নিউটাউন যেন তাঁর স্টার্টআপ! 'আইডিয়া-মেশিন' দেবাশিস সেন

2

কল্লোলিনী কলকাতার আজকাল ঈর্ষা হয়। আড় চোখে দেখে আর যৌবনের আহ্লাদের দিনগুলো মনে পড়ে। রীতিমত নস্টালজিক হয়ে যায়। তখন তার বুকের ওপর একের পর এক মাথা তুলছিল সাহেবদের কাছারি। বাসস্থান। ধনী ব্যবসায়ী, রাজারাজড়া, জমিদার, নবাব বাহাদুরদের মেহফিল খানা। প্রাসাদ। কাজের সন্ধানে গফুররা আসত, গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে। কলকাতার আনাচে কানাচে ঠাঁই খুঁজত। কল-কারখানায় ভোঁ সাইরেন বাজলেই লক্ষ লক্ষ মানুষের উনুন থেকে বেরত ধোঁয়া। কলকাতার সে এক মচমচ করা যৌবন ছিল। তখন কলকাতা ছিল প্রতিস্পর্ধার রাজধানী। কলকাতা তখন ভারতের নীলকান্ত মণির মত জ্বলজ্বল করত। সময় এগিয়েছে। ইতিহাসের ঘটনাক্রমে হলদে ছোপ লেগেছে এই শহরের গায়ে। এখন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের টঙে ঢঙ করে দাঁড়িয়ে থাকা বয়সী পুতুলটা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তার উপকণ্ঠে আরও এক ডাকসাইটে রূপসীর কদর বেড়েছে আজকাল। তার একটা ইংরেজি নাম আছে। নিউটাউন।

তন্বী শ্যামা শিখরী দশনা... এই শহরও তিলে তিলে তিলোত্তমা হয়ে উঠছে। প্রতিদিন নজরানা পাচ্ছে একের পর এক আধুনিক অলঙ্কার। রাতের অন্ধকারে আলোয় ঝলমল করে ওঠে। দিনের আলোয় ফুটে ওঠে সবুজের আঁচল।

কেন্দ্রের ছাড়পত্র পাওয়া স্মার্টসিটি হওয়ার দৌড়ে নিউটাউন। পূর্বাঞ্চলের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই তরুণী শহরেই গড়ে উঠতে চলেছে স্টার্টআপ হাব। ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি বেসরকারি ইউনিভার্সিটি। ক্যান্সার হসপিটাল। সাধারণ অন্যান্য চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রচুর আবাসন প্রকল্প। আন্তর্জাতিক মানের বিজনেস সেন্টার, পার্ক। ওয়াক্স মিউজিয়াম। চালু হবে মেট্রো পরিষেবা। উৎসাহে টগবগ করে ফুটছেন নিউটাউন কলকাতা ডেভেলপমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান দেবাশিস সেন। দুঁদে আইএএস অফিসার বাংলা সরকারের নগরোন্নয়ন দফতরের অ্যাডিশনাল চিফ সেক্রেটারি। মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের বিশ্বস্ত সেনাপতি, হিডকোর চেয়ারম্যান দেবাশিসবাবু। সরকারি কাজের ঘরানার চেনা চেহারার বাইরে বেরিয়ে একজন স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতার মতই রাতদিন সাতদিন লেগে রয়েছেন শহরটিকে সাজিয়ে তুলতে। সারাক্ষণই ভাবছেন কিভাবে আরও আধুনিক করে তোলা যায়, কিভাবে ব্যবহারকারীকে দেওয়া যায় আরও বেশি সুবিধে। নিউটাউনকে নিয়ে তাঁর স্বপ্নের অন্ত নেই। শুধু বেসিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করা নয়। তিনি চাইছেন ভবিষ্যতের মানুষের সুবিধার্থে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ করতে। টেলি মেডিসিন সার্ভিসকে আরও সুলভ এবং আরও কার্যকরী করতে উদ্যোগ নিচ্ছেন। সিসকোর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে এই সার্ভিসকে ত্রুটিহীন করতে চাইছেন। পাশাপাশি নিউটাউনের বয়স্ক নাগরিকদের সুরক্ষার জন্যে সাপোর্ট এল্ডারসের মত স্টার্টআপ সংস্থার সঙ্গে কথা বলছেন। নিউটাউনে তৈরি করাচ্ছেন স্পোর্টস কমপ্লেক্স। সাইকেল চলার জন্যে আলাদা করে ট্র্যাক তৈরি করাচ্ছেন। থাকবে বাই সাইকেল পার্কিংয়ের জন্যে স্টেশন। দেখভাল যারা করবেন তাঁদের জন্যে বিজনেস পয়েন্ট। সেটা চলবে ব্যবসায়িক মডেলেই। তাছাড়া থাকবে জিও লোকেশন অ্যালার্ট পয়েন্ট, পথে ঘাটে গোলমাল হলেই লাইট পোস্টে লাগানো অ্যালার্ট বাটন পুস করলেই খবর যাবে কন্ট্রোল-রুমে, খবর পাবেন স্থানীয় থানা, লুকোনো সিসিটিভিতে নজরদারি হবে। মাথায় আইডিয়া গিজ গিজ করছে। তাও চাইছেন নতুন নতুন আইডিয়া।

