প্রতিযোগিতায় জিততে যোগাযোগই তুরুপের তাস

0

‘‘মাফ করবেন, আরেকবার পরিচয় জানতে পারি?’ মার্কিন মুলুকে একটা স্টার্টআপের কর্নধার হিসেবে সম্ভবত এটাই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে কমন প্রশ্ন। আর সেটাই আমার জীবনে সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা’, টেকস্পার্কস ২০১৫ য় এই কথাগুলি বলছিলেন সেক্যুয়া কেপিট্যালের এমডি শৈলেন্দ্র সিং। নিজের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করাই সম্ভবত একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কোনও এক স্টার্টআপের প্রতিষ্ঠাতা হলেই সারা বিশ্ব আপনাকে চিনে বসে থাকবে না। নিজেকেই নিজের পরিচিতির পরিধি বাড়াতে হবে। দুঃখের বিষয় হল পেশায় ইঞ্জিনিয়ার অনেক প্রতিষ্ঠাতা রয়েছেন যারা বিষয়টিকে গুরুত্বই দিতে চান না। শৈলেন্দ্র বলেন, ‘পারস্পরিক আদান প্রদান ঠিক রাখতে হলে যোগাযোগই একমাত্র চাবিকাঠি। অনেকেই ভাবেন, যোগাযোগ তৈরির কাজটা মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের। কেউ আবার এককাঠি এগিয়ে ভাবেন, নিজের প্রডাক্ট ওয়াটসআ্যাপের মতই জনপ্রিয় কিছু, তার আবার আলাদা করে প্রচার কী দরকার? ভাগ্য আপনার সহায় হোক, যা ভাবছেন সেটা প্রায় অসম্ভবের মতো’, বলেন শৈলেন্দ্র। সঙ্গে যোগ করেন, যদি সংস্থার কর্নধার নিজেই যোগাযোগ বাড়ান পরবর্তী ক্ষেত্রে তাঁরই সুবিধা হবে।

শৈলেন্দ্রর ব্যাখ্যায় কোনও স্টার্টআপের প্রতিষ্ঠার কয়েকটি মূল বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত। কী সেগুলি?

১. মিশন এবং ভিশন স্টেটমেন্ট- ব্যবসার জন্য এটা সবচেয়ে জরুরি। জরুরি কারণ, যখনই কোনও কিছু নিয়ে ধন্দ তৈরি হবে, মিশন-ভিশনই পথ দেখাবে। শৈলেন্দ্র যোগ করেন, ‘অন্যভাবে বলা যায় এটা এক ধরণের গাইডলাইন’।

২. ই-মেলারদের জন্য কিছু কথা- ‘সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে আপনি নিজে যদি ধারাবাহিক না হোন, তাহলে টিমের অন্যরাও সেই পথই ধরবেন’, সতর্ক করেন শৈলেন্দ্র।

৩. সবসময় বিক্রি করতে হবে- ‘একজন উদ্যোক্তাকে নিজের পরিচিতি তৈরি করতে হলে নিজেকে বিক্রি করতে জানতে হবে। বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজেকে বিক্রি করতে হবে যাতে তারা ভরসা করে বিনিয়োগ করেন। কর্মীদের কাছে বিক্রি করবেন যাতে আপনার সংস্থার অংশ হয়ে যান তাঁরা। খদ্দেরের কাছে বিক্রি করবেন ব্যবসা করার জন্য। সবসময় আপনি বেচুবাবু। যদি এই কাজ আপনার ভালো না লাগে তাহলে নিজেই পার্টনার খুঁজুন, যিনি বিক্রি করতে জানেন আথবা শিখে নেবেন’,শৈলেন্দ্রর পরামর্শ।

৪. পাওয়ার পয়েন্ট তৈরি- অনেক উদ্যোক্তা সময় নষ্ট ভাবলেও শৈলেন্দ্র বিশ্বাস করেন, কীভাবে প্রেজেনটেশন বানাতে হয় জানা জরুরি। তাঁর সংযোজন, পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেনটেশন তৈরিতে একটু সময় দিলে নিজের ভাবনার একটা কাঠামো তৈরি করা যাবে। এর ফলে সংস্থার কর্নধার নিজের ভাবনা সম্পর্কে আরও নিখুঁত হতে পারবেন।

৫. প্রতিযোগিতাকে জানুন- নিজের অবস্থান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে, বলেন শৈলেন্দ্র। প্রতিযোগিতার একটা মানচিত্র আপনার সংস্থার কাঠামো গড়ে দেবে। মানুষকে অপশন বাছতে সাহায্য করবে। উদ্যোক্তা বুঝতে পারেন ভ্যালু চেনের কোথায় তাঁর ব্যবসা রাখতে হবে। ভ্যলু চেনে থেকে বুঝে নিতে পারবেন আর কারা কারা প্রতিযোগিতায় রয়েছে।

শৈলেন্দ্রর দৃষ্টিতে সঠিক কোর মেসেজিং খুঁজে পেতে যা যা প্রয়োজন-

১. ট্রেন্ড অনুসরণ করা- হাইপারলোকাল আর ক্লাউড এখন ট্রেন্ড। এইসব ক্ষেত্রে যদি আপনি কিছু করেন, এরাও সহযোগী হতে সাহায্য করে। শৈলেন্দ্রর পরামর্শ, কোনও রকম ইতস্ততা ছাড়াই প্রচলিত ধারার সঙ্গে একাত্ম হওয়া উচিত।

৩. স্পষ্ট এবং সহজ সরল হোন- শৈলেন্দ্র মতে, এর সবচেয়ে সহজ উদাহরণ হল ড্রপবক্স। যে কোনও জায়গায় ফাইল রাখুন। পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে চলুন।

