Hijup.com – অনলাইনে মুসলিম পোশাকের অনবদ্য সম্ভার

0

পর্দার আড়ালে থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখার দিন শেষ হল মুসলিম মহিলাদের। পোশাকের এক অনবদ্য সম্ভার নিয়ে হাজির হয়েছে Hijup.com. ডিয়াজেং লেস্তারি, একজন ইন্দোনেশিয়ান আন্ত্রেপ্রেনর শুরু করেছেন বিশ্বের প্রথম ই-কমার্স সাইট, যেখানে রয়েছে মুসলিম পোশাকের সব অনন্য ডিজাইন। এই সমাজের পর্দা প্রথা আসলে মেয়েদের জীবনের অনেকখানি পরিধিকে ছোট দেয় আর এখান থেকেই লেস্তারির মনে হয়েছে যে এই পর্দার মধ্যেও আলঙ্কার আনা সম্ভব। হাল ফ্যাশান এর স্বাদ দেওয়া সম্ভব। আসলে ইন্দোনেশিয়া হল পৃথিবীর সবথেকে বড় মুসলিম প্রধান দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশ মানুষই হলেন মুসলিম। কিন্তু মুসলিম মহিলাদের পোশাকের ব্যাপারে কেউই খুব একটা সচেতনতা দেখায়না এখানে। এই কারণে এখনও কোন ব্র্যান্ড সচেতনতা তৈরি হয়নি। আর এই সমস্যা সমাধানেই নিবেদিত প্রাণ ডিয়াজেং লেস্তারি।

প্রচলিত প্রথার আড়ালে থাকা এই সম্প্রদায়ের মানুষদের সাথে অনেক আলোচনা করে, তাদের মনের কথা জানার চেষ্টা করেছেন লেস্তারি। সেখান থেকে তিনি উপলব্ধি করেন যে ওই মানুষগুলোর মধ্যেও হালফ্যাশানের জামা-কাপড় পরার ইচ্ছাটা প্রবল। বাইরের দুনিয়া যখন নতুন প্রযুক্তি অথবা ডিজিটাল মিডিয়ার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সারা পৃথিবীর পোশাক-আশাক আপন করে নিতে পারছে তখন কিন্তু এরা এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকছে শুধুমাত্র ধর্মের বাঁধার কারণে। লেস্তারি তৈরি করেছেন একটা ব্র্যান্ড যেখানে একাধারে ডিজাইনাররা পাচ্ছেন নিজেদের সৃষ্টিকে তুলে ধরার সুযোগ আবার অন্যদিকে ক্রেতারা পাচ্ছেন নিজেদের চাহিদা মতো পণ্যের সমাহার। অনেকটা যেন বাড়িতে বসে শপিং মলের ছোঁয়া পাওয়া।

ইউনিভার্সিটি অফ ইন্দোনেশিয়া থেকে পলিটিকাল সায়েন্স নিয়ে পড়াশুনা করেন লেস্তারি। সাথে কিছুটা ইকনমিক্সও নিয়ে নাড়াচাড়া করেছিলেন সেই সময়ে। আর এসব পড়তে গিয়ে তিনি কিছু বেসিক জিনিস বুঝতে পারেন যা তার এই ব্যাবসার মূলধন হিসাবে কাজ করে পরবর্তীতে। তিনি বুঝতে পারেন যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য দরকার চাহিদার তুলনায় বেশি যোগান। আর ঠিক এটাই ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক অচলাবস্থার কারণ। এখানে চাহিদা থাকলেও পন্য যোগানের অভাব বর্তমান। পলিটিকাল সায়েন্সের ছাত্রী হওয়ার জন্য সে বুঝতে পেরেছিল একটা দেশের উন্নতির জন্য রাষ্ট্রের ঠিক কি কি করণীয় আর এই শিক্ষাই সে তার নিজের কোম্পানীতে প্রয়োগ করছেন সাফল্যের চাবিকাঠি হিসাবে।

