সত্ত্বা লুকোবেন না কারণ, সমকামীরা ভারতে স্বীকৃত তৃতীয় লিঙ্গ

0

অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে ‘গে’ শব্দের অর্থ হালকা মন, বেপরোয়া স্বভাব। দুর্ভাগ্যবশত, ২০০৯ সালে দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশ যখন বাতিল করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট, আরও একবার ভারতে সমকামীতা অপরাধ বলে মান্যতা পায়। কিন্তু ভাগ্য সাহসীদের সঙ্গেই থাকে। ভারতে এখন সমকামীতা স্বীকৃত তৃতীয়লিঙ্গ হিসেবে। আমরা ইওরস্টোরিতে সবসময় ভালোর শক্তিতে বিশ্বাস করি। সম্প্রতি আমরা কথা বলেছিলাম চার সফল ব্যক্তিত্বের সঙ্গে, যারা রূপান্তরকামীদের বিপ্লবেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রূপান্তরকামীদের মধ্যে তাঁরা নিজেরাই অনুপ্রেরণা।

নীতীন বান্তোয়াল রাও। আর দশটা শিশুর মতো বেড়ে উঠেছেন বেঙ্গালুরু এবং পুনেতে। অংক ছিল নেশার মতো। সবসময় নতুন কিছু শিখতে চাইতেন। এনআইটি সুরথকল থেক আইটি পাশ করার পর নীতীনের হিউমেন রাইটসে আগ্রহ বাড়ে। এমআইটি স্লোন থেকে এমবিএ করেন। এখন সিলিকন ভ্যালির একটি টেক স্টার্টআপ নীতীনের কর্মক্ষেত্র। এই পর্যন্ত নীতীন চূড়ান্ত সফল এক চরিত্র। হার মানে একটা জায়গাতেই, যখন সবাইকে বোঝাতে যান তিনি সমকামী। ‘আমার আকর্ষণ পুরুষে। কিন্তু আমাদের বিষমকামী অভিধান এবং যে সংষ্কৃতিতে বেড়ে ওঠা সেখানে আমার সত্ত্বাকে ব্যাখ্যা করা বন্ধুবান্ধব তো বটেই বাবা-মাকেও বোঝানো কঠিন। শেষ পর্যন্ত বাবা-মাকে যখন বলতে যাই, উলটে তাঁরাই আমাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় সমস্যা বলে বোঝাতে থাকেন। আমি অবাক হয়ে যাই’। বলেন হতাশ নীতীন। তাঁর মতে, এখনও অনেক রূপান্তরকামী রয়েছেন যারা নিজেদের সত্ত্বা নিয়ে সরব নন। ফলে এখনও পর্যন্ত রূপান্তরকামীদের রোল মডেল বলে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। দুর্ভাগ্যবশত, তাঁর নিজেরই অনেক সহকর্মী রয়েছেন যারা সমকামী ছাত্রছাত্রীদের রীতিমতো বিষোদগার করেন। তার মধ্যেও মনিপাল বা হায়দরাবাদ ল স্কুলের সহকর্মীরা অনেক বেশী সহনশীল, রূপান্তরকামী ছাত্রছাত্রীরা এখানে ব্রাত্য নন। নীতীন বিশ্বাস করেন, নিজের আসল সত্ত্বাকে সাধারণের সামনে প্রকাশ করা সাহসের ব্যাপার, কিন্তু সেটা আদৌ করবেন কি না, ঠিক করতে হবে নিজেকেই। তাঁর উপলব্ধি, আজকালকার প্রজন্ম আগের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী। ‘যারা নিজেদের প্রকাশ্যে মেলে ধরতে চান, সমাজ হিসেবে তাঁদের পাশে আমাদের দাঁড়ানো উচিত। আপনার সামনে সমকামীদের নিয়ে কেউ খারাপ কিছু বললে, আপনারই দায়িত্ব তাকে ডেকে শিক্ষা দেওয়া’, বলেন নীতীন। ২০১০ সালে নীতীন ইকোয়াল ইন্ডিয়া এলায়েন্স নামে একটি এনজিওতে অর্থ সাহায্য দেন। সংস্থাটির নেতৃত্বে রয়েছেন তূষার মালিক। তুষার ‘I, Ally’ ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে রূপান্তকামীদের অধিকারের দাবিতে ভারতীয়দের সরব হওয়ার ৩০০ ভিডিও প্রকাশ করেছেন।

