রোলস রয়েস হাঁকান নাপিত রমেশ বাবু

কোটিপতি নাপিতের গল্পটা ঠিক যেন রূপকথা। নায়কের সামনে অপ্রতিরোধ্য বাধা, সে সব টপকে নায়ক শুধু অধ্যবসয়ে ভর করে পৌঁছলেন সাফল্যের এমন স্বর্গে যা আমাদের অনুপ্রাণিত করে। কখনও পুরনো হয় না সেসব গল্প। চিরদিন আমাদের উজ্জীবিত করতে থাকে। ঠিক তেমনটাই করছে এই রমেশ বাবুর কাহিনি।

0

১৯৯৩ সালে কষ্টে শিষ্টে একটা মারুতি ভ্যান কিনতে পেরেছিলেন রমেশ বাবু। আর ২০০৪ এর মধ্যে তিনি ২০০টি গাড়ির মালিক। ৭৫ টি বিলাসবহুল গাড়ি আছে তাঁর। কী নেই অডি থেকে শুরু করে মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, দশ আসনের বিলাসী ভ্যান। এমনকি বিশ্বের ধনকুবেরদের ইর্ষা জাগানো রোলস রয়েসও কিনে ফেলেছেন রমেশ।

রমেশ বাবুর জীবনের প্রথম দিকটা বেশ কষ্টে কেটেছে। সে ছিল বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম। আর আজ সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছেন। নিজেকে নাপিত বলতে গর্ববোধ করেন রমেশ। হাইস্কুলের দিনগুলি থেকেই এই পেশায় আসাটা রমেশের নির্ধারিত ছিল। পৈতৃক পেশা বলে কথা। পরিবার চালাতে এই তো অন্নের সংস্থানের উপায়। এখনও এটাই তার একমাত্র তৃপ্তির জায়গা। মাত্র একশ টাকায় চুল কাটেন। এত নাম ডাক, টেলিভিশন চ্যানেল, খবরের কাগজে এত প্রচার, এত প্রশংসায় অটল অবিচল বিনয়ী নম্র রমেশ দুনিয়ার চোখে ‘কোটিপতি নাপিত’। এই তো এবছরের গোড়ার দিকে টেডটকে বক্তৃতা দেওয়ার সময়ও রমেশ নিজের এই পরিচয়ই দিয়েছেন।আর এভাবেই নাগরিক মানুষের মুখে মুখে ফেরা জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে গিয়েছেন রমেশ বাবু।

লিওনার্দ উইলোবি বলেছিলেন,“যখন তুমি তোমার নিজের আদেশ মেনে চলা শুরু কর আর সাহসে ভর দিয়ে চল তখন খোলনলচে আমুল বদলে যায়।” কর্নাটকের রমেশ বাবু। পেশায় নাপিত।নিজের ভবিষ্যত গড়ার সময় ঠিক এটাই করেছেন। নিজেই বললেন তাঁর উদ্বুদ্ধ করা গল্পটা।

রমেশের কঠিন শুরু

খুব গরিব ঘরে জন্মেছিলাম। বাবা ছিলেন একজন সা‌ধারণ নাপিত। ১৯৭৯ সালে মারা গেলেন। তখন আমার সবে সাত বছর বয়স। আমার মা লোকের বাড়ি ঠিকে কাজ করে সংসার চালাতেন। ব্রিগেড রোডে বাবার একটা সেলুন ছিল। আমার কাকা ওটা চালানোর জন্য নিয়েছিলেন। দিনে পাঁচ টাকা করে দিতেন। মাত্র পাঁচ টাকা। সেদিনও পাঁচটাকায় কিছুই হত না। আমি আমার ভাই বোনেদের দেখভাল খাওয়া পরা থেকে শুরু করে লেখাপড়া কিছুই দৈনিক ৫ টাকায় হওয়া সম্ভবই ছিল না। ফলে ভীষণ কষ্টে দিন কাটত। আমরা বেঁচে থাকার জন্য দিনে শুধু একবেলা খেতাম। যখন আমি স্কুলে পড়ি মনে আছে দুটো পয়সা রোজগার করার জন্য বিভিন্ন রকম কাজ করতাম। বাড়ি বাড়ি কাগজ দিতাম, দুধের বোতল পৌঁছে দিতাম আর যা যা করা সম্ভব ছিল সে সব করতাম। মুখে রক্ততুলে মা পরিশ্রম করত। মার পরিশ্রম লাঘব করার আমি চেষ্টা করতাম। এভাবেই কোনও ক্রমে দশ ক্লাস টপকে গেলাম। এগারো ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলাম একটা সান্ধ্য কলজে। আর সেই সময়ই একটা বড় পরিবর্তন এল।

