শুরুয়াতি ব্যবসায়ীকে পাঁচটি উপদেশ

কর্পোরেট এক্সিকিউটিভদের একাংশের মধ্যে শুরুয়াতি ব্যবসা করার একটা আকর্ষণ থাকেই। ম্যানেজমেন্ট স্কুলের বুকনি, সিলেবাসের আদব কায়দা কার্যক্ষেত্রে অনেক সময়ই কাজে লাগে না। বিশেষত বিনিয়োগ আনার ব্যাপারে। কলকাতার স্টার্টআপ সংস্থাগুলির জন্য পাঁচটি উপদেশ দিলেন প্রথিতযশা রিয়েল এস্টেট সংস্থার কর্ণধার অভিজিত দাস।

0
অভিজিত দাস
অভিজিত দাস

অভিজিত দাস একটি বড় মাল্টি ন্যাশনাল কর্পোরেট সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টরের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে কলকাতায় শুরু করেছিলেন Lemongrass Advisors নামে একটি সংস্থা। মাত্র চার বছরেই কলকাতায় সবচেয়ে আলোচিত একটি রিয়েল এস্টেট কনসাল্টিং ফার্ম হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে তাঁর উদ্যোগ। জাতীয় স্তরেও এর পরিচিতি তৈরি হয়। পরে অবশ্য টিম অধিগ্রহণের মাধ্যমে Cushman and Wakefield-এর সঙ্গে মিশে যায় Lemongrass। শূন্য থেকে শুরু করে সাফল্যের শীর্ষ ছুঁয়ে দেখেছেন অভিজিত। ইওর স্টোরিকে জানালেন তাঁর বুটস্ট্র্যাপিং এর গল্প। নবীন শুরুয়াতি ব্যবসায়ীর ঠিক কোন পাঁচটা জিনিস এড়িয়ে চলাই ভালো শোনালেন সেই উপদেশও।

শুরুয়াতি ব্যবসার ব্যাপারে আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ম্যানেজমেন্ট স্কুলের থিওরি নয়, একদম হাতেকলমে উপলব্ধি। শুরুয়াতি ব্যবসার ক্ষেত্রে যা করা উচিত নয়, এমনই পাঁচটি নিচে তুলে দিলাম।

১। কার টাকা নেবেন, কারটা নেবেন না ?

ধরা যাক একজন লগ্নিকারী আপনার পাশে দাঁড়াতে টাকা ঢালতে চাইছেন। কারণ আপনার উদ্যম তাঁর ভালো লেগেছে কিংবা আপনাকে তিনি পছন্দ করেন। বিজনেস প্ল্যানের ব্যাপারে সেই লগ্নিকারী খুব একটা ভাবিত নন। এমন লগ্নিকারীর থেকে টাকা না নেওয়াই ভালো। কেন? সহজ কথাটা তাহলে শুনুন। পয়সার অপচয় কষ্টদায়ক, এমনকী ধনীদের ক্ষেত্রেও।

আপনি নন, প্রজেক্টে লগ্নিকারীর আপনার আইডিয়া, প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের ব্যাপারে অনেক বেশি আগ্রহী হওয়া প্রয়োজন। আপনি যাই হোন না কেন, বিজনেস প্ল্যান, গ্রোথ প্ল্যান, এক্সিট প্ল্যানটা তিনিও দেখে নেবেন। তিনি এমন একজন হবেন যিনি চাইবেন তাঁর অর্থের সঠিক ব্যবহার হোক, তিনি যেন বেশি রিটার্ন পেতে পারেন। তিনি যদি তেমনটা না হন, তবে জানবেন আপনার ব্যবসায় অর্থের যোগান যে কোনওদিন থেমে যেতে পারে।

তাই এমন একজনের সন্ধান করুন যিনি অনেক বেশি কৌতূহলী হবেন আপনার বিজনেস প্ল্যানের ব্যাপারে। সেটাই আইডিয়াল seed funding.

২। কেমন হবে শুরুয়াতি টিম ?

আপনার শুরুয়াতি ব্যবসার (Startup) জন্য সবচেয়ে জরুরি হাতিয়ার হল আপনার স্টার্টআপ টিম। অর্থাৎ যাঁদের নিয়ে আপনার ব্যবসার কোর টিম বা প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। পর্যাপ্ত ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বা গ্রোথ ক্যাপিটালের থেকেও এই স্টার্টআপ টিম অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন তেমন ভাবে একটা স্টার্টআপ টিম গড়লে কিন্তু হবে না। আপনার বন্ধু, পরিচিত কিংবা পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকে বাছাই করে একটা স্টার্টআপ টিম হয়তো গঠন করলেন। কিন্তু সেই টিম কাজের নাও হতে পারে। কিংবা এমন একটা দল বাছলেন যাঁদের সবাই একই বিষয়ে দক্ষতার অধিকারী। সেটাও উচিত হবে না।

