আপনার টাকা ম্যানেজ করবে রোবট!

ভবিষ্যতে আপনি বিমিয়োগের জন্যে ভরসা করবেন রোবটের ওপর! এই অভিনব পদ্ধতি ব্যাপকভাবে চালু হতে চলেছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রোবো প্রযুক্তি ব্যবহার করার মাধ্যমে গোটা ব্যবস্থাটাই ঢেলে সাজানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

2

ভবিষ্যতে আপনি বিনিয়োগের জন্যে ভরসা করবেন রোবটের ওপর!বিষয়টি নিয়ে ইতি‌মধ্যে ইয়োর স্টোরি একটি গবেষণা চালিয়েছে। ওই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ভারতের ৫০টি স্টার্ট আপ সংস্থা রোবো প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গবেষণার ফলে এও দেখা যাচ্ছে, এদের ভিতর প্রথম সারিতে থাকা ১১টি সংস্থা সারা দুনিয়া জুড়ে ব্যাপক হারে বাণিজ্যিকভাবে বাড়ছে। বাজারে এদের বাড়বৃদ্ধি ঘটছে বিরাটভাবে। ২০১৪ সালের আর্থিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী এটা প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার। যা অ্যাসেট আন্ডার ম্যানেজমেন্টের আওতায় পড়ছে।

একজন গ্রাহককে তাঁর আর্থিক বিষয়ে পরামর্শদাতার কাজটি সুচারভাবে সম্পন্ন করতে পারবে রোবো-অ্যাডভাইসর। কিন্তু শেষপর্যন্ত ‌এই ব্যবস্থা কতদূর পর্যন্ত গ্রাহ্য হবে, এটিও একটি প্রশ্ন।

সাধারণভাবে একজন গ্রাহক যখন ব্যাঙ্ক বা ওই জাতীয় কোনও অর্থলগ্নি সংস্থায় খবরাখবরের বা বিনিয়োগ সংক্রান্ত পরামৰ্শের জন্যে যান – ধরা যাক ওই গ্রাহক মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের জন্যে গেলেন। সেইসময় ম্যানেজার ওই গ্রাহককে বাজারের পরিস্থিতি দেখিয়ে বিনিয়োগ সংক্রান্ত ইতিবাচক পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

ম্যানেজারের এই কাজটিই করবে রোবো পরামর্শদাতা। রোবো ম্যানেজারই আর্থিক বিনিয়োগ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য জোগাবে গ্রাহককে।

বর্তমানে্ একটি মাঝারি মাপের ব্যাঙ্কে অন্ততপক্ষে তিন থেকে চারজন ওয়েলথ ম্যানেজার থাকেন। ধরা যাক, আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের কথা। সারা দেশে এই ব্যাঙ্কটির ৪,৪৫০টি শাখা আছে। এখানে কি্ন্তু পৃথকভাবে ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট শা্খা যুক্ত করা হয়নি। পরিকাঠামোর এই জায়গাগুলিকে পরিবর্তিত করবে রোবো-অ্যাডভাইসরি। এভাবে ব্যাঙ্কগুলি এবং তার শাখাগুলি উপকৃত হবে।

কিন্তু এই সময়ে কেন এর প্রয়োজনীয়তা আছে?

প্রশ্নটির ভি্তরই রয়ে গিয়েছে উত্তর। আপনি কি মনে করেন ২০০৩ সাল ওলার পক্ষে সেরা সময় ছিল? মনে হয় না! ওলার আগেও ক্যাব সার্ভিস ছিল। কিন্ত ক্যাব পরিষেবার ক্ষেত্রে যেটা বিপ্লবাত্মক ঘটনা তা হল, ক্রমে ইকোসিস্টেমটাই পাল্টে যা্ওয়া। অবশ্য তা একাধিক ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভরশীল। যেমন, স্মার্ট ফোন বিপ্লব, গুগল ম্যাপ, পেমেন্ট মেকানিজমের মতো ফ্যাক্টরগুলি এক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ।

রোবো পরামর্শদাতা বা রোবো অ্যাডভাইসরির ক্ষেত্রেও বিষয়টি একরকম তাই-ই। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির বিকাশ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেমন, মেশিন লার্নিং, অটোমেশন, বিগ ডাটার মতো ফ্যাক্টরগুলিই রোবো অ্যাডভাইসরিকে একটি ধারা হিসাবে প্রতিষ্ঠার পথে আনুকূল্য দিয়েছে।

রোবো অ্যাডভাইসরির মাধ্যমে ইতিবাচক ইকোসিস্টেম সৃষ্টি করা গিয়েছে। যার সুফল লাভ করছেন গ্রাহকরা। এ বিষয়টি যে সমস্ত ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভরশীল সেগুলি এখানে তুলে ধরা হল –

