বিনোদ রাওয়াত, মুম্বই-এর রিয়েল লাইফ 'মুন্নাভাই'

0

মানুষের জীবন বড়ই বিচিত্র। কখন যে সে এক মুখ হাসি নিয়ে আপনার দিকে মুখ তুলে চাইবে আর কখন যে চরম ভাগ্যবানের জীবনে নেমে আসবে দুর্যোগের ঘনঘটা তা কেই বা বলতে পারে! আজকের দিনে মানুষ হিসাবে আমাদের সবচেয়ে দুর্বলতার জায়গা হল আমরা আত্মিকভাবে ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছি। ফলে কঠিন চ্যালেঞ্জের ঝোড়ো বাতাসের মুখে আমাদের সঙ্কল্পগুলো অতি সহজেই খড় কুটো হয়ে উড়ে যায়। কিন্তু এই গোলমেলে সময়েও এমন কিছু মানুষ এখনও রয়েছেন যাঁরা নিজেদের সঙ্কল্পে স্থির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে লড়ে যাচ্ছেন। তেমনই একজন মানুষের নাম বিনোদ রাওয়াত, যিনি জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে লড়াই করে, দুর্লঙ্ঘ বাধা পেরিয়ে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর চোখের ভাষায় রয়েছে এমনই এক আত্মবিশ্বাসের জ্যোতি যা আপনার ভিতরের শত আঘাতপ্রাপ্ত পোড় খাওয়া নিরাশাবাদকেও এক লহমায় দূর করে দেবে এবং আপনাকে উপহার দেবে হাসি মুখে কাজ করার পজিটিভ এনার্জি। তাহলে চলুন শোনা যাক এই মানুষটির গল্প।

“আমার যখন ছয় বছর বয়স তখন একটা ট্রাক আমাকে পিষে দিয়েছিল। প্রায় ছ’ মাস হসপিটালে ভর্তি ছিলাম, অনেক রকম জটিল অপারেশান হল। শেষ পর্যন্ত একটা অপারেশানের জন্য পঁচিশ হাজার টাকা মত লাগতো। কিন্তু বাবা মা অনেক চেষ্টা করেও যোগাড় করতে পারলেন না। অপারেশানটা কোনও ভাবে হল বটে, কিন্তু আমার একটা পা চিরকালের জন্য বাদ চলে গেল।

কিন্তু সেদিন আমি বুঝলাম যে শুধু পা নয়, সেই সঙ্গে আমার গোটা জীবনটাই যেন বাদ চলে গেল।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসবার পর লোকে নানা রকম নাম ধরে ডাকতে লাগলো। আর সবচেয়ে দুঃখের কথা আমার পরিবারও আমাকে খরচের খাতায় ফেলে দিল। বাবা যখন আমার দিকে তাকাতেন তখন তাঁর চোখে কষ্টের সঙ্গেই ফুটে উঠতে দেখতাম লজ্জা। রাস্তায় কোনও ভিক্ষাজীবী মানুষকে দেখলে তাঁর চোখ মুখ লজ্জায় লাল হয়ে যেত, হয়ত আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবেই। আমিও তো ওই রকমই একটা অকর্মণ্য। আর এই ধারণার বশেই বাবা আমাকে প্রচণ্ড মারতেন, বেল্ট দিয়ে কুকুরের মত চাবকাতেন। আমার কিছুই করার ছিলোনা। অসহায় ভাবে মার খেয়ে যেতাম আর হাত জোর করে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম যে আমি অকর্মণ্য নই, আমি ভিক্ষাজীবী হবোনা, কিছু না কিছু ঠিক করবই। কিন্তু আমার ওপর থেকে বাবার ভরসা অনেকদিন আগেই চলে গেছিল।

আমার গোটা শৈশবটাই একটা কঠিন লড়াই। সবাই আমাকে ল্যাংড়া বলে ডাকতে শুরু করলো। ওরা আমার ক্র্যাচগুলো কেড়ে নিয়ে মজা লুটত। কিন্তু আসলে ওরা এইভাবে নিজেদের অজান্তে আমার জীবনীশক্তিটাকেও একটু একটু করে কেড়ে নিচ্ছিল। নিজের আত্মীয়-বন্ধুদের থেকে ক্রমাগত এই ব্যবহার পেতে পেতে আমি সত্যিই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই একটু বড় হবার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বাইরের জগতের মানুষদের কাছে শান্তি খুঁজতে লাগলাম।

