মছলন্দপুর ও বনগাঁ এলাকার স্কুল, কলেজের শতাধিক ছেলেমেয়ে এবং গৃহবধূ পুজো মণ্ডপে ঢাক বাজানোকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন। কলকাতায় মণ্ডপের জন্য শিল্পীরা পান তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। কলকাতার বাইরে গেলে শিল্পীদের জন্য বরাদ্দ মোটামুটি সাত থেকে দশ হাজার টাকা। আর বিদেশে বাজানোর জন্য ঢাকিরা পান পনেরো থেকে পঁচিশ হাজার টাকা। ফলে উৎসবের সময় আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে ওই শিল্পীদের পরিবার।

ভাবতেই পারেন পুজোর পর কী হবে এইসব ঢাকিদের। পুজোর আগে আইএসএলে কলকাতা টিমের ম্যাচ। সেই ম্যাচে ছিলেন পেলে। ফুটবল সম্রাটের সামনে ঢাক বাজালেন গোকুলচন্দ্র দাস। আর তাঁর সঙ্গে ছিলেন ২৫জনের একটি টিম। পুরুষ ও মহিলাদের নিয়ে এই ঢাকিরা ফুটবল ম্যাচের পরিবেশই বদলে গেল। 

ফাটাফাটি ফুটবল শেষ হলে এসে যাবে আইপিএল। সেখানেও কেকেআর-এর হোম গ্রাউন্ড ইডেন গার্ডেন্সে মনোরঞ্জনের দায়িত্ব গোকুলচন্দ্র দাসের ঢাকিদের। ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপেও ঢাকের বোলে মাতিয়েছিলেন গোকুলবাবুর ছাত্র-ছাত্রীরা। এমনকী জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলিতেও তাঁর দলের ঢাকিদের কদর। ছেলেমেয়েদের শেখাতে গিয়ে গোকুলবাবুর বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। একবার বায়না দিলে ১০ হাজার ঢাকি জোগাড় করে দিতে পারেন তিনি।

গুগল সার্চ ইঞ্জিনে জায়গা করে নিয়েছে মছলন্দপুরের মতিলাল ঢাকি ডট কম। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা গোকুলবাবু রীতিমতো টেক স্যাভি। ফেসবুক, ইউটিউবের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের পুজো কমিটি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। প্রতি বছর বিদেশে গিয়ে উপার্জনের পাশাপাশি তাঁর সংস্থার ঢাকিরা ভালো পরিচিতিও পেয়েছেন। ভালো বাজালে খুশি হয়ে কেউ কেউ ডলার, পাউন্ড দেন। মাত্র দশ-বারো দিনে এমন লোভনীয় কাজে আগ্রহ দেখাচ্ছেন উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়ে এবং গৃহবধূরাও। স্বপ্ন সফল করতে গোকুলবাবুর কাছে পুজোর আগে কয়েক মাসের একটি কোর্স করছেন। যার জন্য দৈনিক ঘণ্টা দুয়েকের তালিম নিতে হয়। ঢাক-ঢোল এবং কাঁসর নিয়ে পুজোর চারদিন মণ্ডপ মাতাবেন তাঁরা। এ বছর গোকুলবাবুর থেকে তালিম নেওয়া ছেলেমেয়েদের বারোটি দল হংকং, অসম, ভোপাল, দিল্লি এবং কলকাতার বেশ কয়েকটি নামী পুজোয় ঢাক বাজাবেন।

বাজানোর সুনাম ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি এমনই যে কলকাতার বড় ও নামী পুজো কমিটিগুলো এখন মোটা অঙ্কের টাকা দিলেও পাচ্ছেন না মছলন্দপুর মতিলাল ডট কমের ঢাকের দলকে। সংস্থার প্রধান গোকুলচন্দ্র দাস বলেন, ‘‘আমার কাছে এ বছর পঞ্চাশ জন ছেলেমেয়ে তালিম নিয়েছেন। নতুন পুরানোদের মিশিয়ে চার এবং ছয় সদস্যের বারোটি দল তৈরি করে দেশ ও দেশের বাইরে পাঠাচ্ছি। এখন অনেকেই যোগাযোগ করছেন, কিন্তু আর দল দিতে পারছি না।’’

Related Stories