বিদ্যা পাই। যার পরিচয়, একজন উদ্যোক্তা, ব্যাঙ্কার এবং রূপান্তরকামী সমাজকর্মী। অনেকের মতো আরও কম বয়সে সমকামীতা উপলব্ধি করতে পারেননি বিদ্যা। ২০ বছর বয়সে এসে বুঝেছিলেন তিনি সমকামী। বিদ্যা বলেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয়, মানুষ যৌনতাকে আচরণ বলে মনে করে, অথচ সেটাই আমাদের পরিচয়, আর কিছু নয়’। সারা জীবন বিদ্যা সমাজের নানা কাজে নিজেকে জড়িয়েছেন। সমকামীদের অধিকারের দাবি, নারীর অধিকার, পশুদের ভালো রাখা-এমন নানা দাবিতে সরব হয়েছেন। সমাজকর্মী হিসেবে সমকামীদের অধিকারের পক্ষে সরব হওয়ার পর প্রথম সারির খবরের কাগজে তাঁর ছবি আসে। তখনই পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবদের সন্দেহ হয় বিদ্যাও সমকামী কি না। যদিও বিদ্যা নিজেও তখন জানতেন না নিজের মধ্যে ওই সত্ত্বার বিকাশ সম্পর্কে। পরে যখন বুঝতে পারলেন তখন আত্মীয়, বন্ধুরা ওই নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই যায়নি। কেন মানুষ নিজেকে লুকোয় তার কারণ হিসেবে সিটি ব্যাংকের প্রাক্তন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার বিদ্যা বলেন, ‘যদি সমাজই অন্য চোখে দেখে, তাহলে কেন কেউ নিজের সত্ত্বার কথা বলতে যাবেন? প্রকাশ্যে আসতে অনেকে ভয় পান, তাই আশেপাশে আরও রূপান্তরকামী আছে কি না সেটাও বোঝা যায় না। মিডিয়া এবং সমাজে তাদের নিয়ে চর্চা আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে, সরব হতে সাহায্য করে’। বিদ্যার সংযোজন, ‘এর সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস জুড়ে গিয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। এই বিষয়ে গোটা সমাজকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করতে হবে’। প্রথমে কমিউনিটিতে নিজেদের গ্রহণ করার আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কে সেটাই বড় কথা। আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হতে পারতাম, কিন্তু ইভভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার হলাম। এখন হসপিটালিটি সেক্টরে। নিজের বিশ্বাসে ভর করে আমি এইসব করি। নিজের কাছে ঠিক থাকতে হবে। আমি কী হব বা কী করব, কাউকে বলার সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না’।

ভরত জয়রামন। এইচআর (হিউমেন রিসোর্স) থেকে বনে গেলেন সমাজকর্মী। কমেল ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর হয়ে অ্যামাজোনে লার্নিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট হন। গুগুল, উইপ্রোর মতো সংস্থাতেও কাজ করেছেন। নিজের সমকামীতা নিয়ে বলতে গিয়ে ভরতের প্রতিক্রিয়া, ‘দীর্ঘদিন দূরে রাখার পর যখন ইন্টারনেট রিসোর্স ঘাঁটার অনুমতি পেলাম, তখন নিজের সত্ত্বাকে বুঝতে পারলাম।মানতেই হবে আমি অন্যদের থেকে অনেক ভাগ্যবান। আমার পরিবার, বন্ধুবান্ধবরা বিষয়টি যখন জানতে পারল, আমার কোনও অসুবিধাই হয়নি’। ভরত জানেন, ‘সমকামীতা পরিচয় নিয়ে সরব হওয়া সবার পক্ষে সহজ নয়। সমকামীরা ভয় পান, তাঁরা শারীরিকভাবেও নিগৃহীত হতে পারেন। আমি বলতে পারি, সমাজের গর্জন কামড়ের থেকেও খারাপ। এই ভয়ই খোলসে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য করে সমকামীদের’। ভরতের মনে হয়, সরকারি অথবা কর্পোরেট, কোনও ক্ষেত্রেই শীর্ষস্তরে সমকামী থাকলেও নিজের সত্ত্বা লুকিয়ে রাখেন অনেকে। সবাইকে নিজের সত্ত্বাকে প্রকাশ্যে আনতে হবে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ফ্যাশন দুনিয়ায় এইসব নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য হয় না। তাই কারও স্বপ্নও চাপা থাকে না।