অনলাইন পরিষেবা বাছাইয়ের কাজটি করতে গ্রাহককে সহায়তা করে তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায়। একজন ব্যক্তি বা ম্যানেজার দ্বারা পরিচালিত হওয়ার চেয়ে অনলাইন ব্যবস্থাটি অনেক বেশি নিরাপদ।

গ্রাহক আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য যে কোনও জায়গা থেকেই সংগ্রহ করতে্ পারবেন অনলাইন ব্যবস্থা চালু থাকার ফলে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগ এখন। যুগটি সম্ভাবনাময় তো বটেই।

ভারত কি তৈরি?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চার্লস সোয়াব কর্পোরেশন এবং ভ্যানগার্ড রোবো অ্যাডভাইসরি ব্যবস্থায় সাফল্য পেয়েছে। এছাড়াও পার্সোনাল ক্যাপিটাল, সিগ ফিগ, মোটিফ ইনভেস্টিং, ফাইনান্সিয়াল গার্ড, ট্রিজিক, ফোলিও ইনভেস্টিং ও ফিউচার অ্যাডভাইসর (এটি ব্ল্যাক রকের অধীনস্থ সংস্থা)এই ব্যবস্থা চালু করেছে।

কেএমপিজি-র রিপোর্ট অনুসারে, অর্থ বিনিয়োগকারী মার্কিন সংস্থা যেমন ওয়েলস ফার্গো, ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা, মাররিল লিনচ, ফাইডিলিটি ইনভেস্টমেন্ট স্বয়ংক্রিয় আর্থিক পরামর্শদাতা ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করেছে। ২০১৫ সালে ডিল বুক কনফারেন্সে মরগ্যান স্ট্যানলি সংস্থার সিইও জেমস গরম্যান বলেছেন, আমাদেরও এই ব্যবস্থাটি দরকার। ওটা কিনে নেওয়া যেতে পারে। অখবা, নিজেরাই তৈরি করে নিতে পারি।

ভারতে কিন্তু মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের হার অত্যন্ত কম। মাত্র ৭ শতাংশ। মোট বিনিয়োগের মাত্র তিন দশমিক চার শতাংশ বিনিয়োগ হয়ে থাকে মিউচুয়াল ফান্ডে। একজন ব্যক্তি গ্রাহকের মাধ্যমে বিনিয়োগের এই পরিমাপ (এইএন্আই ও খুচরো-সহ)।তাহলে কীভাবে ইকোসিস্টেমটি পাল্টাবে রোবো অ্যাডভাইসরি সিস্টেম?

ঈশান গুপ্তর কথাই ধরা যাক। উইক্সিফাই নামে একটি ডিজিট্যাল ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম চালান ঈশান। ৩২ বছরের এই উদ্যোগপতি বললেন, রোবো অ্যাডভাইসরি ব্যবহার করতে পারেন বড় বড় আর্থিক বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলিই। তাঁর আরও দাবি, তবে আগামী দিনে অন্যরকম সময় আসছে। ব্যাঙ্কগুলি এই ব্যবস্থাটি পরিষেবার জন্যে রপ্ত করবে। এ ব্যাপারে বলতে গিয়ে ঈশান জানালেন, বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করবেন যে সমস্ত গ্রাহক, তাঁদের ক্ষেত্রে সংযোগ রক্ষার জন্যে পুরনো ব্যবস্থা বজায় রাখবে ব্যাঙ্কগুলি। এরা সকলেই উচ্চ আয়ের গ্রাহক। বাকি সাধারণ গ্রাহকদের জন্যে চালু করা হবে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বা রোবো অ্যাডভাইসরি ব্যবস্থা।

অন্যদিকে একটি রোবো অ্যাডভাইসরি সংস্থার ডিরেক্টর তথা সহ-প্রতিষ্ঠাতা অমিত মেহেনডেল সংশ্লিষ্ট শিল্পের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চালু দুটি মডেল রয়েছে। প্রথমটি হল নিয়মিতভাবে করা পরিকল্পনা। দ্বিতীয়টি হল সরাসরিভাবে করা পরিকল্পনা। নিয়মিত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে পরামর্শদাতারা কমিশন পেয়ে থাকেন। প্রতিটি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই এই কমিশন পাওয়া যায়।

সরাসরি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী একটি ফি দিয়ে থাকেন পরামর্শদাতাকে। পরামর্শদাতা ছাড়াও এক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা যায়। অমিতের দেওয়া তথ্য অনুসারে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে বিনিয়োগ চলে। তবে আগামী দুবছরের ভিতর পরিস্থিতি পাল্টাতে চলেছে। সরাসরিভাবে করা বিনিয়োগ বাজার দখল করবে। তবে দুটি পরিকল্পনার ক্ষেত্রেই মার্কেট শেয়ারের অনুপাত সমান রয়েছে।১৯৯৫ সাল থেকে ধীরে ধীরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দালালি ব্যবস্থার শক্তিহ্রাস হচ্ছে।

