বাজে কাগজে চান্দ্রেয়ীর Kreativ করে দারুণ কাজ 

4

কাগুজে বাঘদের আপনি নিশ্চয়ই চেনেন। কেননা এতদিন ধরে ওদের নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এবার পুজোয় আলাপ করুন কাগুজে বাঘিনীদের সঙ্গে। বাঘিনীদের এই গ্যাঙের প্রধান নেত্রী প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের ছাত্রী চান্দ্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়। পুজোর অনুষঙ্গ টানার একটা নির্দিষ্ট কারণ আছে বৈকি! আসব সেই প্রসঙ্গে। তার আগে চলুন চিনি চান্দ্রেয়ীকে। কেনই বা ইনি কাগুজে সেটাও জানা জরুরি।

সৃজনশীল এই মেয়েটির গোটা পরিবারের সঙ্গে বাংলার সাহিত্য এবং সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের পাউরুটি-ঝোলাগুড় সম্পর্ক। সে পরিচয়ে যদিও চান্দ্রেয়ীর পরিচিতি নয়। তিনি পরিচিত তাঁর নিজের গুণেই। ছোটবেলা থেকে নাচের শখ। যে সে নাচ নয় রীতিমত জিমনাস্টিক ব্যালে নাচ। নিউ ইয়র্কের ব্রডওয়ে ডান্স আকাদেমি থেকে ইন্টার্নশিপ করার ডাক পেয়েছেন। পাশাপাশি দারুণ লেখেন। তুখোড় বক্তা। বই পড়তে ভালোবাসেন। আর ভালোবাসেন ফেলে দেওয়া কাগজ দিয়ে কিছু না কিছু বানাতে। ছোটবেলা থেকেই...।

আবর্জনার কাগজ, টিসু পেপার, কুঁচকনো হ্যান্ডমেড পেপার, সাদা কাগজ, কালো কাগজ, কখনও নিউজপ্রিন্ট, রঙ বেরঙের আঁকা, ছাপানো, সাপ্তাহিকের ছেঁড়া মলাট দিয়ে কখনও কোলাজ বানিয়েছেন, কখনও পুতুল। এসব করতে করতেই যত বড় হয়েছেন তত মাথায় চেপেছে কাগজ দিয়ে জামা-কাপড়-গয়না বানানোর খেয়াল।

নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই। এই নিয়ে পড়াশুনোও করেছেন বিস্তর। বলছিলেন শুনে তাজ্জব লাগতেই পারে তবে এ জিনিস নতুন নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন কাপড়ের অভাব ছিল তখন বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশে লজ্জা নিবারণে কাগজই ভরসা ছিল। শুধু তাই নয় অষ্টাদশ শতাব্দীর ইতিহাসে কাগজের পোশাকের উল্লেখ আছে। যখন কাপড়ের দাম বেশি ছিল আর স্টাইলিশ সম্ভ্রান্ত মহিলারাও আলগা কলার কিংবা হাতের কাফসের জন্যে কাপড়ের পরিবর্তে ভাঁজ করা কাগজের ব্যবহার করতেন। তখনকার ফ্যাশন অনুযায়ী কলার আর কাফসের ভাঁজ গুলো বজায় রাখার ওপর পোশাকের সৌন্দর্য নির্ভর করত। তাই সেই অংশগুলো কাগজের হলে বদলে বদলে নিতে পারতেন। আর যতবার বদলাতেন ততবারই নিত্য নতুন হয়ে উঠত পুরনো ড্রেসটা। এই স্টাইলটাই ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে আবারও উঁকি মারল। কলিন হিলের লেখায় এই অনুষঙ্গ আছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপে যখন কাপড়ের দাম আকাশ ছোঁয়া ছিল তখন শক্ত কাগজের তৈরি পোশাকই পরতেন বহু মানুষ। মহিলাদের গাউন, ফ্রক পুরুষদের পোশাক সবই হত। কিন্তু তখন প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না ফলে ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকতই। বিভিন্ন কল কারখানায় শ্রমিকদের অ্যাপ্রন হিসেবেও এই ধরণের পোশাকের ব্যবহার ছিল। তারপর সময়ের হাত ধরে কাগজের পোশাক মার্কিন ফ্যাশন ফিয়েস্তায় জায়গা করে নেয়। ১৯৬০ এর দশকে আমেরিকা এর প্রেমে পড়ে। ১৯৬৭ সালের লাইফ ম্যাগাজিনের "Wastebasket Dresses" টাইটলটা একটা সময় মার্কিন সংস্কৃতির লব্জ হয়ে যায়। নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি ইংরেজি লিমেরিকে কাগজের স্কার্টের উল্লেখ পাই। সেখানে কাগজের ড্রেসটি নিয়ে একটু ঠাট্টাও আছে।

A daring young girl from St. Paul
Wore a newspaper dress to a ball;
The dress it caught fire,
And singed her entire
Front page, sporting section, and all.