লেস্তারি বলছিলেন যে স্নাতকোত্তর পর্বে প্রথমে সে ‘মার্স, ইন্দনেশিয়া’ তে গবেশনার কাজ শুরু করেন। এই সময় তিনি লক্ষ্য করেন যে অনেক বড় বড় কম্পানী ওই দেশে নিজেদের ব্র্যান্ড নিয়ে হাজির হলেও তাদের কেউই সেখানকার মুসলিম সম্প্রদায়কে নিয়ে কিছু ভাবনা চিন্তা করছিল না। তিনি তখন নিজে থেকে কিছু ডিজাইনার বন্ধু, বান্ধবীদের সাথে যোগাযোগ করেন কারণ তিনি চাইছিলেন যে এই ডিজাইনার বন্ধুদের একসাথে এক ছাদের তলায় আনতে, একটা নতুন ব্র্যান্ড তৈরি করতে, একটা অনলাইন শপিং সাইট তৈরি করতে, মুসলিম মহিলাদের বেশ একটা কেতাদুরস্ত ফ্যাশানের স্বাদ দিতে। তিন বছর আগে এই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় Hijup.com, বিশ্বে প্রথম এই ধরণের অনলাইন সাইট।

তবে এই শুরুর কাজটা মোটেই খুব একটা সুখকর ছিলনা লেস্তারির। বিভিন্ন ডিজাইনারদের এক মঞ্চে আনার জন্য প্রথম দিকে অনেকের দরজায় দরজায় ঘুরতে হয়েছে ওকে। মাত্র ১৪ জন বিক্রেতাকে নিয়ে শুরু হয়েছিল এই পথ চলা। আজকে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৮৩। আজকে এই সাইটে ভিসিটারের সংখ্যা প্রায় আট হাজার। প্রথম দিকে হিজবার’স সম্প্রদায়ের(ইন্দনেশিয়ার এক বিশেষ সম্প্রদায়)মহিলাদের সাথে অনেক কথাবার্তা বলতে হতো, তাদের বোঝাতে হতো যে এই সাইট থেকে পোশাক কিনলে কি সুবিধা আর কি অসুবিধা। তাদেরকে বোঝাতে হয়েছে যে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে বিক্রেতারা পৌঁছে যেতে পারেন বিশ্বের প্রতিটা কোণে। এখন সেখান থেকে অনেক ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে। আজকে ১৭ জনের একটা দল তৈরি হয়েছে Hijup.com। এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার যে যদিও ক্রেডিট কার্ড এখনও ইন্দোনেশিয়াতে সেভাবে প্রচলন নেই, তবুও কর্মরত মহিলারাই বেশি এখান থেকে কেনাকাটা করে থাকে। বিভিন্ন ধরণের হিজাব, যেমন চিপুত (ভেতরে পরার হিজাব), মান্সেত, মুকেনা (প্রার্থনার সময় পরার পোশাক), এসবই এখানে খুব সুলভ মুল্যে এবং সুন্দর ডিজাইনে পাওয়া যায়। লেস্তারি বলছিলেন যে কিছুদিন আগেই অফিসের স্টুডিওতে ওনারা একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল, যেখানে অনেক মুসলিম মহিলারা অংশগ্রহণ করেছিল এবং নিজেদের রংবেরঙ্গের হিজাবে সাজিয়ে তুলেছিল তারা। খুব ভালো সাড়া পাওয়া গেছিল এই প্রতিযোগিতা থেকে। ডিজাইনাররা নিজেদের সৃষ্টি ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল আরও অনেক বেশি মানুষের মধ্যে। এছারাও বেশি করে মার্কেটিঙের জন্য অনেকসময় অফিসের মধ্যে ফটোশুট বা বিভিন্ন রকম ভিডিও করা হয়ে থাকে। আসলে বিক্রেতাদের সাথে ক্রেতাদের একটা সুন্দর যোগসূত্র তৈরি করে দেওয়া এবং বিক্রেতারা যাতে নিজেদের ব্র্যান্ডকে আরও উন্নত করতে পারে এবং আরও বেশি জায়গায় ছড়িয়ে দিতে পারে, সেই ব্যাবস্থা করাই হল আসলে Hijup.com এর মুল উদ্দেশ্য। আর এই লক্ষে আরও বেশি সাফল্য পাওয়ার জন্য নিজেদের একটা ইউটিউব চ্যানেল তৈরি করেছে, যেখানে মুসলিম মহিলাদের জন্য অনেক রকম টিপস্ দেওয়া থাকে। আর এখান থেকেই লেস্তারি বুঝতে পারেন যে শুধু দেশে নয় বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে তার কোম্পানির নাম। অনেক বিদেশি মানুষ এই চ্যানেল দেখেন প্রতিনিয়ত। তাই তিনি ঠিক করেছেন যে পরবর্তীতে প্রথমে সিঙ্গাপুর, মালয়শিয়া এবং তারপর ভারত পাকিস্তানের মতো মুসলিম জনবসতিপূর্ণ জায়গা গুলোতেও তিনি ছড়িয়ে দিতে চান তার ই-কমার্স এর সুযোগ-সুবিধা। লেস্তারির মতে দর্শক কে আকর্ষণীয় লেখা বা ভিডিও দেখাতে পাড়াই হল তাদের সাফল্যের আসল চাবিকাঠি আর এই কারনেই তাদের ইউটিউব চ্যানেলটি এখন ইন্দোনেশিয়ার একটা জনপ্রিয়তম চ্যানেল।