ঈশান বলেছেন, সেবি ইতিমধ্যে অর্থলগ্নিকারী সংস্থাগুলির কাছে জানতে চেয়েছে মিউচুয়াল ফান্ড বাবদ তারা বাজার থেকে কত টাকা তুলেছে। এটা রোবো অ্যাডভাইসরির ক্ষেত্রে একটা ভাল খবর।

বিশ্বাসের জায়গা নিয়ে বলতে গিয়ে ঈশান বলেছেন, ইতিমধ্যে এই জায়গাটি ইতিবাচক। একারণেই মানুষ নতুন প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতে গ্রহণ করবেন। তবে গ্রাহকদের টেলিফোনে বা ব্যক্তিগতভা্বে বিষয়টি সম্পর্কে সড়গড় করাটা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

রোবো-অ্যাডভাইসরি পরিষেবা গ্রহণ

গত বছরের সেপ্টেম্বরে আইসিআইসিআই সিকিওরিটিস (আইসিআইসিআই ওয়েলথ ম্যানে্জমেন্ট সেল) ঘোষণা করেছে ট্র্যাক অ্যান্ড অ্যাক্ট। এটি একটি রোবো অ্যাডভাইসরি প্ল্যাটফর্ম। বিনিয়োগকারীদের জন্যে পরিকল্পনা তৈরি করার

বর্তমানে ব্যাঙ্ক দাবি করে থাকে এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম গ্রাহকদের বিনিয়োগ সংক্রান্ত উপদেশ দিয়ে সহায়তা করে থাকে। আরও বেশি গ্রাহককে এ ধরনের প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করাটাই ব্যাঙ্কগুলির তরফে নেওয়া উদ্যোগ। এ ব্যাপারে ইয়োর স্টোরির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আইসিআইসিআই সিকিওরিটিস লিমিটেডের ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইসরি সার্ভিসেসের প্রধান অভিষেক মাথুর বলেছেন, প্ৰযুক্তির উন্নতির জেরের সুফল ভোগ করুক আরও বেশি সংখ্যক সংস্থা। এভাবে গ্রাহকদের পরামৰ্শ দেওয়ার কাজটিও চালানো হোক। যাতে বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া যায়।

তিনি আরও বলেছেন, বিনিয়োগ পদ্ধতিটিকে সমস্ত ধরনের দুর্নীতি বা বাধামুক্ত করা সম্ভব রোবো অ্যাডভাইসরির মাধ্যমে। পদ্ধতিটি এর মা্ধ্যমে যুক্তিসিদ্ধ হয়ে উঠবে। রোবো অ্যাডভাইসরি গ্রাহকদের সম্পর্কে অধিক পরিমাণ তথ্য সংগৃহীত করার কাজ করবে। এর মাধ্যমে গ্রাহকদের সম্পর্কে পরিষ্কার ছবি হাতে আসবে। ফলে রিলেশনশিপ ম্যানেজারের কাজটি আরও সুবিধাজনক হবে।

ফিনটেক স্পেসে বিশিষ্টজন সঞ্জয় স্বামী জানালেন আগামী দু থেকে চার বছরের মধ্যে এই রোবো অ্যাডভাইসরি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কী ধরনের উন্নয়ন আশা করা যায় -

প্রথমত, গ্রাহক পরিষেবা, দ্বিতীয়ত অর্থলগ্নি সংক্রান্ত পরিষেবা ও মিউচুয়াল ফান্ড ও স্টক মার্কেট সংক্রান্ত তথ্য ও পরিষেবা এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও উন্নত হবে।

এ ব্যাপারে সঞ্জয় স্বামী বলেছেন, অর্থলগ্নি সম্পর্কে পরিষেবা ভারতে তুলনায় গোড়ার দিকে রয়েছে। তবে গ্রাহকদের রোবো অ্যাডভাইসরি প্রযুক্তি সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলাটা দরকার। তাহলেই এই ব্যবস্থা কার্যকরী বা গ্রহণযোগ্য হবে। ক্রমশ মানুষের বিশ্বাস অর্জিত হবে।

তিনি আরও বলেন, এ ব্যাপারে মানুষের পূর্ব অভিজ্ঞতার নমুনা হল এটিএম। ব্যাঙ্কে গিয়ে টাকা তোলার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। একইভাবে রোবো অ্যাডভাইসরি ব্যবস্থার মতো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এদেশের ফাইনান্সিয়াল ইকোসিস্টেমটাকে পাল্টে দেবে।