১৯৬৮ নাগাদ এই ট্রেন্ড মার্কিন সংস্কৃতি থেকে উবে যায়।

কিন্তু মসলিনের দেশ, তাঁতের দেশ ভারত কোনও দিনই এর দেখা পায়নি। হীরে দাদার মড়মড়ে থানে যে কাগজের feel ছিল সেটা পরে গরদে কিংবা ওর্গেন্ডির কাপড়েও অন্যরকম ভাবে বাঙালি চেখে দেখেছে। কিন্তু এবার চান্দ্রেয়ীর সৌজন্যে সত্যিকারের কাগজে তৈরি পোশাক পরার সৌভাগ্য হবে বাঙালির। এই প্ৰথম কলকাতায় কাগজের পোশাক তৈরি হচ্ছে। তাও ফ্যাশন টেকনোলজির পড়ুয়াদের হাতে নয়, ভূগোলের ছাত্রীর হাতে। নৃত্যশিল্পীর হাতে। এমন একটা জিনিস তৈরি হচ্ছে যেটা গোটা দেশে অভিনব। আর কলকাতায় এই প্রথম। শুধু পোশাক নয় ওরা তৈরি করেন ফেলে দেওয়া কাগজ দিয়ে গয়না গাটিও। হ্যাঁ ওরা। কারণ চান্দ্রেয়ী একা নন। কলেজের জনা সাতেক বন্ধু জুটিয়ে শুরু করে দিয়েছেন তাঁর নিজস্ব সৃজনশীলতায় ভরপুর স্টার্টআপ kreativ। শুরুতেই দারুণ সাড়া ফেলে দিয়েছে এই স্টার্টআপ। ইতিমধ্যেই মেয়েদের পোশাকে দারুণ রেঞ্জ তৈরি করে ফেলেছে ক্রিয়েটিভ। শুধু ফ্যাশন প্যারেডে পরে ক্যাট ওয়াক দেওয়া নয়। এবার পুজোয় সেই সব পরে দেশপ্রিয় পার্ক, ম্যাডক্স স্কয়ার, বোসপুকুর, লেবুতলা, চেতলার মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরবেন কলকাতার ডানা কাটা পরীরা। ভাবুন পরনে কাগজের ফ্রক! কানে কাগজের দুল। গলায় গোল গোল পাকানো কাগজের ফুল দিয়ে নেকলেস। ভাবছেন তো, ঘাম প্যাঁচ প্যাঁচে গরম! ঝিরঝিরে বৃষ্টি! কী হাল হবে? বলে রাখি, পুরাদস্তুর ওয়াটার প্রুফ যদি নাও হয় তবুও চান্দ্রেয়ীদের প্রোডাক্ট রীতিমত ফুল-প্রুফ।

ফেলে দেওয়া কাগজের পোশাক গয়না ছাড়াও ফেলে দেওয়া টায়ার দিয়ে ঘরের আসবাব বসার চেয়ার বানান ওঁরা। ফেলে দেওয়া যেকোনও জিনিস দিয়ে তৈরি করেন অনবদ্য সব শিল্প। তিনটি R ওদের মূলমন্ত্র REDUCE, REUSE আর RECYCLE ব্যাস! তাতেই কেল্লাফতে।

সামনে চান্দ্রেয়ীর কাছে তিনটি অপশন। এক পড়াশুনো! দুই নাচের অসামান্য প্রতিভার উপযুক্ত পরিণতি আর তিন এই স্টার্টআপটি সফল করে তোলা। ও একটু ঘেঁটে আছেন খালি ভাবছেন কোনটাকে আগে রাখবেন আর কোনটাকে পড়ে। ওর ক্রিয়েটিভ টিমের সহযোদ্ধা দেবারতি, সুচেতা, সুপ্রিয়, সৌমিক, অরত্রিকা, সপ্তর্ষি, অনিন্দিতা, অস্মিতা আর যত বন্ধু আছে সবাই চান প্রায়োরিটি লিস্টে এক-এ থাকুক ক্রিয়েটিভ। আপনার কী মত? নীচে কমেন্টের বক্সে লিখে জানান আপনি কী উপদেশ দেবেন চান্দ্রেয়ীকে।