মোদির কপালে কী আছে? বলবেন উত্তরপ্রদেশের জনতা

লিখছেন সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশুতোষ

0

২০১৯ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করে নরেন্দ্র মোদি ফের প্রধানমন্ত্রিত্ব চালাতে পারবেন কিনা তা নির্ভর করছে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে ভোটাররা কী রায় দেবেন তার ওপরেই। এটা শুনতে অদ্ভুত লাগারই কথা যে, দেশের একটি রাজ্য দেশের ভবিষ্যতের দিশা দেখাবে। কিংবা, নির্ধারণ করে দেবে দেশের প্রধানমন্ত্রীর ভবিষ্যতের সাফল্য-অসাফল্য – বিশেষত, সারা দেশজুড়ে মোদি যখন তাঁর অসংখ্য ভক্তের কাছেই অসম্ভব জনপ্রিয়।

যদি কেউ পাঞ্জাব, গোয়া বা উত্তরাখণ্ডের ভোটের ফলাফল দেখেন তাহলে এর একটা মানে দাঁড়াবে। অন্যদিকে, দেশের অন্য রাজ্যগুলির নিরিখে উত্তরপ্রদেশে লোকসভা আসনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া, এও বিস্মৃত হলে চলবে না মোদির সাউথ ব্লকে যাওয়ার রাস্তা সুগম করেছে উত্তরপ্রদেশ। মোট ৮০টি আসনের ভিতর বিজেপি এখানে জয়ী হয়েছে ৭৩টি আসনে। বিজেপির মোট ২৮২টি আসনের ভিতর উত্তরপ্রদেশ থেকে পাওয়া বিপুল সংখ্যক আসনে জয়ের জেরেই মোদি আজ প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছেন।

২০১৪ সালের নির্বাচনে যদি বিজেপি ২৭২টির নীচে আসন পেত, তাহলে সরকারের প্রতি সমর্থন জোটাতে মোদির কিছু সমর্থকের দরকার পড়ত। এক্ষেত্রে অটলবিহারী বাজপেয়ী যেমন পারস্পরিক ঐক্যের ভিত্তিতে কোয়ালিশন সরকার পরিচালনা করেছেন, সেই একই পথ মোদিকেও বেছে নিতে হত। বাজপেয়ী একজন সম্মানীত নেতা। তিনি কখনওই তাঁর আবেগকে বন্ধুস্থানীয়দের কাছে তেমনভাবে প্রকাশ করেননি। বাজপেয়ী সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, ওঁর দলটা ভুলভাল হলেও নেতা হিসাবে তিনি নিজে ছিলেন একদম ঠিকঠাক। তবে ওঁর সঙ্গীসাথীদের সম্পর্কেও ওঁদের ভুলভাল বলা হয়ে থাকে। তাছাড়া, স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহেরুও ওঁকে পছন্দ করতেন। এটা খুবই গর্বের কথা।

কিন্ত বাজপেয়ীর সঙ্গে তুলনায় মোদি একেবারেই আলাদা ধরনের মানুষ। মোদি আড়াই বছর ধরে প্রধানমন্ত্রিত্ব চালাচ্ছেন। এই সময়কালীন মোদির কার্যকলাপ দেখে এটা বলা যেতে পারে যে, মোদি সকলের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করায় বিশ্বাস করেন না। সব মহলের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ চালানোয় মোদির তেমন কোনও মতি নেই।

সুতরাং উত্তরপ্রদেশ কী বার্তা দেবে, তা থেকে টের পাওয়া যা্বে মোদি-ম্যাজিক অটুট আছে কিনা। মোদির আজকের সাফল্যের নেপথ্যে উত্তরপ্রদেশের যে অবদান আছে - যদি সব ঠিকঠাক থাকে - যদি ওই সংখ্যক আসনে তিনি দলকে জয়যুক্ত করাতে পারেন, তাহলে ধরে নিতে হবে, ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে তিনি ফের জিতবেনই। উত্তরপ্রদেশের মানুষের আর্থিক দারিদ্র্য রয়েছে। কিন্ত রাজনৈতিকভাবে এই রাজ্যের মানুষ খুবই সক্রিয়। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের নির্ণায়ক হিসাবে উত্তরপ্রদেশের নিজস্ব একটি গুরুত্ব আছে। সেইসঙ্গে এখানকার আসন সংখ্যার নিরিখেও জাতীয় রাজনীতিতে উত্তরপ্রদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ক্ষমতা রয়েছে। মোদি এটা ভালোমতোই জানেন। এ কারণে নিজে লোকসভা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্যে বারাণসীকে বেছে নিয়েছিলেন।