অ্যাকশন এরিয়া ওয়ানে হচ্ছে স্টার্টআপ সংস্থাকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর কর্মযজ্ঞ। থাকবে ইনকিউবেশন সেন্টার, অফিস স্পেস, স্টার্টআপ মিট করানোর জন্যে অডিটোরিয়াম। সবই পাওয়া যাবে ন্যায্য মূল্যে। 

বলছিলেন তিনি চান নিউটাউনের মানুষ, এখানে কাজের সূত্রে বাইরে থেকে আসা লক্ষ লক্ষ জনতা যেন এই শহরটাকে ভালবাসতে পারে। আর তাঁর এই স্বপ্ন পূরণ করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন এই আমলা। বলছেন এটা করতে তাঁর ভালো লাগছে। আর ক্রেডিট দিচ্ছেন তাঁর টিমকে। তাঁর টেকনিকাল টিম, ইঞ্জিনিয়ারদের টিম নিয়ে বলতে গিয়ে একের পর এক ভালো ভালো বিশেষণ ব্যবহার করছিলেন দেবাশিস বাবু। বোঝা গেল প্রশংসা করার অভ্যাস আছে ওর। কিন্তু আত্মতুষ্টির অভ্যাস নেই। যদিও মানেন লিডারশিপটা জরুরি, কিন্তু কখনও নিজেকে নম্বর দিতে চান না। সব কৃতিত্বের পিছনে নিজেকে এড়িয়ে তাঁর টিমকে খুঁজে পান। এখানেই স্মার্ট টিম লিডার হিসেবে এগিয়ে থাকছেন দেবাশিস সেন।

যদিও সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্মার্ট সিটির পরিবর্তে গ্রিনসিটি তৈরির কথা বলছেন। গোটা রাজ্যে হাতে গোণা চারটি শহর নয়, একে একে তৈরি হবে ১৬০ টি আধুনিক শহর। উত্তরে জয়গাঁও থেকে শুরু করে গোটা রাজ্য জুড়ে মাথা তুলবে একের পর এক স্মার্ট আইডিয়ার গ্রিন সিটি। তালিকায় আছে বোলপুর, আসানসোল, দুর্গাপুর, দক্ষিণে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত। সবগুলি শহরই হবে পরিবেশ-বন্ধু, সবুজের আঁচলে ঢাকা। যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে স্বাস্থ্য পরিষেবা, জীবন যাত্রার মান, ব্যবসা বাণিজ্যের পরিকাঠামো সবই থাকবে স্মার্টলি, কিন্তু কেন্দ্রীয় স্মার্টসিটি প্রকল্পের বেঁধে দেওয়া গতে নয়। এতে ৫০০ কোটির বাধ্যবাধকতা থাকবে না। জলকর চাপানোর দায় থাকবে না। কিন্তু দূষণ হীন পরিষেবা থাকবে। বাংলার নিজস্বতাই এই প্রকল্পের ভিতর ফুটে উঠবে। একে নিন্দুকেরা স্মার্ট বলবে নাকি অন্যকিছু, তাতে বাংলার মাথা ব্যথা নেই। কারণ সেগুলোর রোল মডেল হবে গ্রিন আর স্মার্ট নিউটাউন।