৪. গোপনীয়তার সীমা- শৈলেন্দ্রর উপলব্দি, কখনও কখনও মানুষ এত সোজাসাপটা কথা বলে, বোঝার চেষ্টাই করে না যে তারও একটা সীমাবদ্ধ গোপনীয়তা থাকা উচিত। আবার গোপনীয়তা বা বিমূর্ততার মাত্রা বেশি হলে সাধারণের বোঝার ক্ষমতা থাকবে না।

৫. গ্রাহক কেন্দ্রিক মেসেজ

৬. স্মরণীয় করে তুলতে হবে

৭. দশবারের বেশি পুরনরাবৃত্তি হোক

৮. স্বাতন্ত্র- ‘স্বতন্ত্রতা নির্ভরযোগ্য হতে হবে এবং এমন হতে হবে যাতে অন্যদের থেকে বিরাট ফারাক গড়ে দেয়’, বলেন শৈলেন্দ্র।

৯. স্বচ্ছতা- পারস্পরিক যোগাযোগে স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি।

১০. নিজের পরিভাষা- নিজের পরিভাষায় যদি ট্র্যাটেজি তৈরি করা যায় তাহলে দারুণ ব্যাপার হতে পারে। ‘ঠিক কী চাইছেন আপনার ভাষাতেই স্পষ্ট হবে’, বলেন শৈলন্দ্র।

সবসময় মেসেজ পাঠিয়ে মূল স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সংস্থার মালিককে যোগাযোগ রেখে চলতে হবে। প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রে থেকে কর্মী, বোর্ড, পরামর্শদাতা, গ্রাহক, প্রেস, বিনিয়োগকারী-এই সবকিছুর দ্বারা অবর্তিত হবেন। ‘এরমধ্যে বেশিরভাগই একে অন্যকে শোষণ করে। কিছু কিছু সংস্থা ধারাবাহিকভাবে ভালো করে কারণ, তারা এই স্টেকহেল্ডারদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে’, বলেন শৈলেন্দ্র। তাঁর মতে, প্রত্যেক স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ রাখা উচিত।

শৈলেন্দ্র বলেন, একটা প্ল্যাটফর্ম যে থাকা উচিত, অনেক সংস্থা সেটা মানতেই চায় না। ‘এটা বোঝা নয়, বরং সুযোগ। আপনি কে? কী করছেন? মানুষকে বুঝতে সাহায্য করে’, তিনি বলেন। একই সঙ্গে স্বচ্ছ প্রেজেনটেশন থাকা জরুরি। সেই প্রেজেনটেশনই সরাসরি উদ্যোক্তা এবং তাঁরা সংস্থার প্রতিচ্ছবি।

স্বচ্ছতা থাকতে হবে। এটা সংস্থার প্রতি বিশ্বাস এবং বোঝাপড়া বাড়াবে। সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গি যদি অন্যের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে বিনয়োগকারীরা উৎসাহিত হবেন না। তথ্য সঠিক রাখাও সমান জরুরি। আপনি যদি বাড়িয়ে বলেন, তাহলে সংস্থা এবং তার প্রতিষ্ঠাতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

বড় কোনও ঘোষণা থাকলে তবেই কোনও সংস্থা সাংবাদিক বৈঠক ডাকে। কিন্তু আপনার সংস্থা কী করছে সেটা প্রায়শই সাংবাদিকদের জানানো উচিত। তার জন্য সময় দেওয়া উচিত।

আপনার ভাষা সবাইকে চেনান। কারণ মানুষ যখন আপনার সংস্থা নিয়ে কথা বলবেন, তখন তাঁরা নিজের ভাষায় বলবেন। বিভিন্ন ব্লক, টুইটার,সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবাহার করে আপনিও নিজের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করুন।

গ্রাহকরা শুধু নিজের ভালো বোঝেন। কোনও সংস্থার পুঁজি, সংস্কৃতি নিয়ে গ্রাহক মাথা ঘামাবেন না। তারা শুধু কী পাচ্ছেন সেটাই ভাবেন, বলেন শৈলেন্দ্র। ফলে গ্রাহকদের যখন কিছু বলবেন মনে রাখবেন, তাতে ধারাবাহিকতা থাকতে হবে, আপনার দায়বদ্ধতা ফুটে উঠতে হবে। টিমের প্রত্যেক সদস্যকে এটা মনে রাখতে হবে।

শৈলেন্দ্রর উপলব্দি, সংস্থার কর্মীরা দেখেন বাজারে কী প্রভাব পড়ছে, কী সুযোগ তারা পাচ্ছেন এবং বৃদ্ধি। আপনার সংস্কৃতি তাদের পরিষ্কার করে বুঝে নিতে হবে। ‘কিছু বাড়িয়ে দেখালে, সেটা কর্মীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, সংস্থা সম্পর্কে অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি করে দেয়’, শৈলেন্দ্রর সংযোজন। মিটিংয়ে, মেলে কর্মীদের কাজের প্রশংসা করুন। কাজের স্বীকৃতি পেলে কর্মীরা উৎসাহিত হন। কর্মীদের সংস্থা সম্পর্কে আপডেট রাখুন।

সিনিয়র মেনেজমেন্টের মাধ্যমে সংস্থার কাজের মধ্যে ছন্দ তৈরি করতে হবে। যোগাযোগের স্বচ্ছতা থাকতে হবে। লক্ষ্যের দিকে সবাইকে এক সারিতে থেকে এগনো চাই। স্বচ্ছ, নিরবিচ্ছিন্ন, বিশ্বাসযোগ্য এবং খোলা মনে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। সেটাই উন্নতির চাবিকাঠি।

Related Stories