‘আশ্চ‌র্য মাটি’ দিয়ে সেরামিকের সংজ্ঞা বদলেছেন ‘অমল পটার’

0

ছোটবেলা থেকেই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। ১৯৭২ সালে টাকি গভর্নমেন্ট কলেজে বিএসসি করার সময় পড়াশোনায় ছেদ পড়ল। তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে বেশ কিছুদিন গারদবাসও করতে হয়। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ১৯৭৪ সালে সেরামিক কলেজে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হন অমল কুমার গুহ। পড়াশোনা শেষে দীর্ঘ ২২ বছর সারা ভারত ঘুরে একাধিক সেরামিক সংস্থায় কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়ার যান্ত্রিক জীবনযাপন ভাল লাগত না তাঁর। সৃজনশীল কিছু করার তাগিদ বারবারই নাড়া দিত। সেই সুযোগও জুটে গেল।

একবার বন্ধুদের সঙ্গে সুন্দরবন ঘুরতে গেছি। সেইসময় দিল্লির পাঞ্জাব পটারিজ প্রাইভেট লিমিটেড-এ কাজ করতাম। ফেরার সময় দঃ ২৪ পরগনার উত্তরভাগ গ্রামে ‘আশ্চর্য মাটি’ প্রত্যক্ষ করি। দেখলাম গ্রামবাসীরা বিশেষ ধরনের মাটিতে আগুন জ্বালিয়ে দৈনন্দিন কাজ সারছে। কোনও কয়লা বা জ্বালানি ছা়ড়াই।” এই ঘটনা তাঁকে খুব আকর্ষণ করল। সঙ্গে সঙ্গে সেই মাটির নমুনা সংগ্রহ করে পাঞ্জাব পটারিজ প্রাইভেট লিমিটেডের পরীক্ষাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন অমলবাবু।

তড়িঘড়ি দিল্লি ফিরে যান। জানতে পারেন ওই মাটি থেকে অর্ধস্বচ্ছ একটা পোর্সেলিন-এর মতো পদার্থ পাওয়া যাচ্ছে যার রং আদৌ সাদা নয়। নাম দিলেন ‘টেরা পোর্সেলিন’।

এরপরই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই”, বলছিলেন অমলবাবু। “ঠিক করলাম নিজের রাজ্যে ফিরে ‌যাব। স্থানীয় লোকেদের জন্য কিছু করব। চাকরি থেকে ইস্তফা দিলাম।” কিন্তু চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় নামার ঝুঁকিও কম ছিল না। “আমার আত্মীয়স্বজন মুখ ঘুরিয়েছিলেন পাছে আর্থিক সাহায্য চাই। পাশে দাঁড়িয়েছিলেন স্ত্রী আর বন্ধুরা।”

১৯৯৮ সালে বারুইপুরের ক্যানিং রোডের রামনগর গ্রামে জমি কেনেন অমল গুহ। গ্রামবাসীদেরই কর্মী নিয়োগ করে কাজ শুরু করেন। মায়ের নামে কারখানার নাম দেন সুবর্ণা আশ্রম। ২০০০ সাল থেকে পুরপুরি পণ্য উৎপাদন শুরু ফ্যাক্টরিতে।


সাদামাটার পরিবর্তে রঙিন সেরামিকের তৈরি আকর্ষণীয় আর্টওয়ার্ক, পটারি রাতারাতি জনপ্রিয়তা পায়। প্রথমে স্থানীয় বাজার, ধীরে ধীরে ভিন রাজ্য এমনকী বিদেশেও পাড়ি দেয় “অমল পটার”।

দিল্লি, মুম্বই, ব্যাঙ্গালোর চেন্নাই, হায়দরাবাদ, চণ্ডীগড়, ভুবনেশ্বর পাটনা -- এসব শহরে এই পণ্য রফতানি করেন অমল গুহ। চাহিদা রয়েছে ইটালি, জাপান, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, চিনেও। বর্তমানে তাঁর সংস্থার বার্ষিক আয় ৬০ থেকে ৮০ লক্ষ টাকা।


নিজের অভিনব উদ্যোগ আর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে রামনগরের আর্থসামাজিক মানোন্নয়নে অবদানের জন্য অ্যালুমনাই অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে ‘রুরাল অন্ত্রেপ্রেনিওর’ সম্মানে ভূষিত করে। নতুন আবিষ্কারের জন্য ২০০৮ সালে ইন্ডিয়ান সেরামিক সোসাইটির তরফে প্রফেসর শশধর রায় স্মৃতি পুরস্কার পান। এআইপিএমএ-এর তরফে ২০১৩ সালে সুরেশ সেন স্মৃতি পুরস্কার সহ বেশ কিছু পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে। তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না অমলবাবু। তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য অগ্নিনিরোধক বা ফায়ার প্রুফ সেরামিকের বাসনপত্র তৈরি করা যাতে খাবার তৈরি ও খাবার সংরক্ষণ দুই কাজেই লাগানো যায় এই সেরামিককে। আপাতত সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছেন ‘অমল পটার‍’।