এও ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে উত্তরপ্রদেশে মোদি হাওয়া তৈরি করতে মোদি যে মাস্টারস্ট্রোক খেলেছেন, তা উত্তরপ্রদেশ ছাড়াও পাশ্ববর্তী রাজ্যগুলিতে সফলভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। ভদোদরা থে্কে নির্বাচিত হওয়ার পরেও সেকারণে বারাণসীকেও হাতে রেখেছিলেন মোদি। আসলে তিনি উত্তরপ্রদেশের শক্তি হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এসব কারণেই উত্তরপ্রদেশে সরকার তৈরি করতে পারাটা মোদির পক্ষে জরুরি। কিন্ত তিনি কি পারবেন? এই প্রশ্নটাই এখন অনেক বড় প্রশ্ন।

বিজেপির শুরুয়াতটা ভালোর দিকেই। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের মতো ইস্যু জাতীয়তাবাদের কেটলির জল গরম করতে পেরেছে। সেইসঙ্গে আবেগ মিশিয়ে ব্যাপারটিকে বিজেপি নিজস্ব রাজনীতির গন্ধ আরোপ করতে চেয়েছে। কিন্ত এরপরে বিমুদ্রাকরণ পরিস্থিতিটাকে খানিক জটিল করে তুলেছে। ওটা অনিরাময়যোগ্যই বলা যেতে পারে। এক্ষেত্রে বিজেপি-র তরফ থেকে যুক্তি হল, সার্জি্ক্যাল স্ট্রাইকের মতো বিমুদ্রাকরণও সন্ত্রাসবাদের শিকড়ে নাড়া দেবে। কালো টাকা বাজেয়াপ্ত হবে। কিন্ত যেটা ভাবা হয়নি তা হল, জনজীবনে বিমুদ্রাকরণের বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিমুদ্রাকরণ কার্যকর করতে গিয়ে মানুষকে অদক্ষ ম্যানেজমেন্টের হাতে ভোগান্তি সইতে হবে।

শতাধিক মানুষ এটিএমের লাইনে অপেক্ষারত অবস্থায় মারা গিয়েছেন। এছাড়া, ব্যাঙ্কগুলি, কৃষকেরা, দিন আনা দিন খাওয়া মানুষজন, ছোট ব্যবসায়ীরা, বড় বড় ব্যবসাদাররাও ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। সেইসঙ্গে এই ভয়টাও ছড়িয়ে পড়েছে, এর জেরে দেশের সার্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাছাড়াও কর্মহীনের সংখ্যা বাড়বে। আর ভারতের বাড়বৃদ্ধির গল্পটাও ক্ষতির মুখে পড়বে।

এদিকে মোদি এসবের জন্যে জনতার কাছে ক্ষমা চাওয়া পরিবর্তে লোকসভায় বিমুদ্রাকরণের পক্ষেই সওয়াল করেছেন। তবে প্রকৃত ঘটনা হল নিজের জনপ্রিয়তাকে তিনি খর্ব করেছেন। দেশের অন্য রাজ্যগুলির জনতার মতো উত্তরপ্রদেশের মানুষও মোদির ওপর ভীষণরকমে ক্ষুব্ধ।

আরও বলার এই যে, সম্প্রতি রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যা্দবের জুটি উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সমাজবাদী পার্টি পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল প্রায়। যাদব পরিবারে ক্ষমতার ভাগ নিয়ে লড়াইয়ের জেরে এই পরিস্থিতি দেখা দেয়। অখিলেশ দলের অধিকাংশ নেতাকে কাছে টানতে পেরেছেন। আর কংগ্রেসের সঙ্গে মসৃণভাবে জোট তৈরিতে উদ্যোগ নিয়েছেন। অখিলেশ নিজেকে জাতপাতের ভি্তর বদ্ধ না রেখে নিজেকে এমন একজন নেতা হিসাবে খাঁড়া করেছেন - যিনি উন্নয়নের পক্ষে। তাছাড়া, তিনি তাঁর বাবার মতোও নন। অখিলেশের সমর্থকরা মনে করেন, মুলায়ম ও শিবপালের দুজনেরই সমাজবাদী পার্টিটাকে গুন্ডাগর্দি ও অরাজকতা থেকে মুক্ত করার মতো ক্ষমতা ছিল। আপেক্ষিকভাবে অখিলেশের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি সমাজবাদী পার্টিকে সম্প্রতি নতুনভাবে প্রাণ দিয়েছে।

