অনার্স পরীক্ষায় বসলেন তিয়াত্তরেও চির হরিৎ শরৎ মুন্ডা

0

এক হাতে অ্যাডমিট কার্ড, আরেক হাতে জলের বোতল, কাঁধে একটা ব্যাগ। রাইপুর বিরসা মুন্ডা মেমোরিয়াল কলেজের সাঁওতালি সাহিত্যের অনার্সের এই ছাত্রটিকে দেখে থ মেরে গিয়েছিলেন অনেকেই। খাতড়ার টিচার্স ট্রেনিং সোসাইটিতে অনার্স শেষ বর্ষের পরীক্ষার সেন্টার পড়েছিল। মাথা ভর্তি পাকা চুলের এই বৃদ্ধকে দেখে কেউ ভাবতেই পারেননি উনিই পরীক্ষার্থী। সুঠাম দেহে অবশ্য বয়সের ছাপ তেমন একটা বোঝা যাচ্ছে না। তবে অ্যাডমিট কার্ডের রেকর্ড বলছে বয়স তাঁর ৭৩!

ইচ্ছে থাকলে কী না হয়। আর তার সঙ্গে যদি চেষ্টাও জুড়ে যায়, তাহলে তো আর কথাই নেই। অসাধ্য সাধন হতে পারে। যার প্রমাণ বারবার মিলেছে। যার প্রমাণ দিয়েছেন শরৎচন্দ্র মান্ডিও। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী এই সাঁওতালি ৭৩ বছর বয়সে বসলেন অনার্স শেষ বর্ষের পরীক্ষায়। সাঁওতালি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষার ইচ্ছে রয়েছে তাঁর।

দুই ছেলে, এক মেয়ে, পুত্রবধূ, নাতি-নাতনি নিয়ে ভরা সংসার শরৎবাবুর। সরকারি কর্মী ছিলেন। ২০০৩ সালে টেলিফোন দফতরের চাকরি থেকে অবসর নেন। ছোট ছেলে বাঁকুড়ায় ভূমি সংস্কার দফতরের কর্মী। বড় ছেলেরও ভালোই রোজগার। দক্ষিণ বাঁকুড়ার ধানাড়া দামদি গ্রামের বাসিন্দা শরৎ মুন্ডার আপাতবাস বাঁকুড়ার সানবাঁধায়। অবসরের পর ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি নিয়ে হেসে খেলেই দিন কাটছিল শরৎবাবুর। হঠাৎ একদিন মনে হল জীবনের বাকী সময়টুকু অন্যভাবেও ব্যবহার করা যায়। কী করবেন ভাবতে ভাবতে ঠিক করলেন পড়াশোনাটাই আবার শুরু করা গেলে মম্দ কী? ‘পাঁচমুড়া কলেজ থেকে এন্ট্রান্স পাশ করার পর কালিয়ারিতে চাকরি করতে যাই। পরে টেলিফোন দফতরে চাকরি পাই। সাংসারিক চাপে ইচ্ছে থাকলেও পড়াশোনাটা আর এগোন যায়নি।মনের মধ্যে সুপ্ত একটা বাসনা রয়েই গিয়েছিল। অবসরের পর ভাবলাম হাতে অফুরন্ত সময়। পড়াশোনাটা আবার শুরু করা যাক’, বলছিলেন শরৎবাবু।

যেই ভাবা সেই কাজ। একদিন হাজির হলেন রাইপুরের বিরসা মুন্ডা মেমোরিয়াল কলেজে। ইচ্ছে, সাঁওতালি সাহিত্য নিয়ে উচ্চশিক্ষা। শুধু তাই নয়, গবেষণার মাধ্যমে সাঁওতালি ভাষাকে আরও উন্নত ও প্রসারিত করাই চিরযুবক শরৎ মুন্ডার লক্ষ্য। নিয়ম মেনে ভর্তির পর শুরু হয় পড়াশোনা। দেখতে দেখতে অনার্স ফাইনাল ইয়ার। ‘পরীক্ষা ভালোই হয়েছে, রেজাল্টও ভালোই হবে’, যথেষ্ঠ আত্মবিশ্বাসী শোনাল সাঁওতালি সত্তোরর্ধ ‘যুবকে’র গলা।

বাবার পড়াশোনা নিয়ে ছেলেমেয়েরাও খুব উৎসাহিত। নাতি নাতনিদের কাছে শরৎবাবু প্রেরণা তো বটেই, নিজের সাঁওতালি সম্প্রদায়ের কাছেও দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে চান তিনি। সাঁওতালি ভাষা নিয়ে গবেষণায় এগিয়ে আসুক আরও অনেকে। বহু পুরনো রত্ন (সাহিত্য) খুঁজে পাওয়া যাবে এখানে। মনে করেন শরৎ মুন্ডা। তাই শুধু অনার্সেই থেমে থাকতে চান না। ভালো ফল হলে সাঁওতালি ভাষা নিয়ে গবেষণার চিন্তা ভাবনাও করছেন শরৎবাবু।