ভাজা মাছটি উল্টে খেতে, নিগমের তাজা উদ্যোগ

1

এই গরমে মুড়ি, পান্তা না খিচুড়ি! যা ইচ্ছে তাই খান কিন্তু সঙ্গে খান মাছ ভাজা। পেটের শান্তি, জিভেরও তৃপ্তি। এসব নিয়ে নানান এক্সপেরিমেন্ট করছে রাজ্য মৎস্যোন্নয়ন নিগম। কিরণময় নন্দ যখন মৎস্য মন্ত্রী ছিলেন তখন থেকেই বাঙালির মাছের প্রতি প্রেমকে নগদে কনভার্ট করার কাজ শুরু হয়। বেনফিসের গাড়িতে লাইন দিয়ে মাছের পদ বিক্রি হয় এখনও। মাছকে প্লেটে কীভাবে ক্লায়েন্টের প্লেটে গারনিশ করা যায় তাই নিয়ে কিছুদিন হল রীতিমত মেতে উঠেছে মৎস্যোন্নয়ন নিগম। নিয়ম করে একের পর এক এক্সপেরিমেন্ট চলছে। গেরি গুগলিকে খাবারের তালিকায় জায়গা দেওয়া, পাড়ায় পাড়ায় মাছ বিক্রির এজেন্ট নিয়োগ করার মত কর্মকাণ্ড যেমন চলছে তার পাশাপাশি চলছে মাছ ভাজাকে ফাস্টফুডের মর্যাদা দেওয়ার কাজ। কোমর বেঁধে নেমেছে নিগম।

মাছ ভাজাকে জনপ্রিয় করতে এবার নতুন করে মেনু তৈরি করছে নিগম। চেখে দেখতে ঘুরে আসতে পারেন নলবন ফুডপার্ক। সেখানে মেছো পদের একটি রেস্তোরাঁ খোলা হয়েছে। তাজা মাছ ভাজা খাওয়ার জন্যে ভিড় জমছে। খাস কলকাতায় অন্তত পাঁচটি আউটলেট ‘ভাজা মাছ’-এর জন্যই উৎসর্গ করতে চায় তারা। যার চটকদার বিজ্ঞাপনী ক্যাচলাইন, ‘ভাজা মাছটি উল্টে খান’!

বাঙালি আর তার মাছের প্রতি অনস্বীকার্য অনুরাগের কথা মাথায় রেখে নলবন, বিকাশ ভবন, ইকো পার্ক, ক্যাপ্টেন ভেড়ি থেকে নবান্নের আউটলেট সর্বত্রই ঢেলে সাজছে মেনু। নিগমের ব্র্যান্ড ‘অল ফিস ফ্রায়েড’-এর ইউএসপি কিন্তু বাঙালিয়ানা। মেনুতে তারই ছোঁয়া স্পষ্ট। বাঙালির পাতে ইলিশ-খিচুড়ির ধ্রুপদী যুগলবন্দির পাশাপাশি পেশ হচ্ছে, পান্তাভাত-চাপিলা বা পেঁয়াজমুড়ি-তোপসে, পেঁয়াজমুড়ি-মাছের ডিমের বড়া, গলদা মুড়োর বড়া, পেঁয়াজমুড়ি-মাছের মুড়োর চপের মতো সম্ভাবনাময় জুটিকে। কাতলা-পেটি, চিংড়ি থেকে শুরু করে মৌরলা, পুঁটি, তেলাপিয়া, বাটা মাছের ভুরজি বা চপের কাছে অন্তত ১০ গোল খাবে বাকি সব স্ন্যাকস!

নিগমের নিজস্ব ভেড়িতেই প্রচুর মাছ হয়। এর আগে ইওরস্টোরি আপনাদের জানিয়েছে, শহরের মানুষের কাছে তাজা মাছ পৌঁছে দিতে বাইকে করে বাড়ি বাড়ি মাছ নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে নিগম। তাতে অনেক বেকারের কর্মসংস্থানও হয়েছে। মাছের বিক্রি বাড়াতে নানা সরকারি মেলায় মাছের সম্ভার নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে সরকারি আউটলেটগুলি। সরকারি খাদ্যমেলা ‘আহা রে বাংলা’তেও খাদ্যরসিকদের ভিড় হরেক রকম মাছের পদ চেখে দেখার সুযোগ নিতে। কিন্তু মাছ নিয়ে নিগমের এত মাতামাতি কেন? ‘লোকে যত বেশি মাছভাজায় মজবে, মাছ ঘিরে পাড়ায়-পাড়ায় খুলবে কর্মসংস্থানের দরজা’,মৎস্যমন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিং খোলসা করলেন সেই রহস্য। বাঙালিয়ানাকে পুঁজি করে আদতে এক ঢিলে দুই পাকি মারার চেষ্টা। মাছকে বাঙালির কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলা এবং তার উপর নির্ভর করে প্রচুর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া। ‘সামান্য ভাজার চাটু বা কড়াই, ইনডাকশন হিটার সঙ্গে থাকলেই ছোটখাটো স্তরে যে কেউ মাছভাজার ব্যবসা শুরু করতে পারবেন। নিগম এবং তার সহযোগী কয়েকটি সংস্থার ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হবে। মাছ দিয়ে নিগমই সাহায্য করবে। ‘অল ফিস ফ্রায়েড’-ব্র্যান্ডের গুণমান বজায় রাখতেই দরকারে তালিম দেওয়া হবে ইচ্ছুকদের’, মাছ নিয়ে নিগমের বাড়াবাড়ির পেছনে এমনই নানা সম্ভাবনার কথা জানালেন এমডি সৌম্যজিৎ দাস।মন্ত্রীর জানান, নিগমের ১২০০ হেক্টর জলাশয়ে মাছের অভাব নেই। টাটকা মাছভাজার মতো স্বাদু, স্বাস্থ্যকর খানার জোগানেও কোনও অসুবিধা হবে না।

আর একটা লক্ষ্যমাত্রাও অবশ্য রয়েছে। মেছো মেনুর সৌজন্যে গত ছ’বছরে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে নিগমের মুনাফা। মোটে ১৫ লক্ষ থেকে এখন প্রায় চার কোটির কাছাকাছি। মাছভাজার হাত ধরে এ বছর লাভের অঙ্ক সাড়ে চার কোটি ছুঁয়ে ফেলত পারে বলে তাদের আশা।

এই বর্ষায় মাছভাজার একটি উৎসব চালু করার পরিকল্পনা করছে মৎস্য দফতর। মাছভাজার সম্ভার নিয়ে শীঘ্রই তারা পৌঁছে যাবে যাদবপুর, প্রেসিডেন্সির মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছেও। ‘বাড়িতে তো বাঙালি মাছভাজা খেয়েই থাকে! তেলেভাজা, রোল-চাউমিনের মতো স্ট্রিট ফুডের জায়গাটাই বা মাছভাজা কেন নেবে না!’, রোল,চাউমিনের কালচার ভাঙতে খানিকটা চ্যালেঞ্জের সুর রাজ্যের মৎস্যমন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহের গলায়। তবে নিগমকে মাথায় রাখতে হবে দামের কথা। রোল চাউমিনের দামে যদি টাটকা মাছভাজা মানুষের পাতে স্ন্যাকস হিসেবে তুলে দিতে পারেন তবেই সেই দিকে ঝুঁকবেন ক্রেতারা।