জীবনের মোড় ঘুর‌ল

১৯৯০ এর কোনও এক সময়। আমি সবে একাদশ শ্রেণির ছাত্র। হঠাতই আমার কাকা আমাদের টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিলেন। আমার মায়ের সঙ্গে কাকার তুমুল ঝগড়া বাঁধল। সেদিন আমি স্থির করলাম, আর নয়। মাকে জানিয়ে দিলাম, এবার থেকে বাবার সেলুনটা আমিই চালাব। কিন্তু মা বলছিলেন পড়াশুনোকেই ‌গুরুত্ব দিতে। যাই হোক সেই শুরু। সকালে সেলুনের কাজ আর রাতে কলেজ। ব্যবসা শিখতে শুরু করলাম। কলেজের পর ফের সেলুনে যেতাম। ভোর রাত ১ টা পর্যন্ত খোলা রাখতাম সেলুনটা। তখন থেকেই লোকজন আমাকে নাপিত বলে ডাকে।

ঘুরে দাঁড়ানোর আইডিয়া

পড়ে ১৯৯৩ সালে একটা পুরনো মারুতি ভ্যান কিনলাম। আমার কাকা একটা ছোট গাড়ি কিনেছিল। তার থেকে ভালো গাড়ি কিনব এই রকম ভেবেই আমিও কিনে ফেললাম। কিছু জমিয়েছিলাম সেই টাকা আর কিছু টাকা ধার নিয়েই কিনে ফেলেছিলাম প্রথম গাড়িটা। আর কাকার থেকে একটু হলেও ভালো গাড়ি কিনেছি ভেবে ভীষণ আনন্দও পেয়েছিলাম। এই ধার নিতে আমার ঠাকুরদাদুকে তাঁর সম্পত্তি বন্দক রাখতে হয়েছিল। ওই ধারের সুদ ছিল ছ হাজার আটশ টাকা। ওই টাকা শোধ দিতে আমার দম বেরিয়ে যেত। আমার মা যার বাড়িতে কাজ করতেন সেই মহিলাকে আমি নন্দিনী আক্কা বলে ডাকতাম। তিনি একদিন বললেন ফেলে না রেখে কেন আমি গাড়িটাকে ভাড়া দিচ্ছি না। তিনিই আমাকে এই ধরণের ব্যবসার মৌলিক মন্ত্রটা শিখিয়ে দিলেন। তিনি আমার দিদির মত। আমার জীবনের একটা বড় অংশ জুরে তিনি আছেন। তার মেয়ের বিয়েতে আমায় নেমন্তন্ন করেছিলেন আর সবাইকে ডেকে ডেকে আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন।