শঙ্কর গণেশ, ইন্টানেট ব্যবহার করেন রূপান্তরকামীদের সাহায্য করতে। তামিলনাডুর ছোট্ট অংশ ট্যুটিকোরিনের বাসিন্দা শঙ্কর। স্কুল বয়স থেকেই মেধাবী এবং প্রযুক্তির দিকে ঝোঁক ছিল। কম বয়সেই বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি সমকামী। এই বিষয়ে আরও তথ্য জোগাড়ের চেষ্টা করছিলেন। সেই সময় সমকামীরা একে অন্যকে চুম্বনের দৃশ্য হামেশাই দেখা যেত ইন্টারনেটে। অরকুটের মতো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের মাধ্যমে আরও অনেক সমকামীর সঙ্গে যোগাযোগ হয় শঙ্করের। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে দেখাও করার চেষ্টা করেন। কিন্তু চেন্নাইতে যাদের সঙ্গেই দেখা করেছেন প্রত্যেকেই নিজেদের উভলিঙ্গ বলে দাবি করছেন। ফলে সমকামী পার্টনার খুঁজে না পেয়ে হতাশ হন শঙ্কর। নিজেকে সবসময় প্রশ্ন করতেন,সমাজ কী তাঁকে মেনে নেবে? বাবা-মা কী ভাববেন? বাবার সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলায় শঙ্করকে বলা হয়েছিল চিকিৎসা করলে সেরে যাবেন। শঙ্কর বাবাকে পালটা প্রশ্ন বলেছিলেন, ‘তার মানে চিকিৎসা করে তোমাকেও সমকামী করে দেওয়া যায়’। শঙ্কর বাবাকে বোঝাতে পেরেছিলেন সমকামীতা কোনও রোগ নয় যে চিকিৎসা করলে সেরে যাবে। কিন্তু গ্রামের দিকে পরিস্থিতি ভয়াবহ। ‘এমনকী কোনও তামিল খবরের কাগজও সমকামীতা নিয়ে বিতর্ক এবং ৩৭৭ ধারা নিয়ে আলোকপাত পর্যন্ত করে না’, বলেন শঙ্কর। তাঁর অনুযোগ, সমকামীদের আবেগ নিয়ে কেউ ভাবে না। এটা যৌনতা বা শারীরিক আকর্ষণের ব্যাপার নয়। তাঁর বিশ্বাস, সমাজ এবং চিকিৎসকদের সমকামীতাকে সমর্থন করা উচিত। একসময় হতাশা ঘিরে ধরেছিল শঙ্করকে,যার প্রভাব পড়ছিল কাজে। অবশ্য এখন যেখানে কাজ করেন, ফ্রেশডেক্সে তাঁর অভিজ্ঞতা বেশ ভালো, সহকর্মীরাও সবাই সাপোর্টিভ। ‘সব লিঙ্গকেই সমানভাবে দেখা উচিত। রূপান্তরকামীদের মধ্যে যারা মধাবী তাদের যদি যোগ্যসম্মান না দিই তাহলে দেশ ছেড়ে চলে যাবে সেই মেধা। রূপান্তরকামীদের প্রতি আমার আবেদন ইন্টারনেটে ঢুকে পড়াশোনা করুন। প্রয়োজনে কাউন্সিলরের সাহায্য নিন। তার ফলে পরস্থিতি শুধু শুধরেই যাবে না, নিজেদের শক্তিশালী প্রতিপন্ন করতে পারবেন’, যেতে যেতে বলেন শঙ্কর। আপনিও চাইলে রূপান্তরকামীদের প্রতি আপনার সমর্থন জানাতে পারেন itgetsbetter.org এ।

চারজনের সঙ্গে কথা বলার সময় যেটা স্পষ্ট বোঝা গেল তা হল, কাজের জায়গাতেও নিজের সত্ত্বাকে প্রকাশ করতে অস্বস্তিতে ভোগেন না তাঁরা। বলার চাইতে করে দেখানো বেশ কঠিন। আমরা গর্বের সঙ্গে অর্ধ নারীশ্বরের (শিব-পার্বতীর যুগল রূপ)পুজো করি। আবার একই সঙ্গে তৃতীয় লিঙ্গের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলি। বিশ্বাস আছে, একদিন সেই পৃথিবী দেখতে পাব যেখানে রূপান্তকামীদের আর পরিস্থিতির শিকার হতে হবে না। নিজের সত্ত্বার পরিচয় দিতে বাধো বাধো ঠেকবে না।