তাহলে কেমন হবে স্টার্টআপ টিম? উত্তরটা লুকিয়ে রয়েছে ১ নম্বর পয়েন্টের মধ্যেই। এমন একটা টিম হবে, যাঁরা আপনি নন, আপনার বিজনেস প্ল্যানের ব্যাপারেই বেশি উৎসাহী হবেন। সেই সদস্যদের বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দক্ষতা থাকবে। এবং সামগ্রিকভাবে সর্বগুণসম্পন্ন একটা দল গড়ে উঠবে।

এমন একটা টিম তৈরি করতে না পারলে স্টার্টআপ নৈব নৈব চঃ।

৩। বোঝা নামিয়ে কাজে নামুন

আপনি শুরুয়াতি ব্যবসা করতে চাইছেন এমন এক সময়ে যখন আপনাকে প্রতি মাসে একটা বড় অঙ্কের EMI দিতে হয়। ধরা যাক আপনার স্টার্টআপ টিমের সদস্যরাও একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে। এমন এক পরিস্থিতিতে আপনি কি মন দিয়ে শুরুয়াতি ব্যবসা করতে পারবেন? বিভিন্ন কারণে আপনার economic cycle কিন্তু বাধা পেতে পারে।

ব্যবসার ক্ষেত্রে সার্ভিস ট্যাক্স দেওয়াটা জরুরি। ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে আপনার EMI দেওয়াটাও জরুরি। যদি হাতে টাকা কম থাকে এবং দুটোর মধ্যে একটাকে বাছতে হয় তখন আপনি কী করবেন? আরও বিষয় রয়েছে। স্টাফদের নির্দিষ্ট সময়ে বেতন দিতে হবে, ভেন্ডরদের পেমেন্ট করতে হবে, রেকারিং এক্সপেন্স রয়েছে। এখন আপনার কী করণীয়?

মোদ্দা কথাটা হল, ঘাড়ে বড় অঙ্কের EMI-এর বোঝা নিয়ে শুরুয়াতি ব্যবসা করতে যাবেন না। সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করুন যখন আপনার প্রতি মাসে এই ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকবে না বা কম থাকবে। সেইসঙ্গে পরবর্তী দুই থেকে তিন বছরের সাংসারিক খরচখরচার জন্য একটা টাকা তুলে রাখতে হবে। খোলা মনে কাজ করলে শুরুয়াতটা অবশ্যই ভালো হবে।

৪। কর্মচারীর কাছে অতি প্রত্যাশা করবেন না

অনেক আশা নিয়ে, ভাবনাচিন্তা করে আপনি একটা ব্যবসা শুরু করেছেন। বেশ কয়েকজন কর্মচারীও রেখেছেন। কিন্তু আপনার মনে হচ্ছে আপনি যেভাবে ভাবেন বা ভাবছেন তাঁরা তেমনটা ভাবছে না। আসলে সেটাই হয় বা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ৯৮ শতাংশের কাছেই এটা একটা চাকরি। এর বেশিকিছু নয়। কাজ করবেন, মাইনে নেবেন। এই ভাবেই তাঁরা আপনার কাজে যোগ দিয়েছেন। এর বেশিকিছু তাঁদের থেকে প্রত্যাশা করাটা ভুল। কর্মচারীরা সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে এসেছেন, বয়সের তারতম্য রয়েছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাও ব্যক্তিগত। তাই কর্মীদের কাছে বাড়াবাড়ি রকমের প্রত্যাশা না থাকাই ভালো। তবে এদেরই মধ্যে এমন কাউকে আপনি পেতে পারেন যে কিনা আপনার সমবয়সি এবং আপনার সঙ্গেই রিটায়ার করার কথা ভাবছে এবং আপনার বিজনেস প্ল্যানে যার আস্থা আছে।

৫। টাকার প্রয়োজন! আগেভাগে টের পান

ব্যবসা চালানোর মতো পুঁজি বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল আপনার আছে। কিন্তু ব্যবসা বাড়ানোর প্রয়োজনে বা অন্য ব্যবসায়িক কারণে আপনার আরও টাকার দরকার। তখন আপনি কী করবেন? এটাও আপনাকে আগে থাকতে ভেবে রাখতে হবে। সময় থাকতেই Additional Working Capital /Growth Capital-এর ব্যবস্থা আপনাকে করে রাখতে হবে। মাসের শেষে কর্মীদের মাইনে কীভাবে দেবেন বা খরচ চালাবেন সেটা ভেবে আপনাকে যেন মাথার চুল ছিঁড়তে না হয়। সহজ কথা হল টাকার প্রয়োজন হওয়ার আগেই আপনাকে তার ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। তাই দেরি করবেন না।

(এই প্রবন্ধের লেখক অভিজিৎ দাস ফাউন্ডার ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর Lemongrass Advisors Private Limited-এর। ২০১৩ সালে acquisition-এর মাধ্যমে Cushman and Wakefield India-র সঙ্গে মিশে যায় Lemongrass Advisors। লেখক বর্তমানে Cushman and Wakefield-এর Office Director-East India).