কীভাবে গড়ে উঠল একটা সফল ব্যবসা

১৯৯৪ সাল থেকে আমি পুরোদস্তুর গাড়ি ভাড়া দেওয়ার ব্যবসায় লেগে পড়লাম। প্রথম যে সংস্থায় আমি গাড়ি ভাড়া দিয়েছিলাম সেটা ছিল ইনটেল। কারণ নন্দিনী আক্কা ওখানে কাজ করতেন। উনি আমাকে বরাতটা পাইয়ে দিতে অনেক সাহায্য করেছিলেন। ধীরে ধীরে আমি আরও গাড়ি এই ব্যবসায় লাগাতে শুরু করলাম। ২০০৪ পর্যন্ত আমার কাছে পাঁচ ছ’টা গাড়িই ছিল। আমি সেলুনের ব্যবসাটা ছেড়ে দিলাম। কেননা ওটা প্রাধান্য হারিয়ে ফেলেছিল। এদিকে, গাড়ির ব্যবসাতেও তেমন রমরমা আর ছিল না। কেননা সকলের কাছেই ছোট গাড়ি ছিল। আমি ভাবলাম এবার বিলাস বহুল দামি গাড়ি কিনতে হবে। গাড়ি ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা যারা করতেন তাঁদের কারও কাছেই দাবি বিলাসবহুল গাড়ি ছিল না। তাই ঝুকিটা নিলাম।

ঝুকি নেওয়ার প্রসঙ্গে

যখন আমি প্রথম বিলাসবহুল গাড়িটা কিনলাম সবাই রে রে করে উঠেছিল। বলেছিল আমি ভুল করছি। সত্যিই তো ২০০৪ এ একটা গাড়ির পিছনে ৪০ লাখ লাগানো ভীষণই ঝুঁকির ছিল। আমার বিশ্বাস ছিল তবু মনে মনে ঠিক করেছিলাম যদি না চলে তাহলে বেঁচে দেব। কিন্তু সৌভাগ্যবশত, দারুণ চলল। গোটা ব্যাঙ্গালোরে কারও কাছে ঝাঁ চকচকে নতুন দামি বিলাস বহুল ভাড়ার গাড়ি ছিল না। ফলে আমায় পায় কে? সত্যিই দারুণ চলল। যদি আপনি ব্যবসা করতে চান আপনার মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার ইচ্ছে থাকতে হবে। আর ২০১১ সালে রোলস রয়েস যখন কিনলাম তখনও একই কথা বলেছিলেন শুভাকাঙ্খীরা। এতদামি গাড়ি কিনলে ঠকতে হতে পারে, ইত্যাদি। আমি তাদের বলেছিলাম ২০০৪ এ একবার আমি ঝুঁকিটা নিয়েছি। কেন দশ বছর পর ফের ঝুঁকিটা নেব না? চার কোটি টাকা লাগল রোলস রয়েসটা কিনতে। কিন্তু দারুণ ব্যবসা করছে রোলস রয়েসটা। দারুণ জনপ্রিয়ও হয়েছে। এই ডিসেম্বরে ওর শেষ ইএমআই দিলে ধারও শোধ হয়ে যাবে।

সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ

সব ব্যবসাতেই উত্থান পতন, প্রতিবন্ধকতা থাকেই। এই তো গত বছর তিন কোটি টাকার কিছু বেশি শুধু রোড ট্যাক্স দিয়েছি। আমি ভালো করে বলতে পারব না ঠিক কীভাবে আমি টাকা গুলো বের করেছি। বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছি। সম্পত্তির কাগজ পত্র জমা রেখে টাকা নিতে হয়েছে। সব ব্যবসাতেই ফি বছর সমস্যা গুলো ঘুরে ফিরে আসে। সেগুলিকে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে এবং শক্তভাবে মোকাবিলা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। ধরুন এই রোডট্যাক্সের ক্ষেত্রেই আমাকে কিছু দিন ভুগতে হচ্ছে। কিন্তু অন্য বছর তো আর এগুলো এভাবে আর সমস্যা করবে না।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা

আগে তিন মাসের কর এক সঙ্গে দিতাম। কর এত আকাশ ছোঁয়া হয়েছে যে এখন কদিন ব্যবসা বাড়ানোর পথে আর হাঁটছি না। তবে ২০১৫ য় একটা লম্বা লিমুজিন কেনার ইচ্ছে আছে। সঙ্গে আরও কয়েকটা এরকম গাড়ি কিনব।

টেড টকের স্টেজে দাঁড়িয়ে রমেশ বাবু ছাত্রদের যা বলেছিলেন সেকথাই ভবিষ্যতের ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলতে চান।“বিনয়ের সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করো। আর বাকিটা ভাগ্য।”