পলিহাউসে ‘সবুজ বিপ্লব’ ঘটিয়ে ফেলেছেন হাবিবুল্লাহ

হয় বৃষ্টি, নাহলে অনাবৃষ্টি, কখনও ঝড়। রাজ্যে চাষ মানচিত্রে বরাবরই প্রকৃতির ইচ্ছের ওপর নির্ভর করে কৃষকদের ভবিষ্যত। তারওপর পোকামাকড়ের ঝঞ্ঝাট আছেই। এক বাঙালি উদ্যোগপতির একান্ত চেষ্টায় এই একপেশে লড়াইয়ের ছবিটা একটু একটু করে বদলাচ্ছে। গ্রিনহাউস চাষে সাবালক হচ্ছে রাজ্য।

0

ধান, আলুর বাইরে এখনও এ রাজ্য অর্থকরী সব্জি, ফল এবং রঙিন ফুল চাষে স্বনির্ভর হতে পারেনি। উপযুক্ত পরিকাঠামো না থাকা তার একটা বড় কারণ। পাশাপাশি রয়েছে কৃষকদের সচেতনতার বিষয়টি এবং আর্থিক কারণ। অপ্রচলিত বা বিকল্প চাষ করতে গেলে যে আধুনিক সুযোগসুবিধা থাকে তা এখনও অনেকের নাগালে আসেনি। কৃষক পরিবারের সন্তান হয়ে ছোট থেকেই এই ব্যাপারটা সামনে থেকে দেখেছিলেন মহম্মদ হাবিবুল্লাহ। উত্তর ২৪ পরগনার দত্তপুকুরের চালতাবেড়িয়ার এই বাসিন্দা আইটিআই নিয়ে পড়ার সময় আধুনিক পদ্ধতিতে চাষের বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে থাকেন। কখনও নেপালে গিয়ে প্রিন্টিং—এর কাজ, কখনও সিঙ্গাপুরে গিয়ে ভাগ্যেন্বেষণের চেষ্টা। যৌবনে পায়ের তলায় মাটি খুঁজতে সবরকম চেষ্টাই চলেছিল হাবিবুল্লাহর। এভাবেই এক শুভানুধ্যায়ীর কাছ থেকে চাষের জন্য পলিহাউস বানানোর পরামর্শ পেয়েছিলেন। খোঁজ নিয়ে খড়গপুর আইআইটি থেকে প্রশিক্ষণ নেন হাবিবুল্লাহ। দুর্গাপুরে গিয়ে দেখে আসেন পলিহাউসের হাল–হকিকত। এরপরই নতুন উদ্যমে নেমে পড়া।

দাদার উৎসাহ ও লাখ দেড়েক টাকা সাহায্যে অচেনা পথে এগিয়ে চলেন হাবিবুল্লাহ। নিজের কারিগরি শিক্ষার জ্ঞান থেকেই বাড়িতে শুরু করেন পলিহাউসের কাজ। সময়টা ২০০৩ সাল। শুরুতেই বোলপুরের কঙ্কালীতলায় গোলাপ ফুলের জন্য ১১ হাজার বর্গফুটের একটি পলিহাউসের বরাত পান এই উদ্যমী। প্রথম পরীক্ষায় সফল হওয়ার পর রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে আসতে থাকে এই নতুন আচ্ছাদনের অর্ডার। কখনও পান চাষের জন্য নেটহাউস চেয়ে কাকদ্বীপ থেকে ফোন, কখনও অসময়ে সব্জি চাষের জন্য ভাঙড় থেকে পলিহাউসের অর্ডার, আবার নদিয়ার বেথুয়াডহরি থেকে রঙিন ফুলের জন্য পলিহাউসের ডাক। এভাবেই রাজ্যের চাষের বদলে যাওয়া চালচিত্রে দ্রুত পরিচিত বাড়তে থাকে দত্তপুকুরের এই উদ্যোগপতির। মূলত তাঁরই উদ্যোগে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছেন চাষিরা। শুধু নেটহাউস বা পলিহাউস নয়, বিন্দু পদ্ধতিতে চাষেও পথ দেখাচ্ছেন হাবিবুল্লাহ। তাঁর ‘অ্যারোটেক ইঞ্জিনিয়ারিং’ রাজ্যের চাহিদা মিটিয়ে বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশার অর্ডার ধরেছে। পাশাপাশি উত্তর পূর্বের সাতটি রাজ্যে সাম্রাজ্য গড়েছেন এই বঙ্গসন্তান।

লাখ দেড়েক টাকা নিয়ে যে স্বপ্ন উড়েছিল তা কয়েক বছরের মধ্যেই পৌঁছে যায় কোটির ঘরে। বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকার লেনদেন। প্রতি বছরে যা লাফিয়ে বাড়ছে। এবছর ইতিমধ্যে ১০ কোটির বরাত এসেছে। এর সিংহভাই উত্তর পূর্ব থেকে। মণিপুরে ‘অ্যারোটেক’—এর অফিস থেকে সাত রাজ্যের চাহিদা সামলানো হয়। পলিহাউসের মাধ্যইমে মূলত ফুল, অর্কিড হয় পাহাড়ি রাজ্যগুলিতে। এক একটি পলি ও নেট হাউস তৈরি করতে খরচ হয় প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা। এধরনের চাষে সরকার থেকে পঞ্চাশ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হয়। একবার পলিহাউস তৈরি হলে সেখানে ২০ বছর চাষ ভালভাবেই  করা যায়। পাঁচ বছর হলে শুধু পলিথিন পাল্টাতে হয়। হাবিবুল্লাহর কথায়, “রাজ্যেরর চাষিদের মধ্যে নেটহাউস ও পলিহাউস নিয়ে রীতিমতো উৎসাহ তৈরি হয়েছে। এর প্রাথমিক খরচ বেশি হলেও ফুল, সব্জির মান, উৎপাদন ও গুন সাধারণ চাষের থেকে অনেক ভাল।”

এপর্যন্ত রাজ্যের নানা প্রান্তে তাঁর সংস্থার কয়েকশো পলিহাউস ও নেট হাউসে সব্জি, ফুল চাষ করে দেশ, বিদেশে পাঠাচ্ছেন ভাঙড়, চাকদহ, মালদহ, সুন্দরবন, কাকদ্বীপের চাষিরা। পলিহাউসে বৃষ্টির জল ঢোকে না, এখানে ফুল ও সব্জি চাষ হয়। আর নেটহাউসে জল সামান্য ঢোকে। এর ব্যবহার পান চাষে। হাবিবুল্লাহর দাবি, “এধরনের গ্রিনহাউস পদ্ধতিতে চাষ করলে আর্থিক সাশ্রয়ও অনেক।” রাজ্যের চাষ চিত্রে এই বদলে যাওয়ার ইঙ্গিতের নেপথ্যে থাকা হাবিবুল্লাহ বলছেন তাঁর টিমওয়ার্কের কথা। অ্যারোটেক—এর মাধ্যমে প্রত্যতক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে একশোজনের, পরোক্ষভাবে উপকৃত প্রায় হাজার মানুষ। এদের প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে হাবিবুল্লাহর। এরই সুবাদে অন্য সংস্থাদের টপকে ভিন রাজ্যে টেন্ডার পাওয়ার পর সময়মতো এবং সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছে তাঁর টিম। কোনও চাষি আর্থিক কারণে পলিহাউস করতে না পারলেও তারপাশে সাধ্যমতো দাঁড়ান হাবিবুল্লাহ। সবুজের সঙ্গে ছোট থেকে যে বন্ধুত্ব হয়েছিল তা যে এড়ানো যায় না।