আসলে আন্ত্রেপ্রেনরশিপ ব্যাপারটা লেস্তারির পারিবারিক। ওর স্বামিও একজন আন্ত্রেপ্রেনর। তিনি ‘বুকালাপাক’ নামে একটা কোম্পানি চালান। আর এটাই পরিবারের সাফল্যের একটা বড় কারণ। নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন রকম আলোচনা করলে বা নিজেদের ধারণাকে আদানপ্রদান করলে সেটা আখেরে লাভদায়ক হয়। চলার পথে বিভিন্ন ওঠা-পরা আসলে মানুষকে আরও উন্নত করে তোলে, ভাবতে বাধ্য করে আরও গভীর থেকে, আর সেটাই হয়েছে লেস্তারির ক্ষেত্রেও। মেকিন্সের রিপোর্ট অনুযায়ী ইন্দোনেশিয়ার বাজার চাহিদা খুব শীঘ্রই ৮৫ মিলিয়ন ছুঁয়ে ফেলবে, তাই ব্যাবসা করার জন্য এটাই একদম আদর্শ সময়। ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে লেস্তারি মনে করে যে এই দেশে ব্যাবসায়ী মহিলাদের কেউ আলাদা চোখে না দেখলেও সংখ্যাটা নেহাতই খুব কম। কিন্তু আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে এই সংখ্যাটা বেশি হওয়া দরকার আর বিশ্বাস করেন যে এই পরিবর্তন টা অবশ্যম্ভাবী।

এই ই-কমার্স সাইট টা আসলে ছোট ব্যাবসায়ী আর ডিজাইনারদের উন্নতির জন্য কাজ করছে। ব্যাক্তিগত ভাবে লেস্তারি মনে করেন যে ছোট ব্যাবসায়ী দের বেড়ে উঠতে সাহায্য করা, তাদের একটা ভালো ব্র্যান্ড তৈরি করতে সাহায্য করাই হল তার লক্ষ্য। আর এই সাহায্য করার মধ্যেই আসলে আনন্দ খুঁজে পান লেস্তারি। নিজের ডিজাইনাররা এবং ছোট ব্যাবসায়ী বন্ধুরা নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি করে জীবনে উন্নতি করবে এটাই তার মানসিক শান্তি, নিজেকে খুশি রাখার রশদ।  


অনুবাদঃ নভজিত গাঙ্গুলী