একজন শহুরে, শিক্ষিত নেতা হিসাবে অখিলেশ নিজেকে দেখাতে চেয়েছেন। একথা অস্বীকার করারও কোনও জায়গা নেই যে, অথিলেশ নিজেকে এমন একজন নেতা হিসাবে গড়ে তুলতে চাইছেন উত্তরপ্রদেশের জনতা যাঁর কাছে নিজেদের ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলি গচ্ছিত রাখতে পারেন। অখিলেশ-রাহুলের জোট উত্তরপ্রদেশ নিয়ে মোদির উচ্চাকাঙ্খাকে জখম করেছে।

বিজেপিতে এছাড়াও অন্য একটি সমস্যা আছে। মোদির নিজের ভাবমূর্তির কাছে সততা বজায় রাখেন। তাও নিজের মতো করে উত্তরপ্রদেশে নেতা গঠন করতে পারেননি। কয়েকমাস আগেও যিনি ছিলেন গুরুত্বহীন, যাঁর কোনও অস্তিত্বই ছি‌ল না এমন নেতারা এখন সামনের সারিতে চলে এসেছেন। বিজেপির প্রবীণ নেতারা এতে অসুখী। রাজনাথ সিংয়ের মতো নেতারা অমিত শাহের ছত্রছায়ায় আছেন যেমন। রাজ্য রাজনীতি বা দলীয় ক্যাডারদের ভিতর অমিত শাহের তেমন কোনও ভিত্তি নেই। উত্তরপ্রদেশের মানুষ জানেন সমাজবাদী পার্টি বা বিএসপি ক্ষমতায় এলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন। তবে বিজেপি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের এখনও কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই।

এদিকে বিজেপি এখনও বিহার বা দিল্লির ফলাফল থেকে শিক্ষা নেননি। এই দুটি জায়গাতেই বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কাউকে খাড়া করেনি। খুব খারাপভাবেই হেরেছে। তবে আসামে মুখ্যমন্ত্রীর মুখ ছিল বিজেপির। ভালভাবেই সেখানে জিততে পেরেছে।

২০১৪ সালে দলিত ও অন্য অনগ্রসর শ্রেণিগুলির ভালো সমর্থন পেয়েছেন মোদি। সমাজবাদী পার্টি মোটে ৫টি আসনে জিতেছিল। বিএসপি কিছুই করতে পা্রেনি। হায়দরাবাদে রোহিত ভেমুলার ঘটনাটি এবং গুজরাটে দলিতদের মারধর করার ঘটনার পরে একথা মনে করার কোনও কারণ নেই দলিতরা মোদি বা বিজেপির প্রতি একইভাবে আস্থাজ্ঞাপন করবেন। অন্য অনগ্রসর সম্প্রদায়গুলির বহু সমস্যা আছে। সংরক্ষণ ইস্যু নিয়ে জাঠেরা ক্রুদ্ধ। হরিয়ানার ক্ষমতা ভাগাভাগির সময় তাঁরা দেখেছেন মোদির অবহেলা। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে এগুলিই বিজেপির পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে উঠবে। যোগী আদিত্যনাথের মতো ফায়ার ব্র্যান্ড নেতারা অবহেলিত হিসাবে মনে করছেন নিজেকে। এখন পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে কিছু প্রার্থীকে বিভিন্ন মঞ্চের তরফে মনোনীত করা গিয়েছে।

শেষে একথা বলাই যায়, উত্তরপ্রদেশ মোদির জন্যে সহজ জায়গা নয়। মোদির ক্যারিশমার চাহিদা আছে। অনেক ক্ষেত্রেই মোদি ব্যর্থ হয়েছে্ন। ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময়কার মোদির উন্নয়নের পরিকল্পনা এখন পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে। কেবলমাত্র কতিপয় ব্র্যান্ড মেকিং ঘোষণা তিনি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে ইতিবাচক কিছু ঘটেনি। পৃথিবীতে এখন ভারতের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মতামত হল, ভারত অর্থনৈতিকভাবে প্রবল দুর্দশায় পড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি ভারতীয় রাজনীতিকে কোনও সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে পারে। উত্তরপ্রদেশের মানুষের রায় মোদি সরকারের মেয়াদ কতদূর তা স্থির করে দেবে।

(Disclaimer: The views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the views of YourStory)