আমি বুঝেছিলাম যে আমাকে এমন কিছু একটা করতে হবে যাতে এই সমবেদনা আর ঠাট্টার বদলে লোকে আমাকে সম্ভ্রম ও সম্মানের চোখে দেখে।

ফলে অচিরেই আমি স্থানীয় এক দুষ্কৃতি চক্রের সঙ্গে ভিড়ে গেলাম। বম্বেতে যাদের ‘ভাই’ বলে। আমিও ধীরে ধীরে একজন ভাই হয়ে উঠলাম। মনে মনে আমার লড়াই চলছিল এক তীব্র ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স এর সঙ্গে, যাতে আমি নিজের জন্য একটা ঢাল তৈরি করতে পারি, কিন্তু এর ফলে আমি আসলে ক্রমে একটা বিপজ্জনক মানুষে পরিণত হচ্ছিলাম। আমার নিজের এই পরিবর্তনটা মোটেই ভালো লাগছিল না, কিন্তু ১৯৯৪ সালের আগে আমার আর কিছু করার ছিলোনা। ততদিনে পুলিশ আমার পিছনে পড়ে গেছে।

এই সময়টা আমার জীবনের সত্যিকারের অন্ধকার অধ্যায়

আমাকে গা ঢাকা দিয়ে পালাতে হল, আর সেই পুরনো ভয়গুলো আবার ফিরে আসতে লাগলো। ঠিক এমনই সময় একদিন রাস্তায় দেখা হয়ে গেল একজন মানুষের সঙ্গে, আমার মসিহা, আমার নতুন জীবনদাতার সঙ্গে। আমার বয়স তখন সবে ১৬, জীবনটা তখন এমন ছন্নছাড়া হয়ে গেছে যে বলবার নয়। ঠিক এই রকম একটা সময়ে তিনি এসে আমার হাতটা ধরলেন আর আমাকে বললেন, “বাবা, এইসব কাজ তোমার জন্য নয়, প্রভু যীশু তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন”।

আমি একজন হিন্দু সন্তান, কিন্তু এর আগে কেউ কখনও আমাকে এভাবে, এতো গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে বলেনি যে ঈশ্বর আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি ভাবলাম, ঈশ্বর বলে যদি সত্যি কেউ থেকে থাকেন তাহলে তিনি আমাকে এই নরক থেকে উদ্ধার করবেন আর আমাকে সঠিক রাস্তা দেখাবেন। সেই মানুষটি আমাকে তাঁর এনজিও তে জয়েন করতে বললেন। আমিও খুশী মনে রাজি হয়ে গেলাম। তিনি আমাকে ধর্মের বানী শোনালেন। ঈশ্বর বলেছেন, ক্ষমা করতে শেখো, অহঙ্কার ত্যাগ করো, দানের মধ্যে আনন্দ খোঁজো – সে দান কেবল আর্থিক দান নয়। ভালোবাসা দান করতে শেখো, হাসি দান করতে শেখো, আনন্দ দান করতে শেখো। আর এই দর্শনের মধ্যে ক্রমে আমি জীবনের এক নতুন সত্য কে অনুধাবন করতে শিখলাম।

এরপরেই আমি আমার জীবনকে বদলে ফেলবার মনস্থির করলাম, কিন্তু নানা রকম বিচ্ছিন্ন ঘটনা এসে বারবার সব পণ্ড করে দিচ্ছিল। কিন্তু আমি সেইসব ঘটনায় উদ্যম হারিয়ে ভেঙে না পড়ে তার মধ্যে থেকে শক্তি সঞ্চয় করে আমার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চললাম।

একবার তাজের কাছে এক বিদেশী দম্পতীর খুব মিষ্টি একটি বাচ্চাকে দেখলাম। আমি তো তাদের ভাষা জানিনা, তাই নিজের ভাষাতেই তাদের জানাতে গেলাম যে তাদের বাচ্ছাটি খুব মিষ্টি। কিন্তু তারা ভাবল আমি ভিক্ষা চাইতে এসেছি, দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল আমাকে। সেইদিনই আমি ঠিক করলাম যে আমাকে ইংরাজি শিখতে হবে, ওদের ভাষা শিখে ওদের কাঁধে কাঁধ রেখে দাঁড়াতে হবে।

তারপর থেকে আমি কত লোকের দরজায় যে ঘুরেছি তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তখনকার যুগে প্রস্থেটিক কোম্পানিগুলো বিনা পয়সায় তাদের প্রোডাক্ট তো দিতই না, বরং সেগুলোর দামও ছিল সব আকাশ ছোঁয়া।

আমি তখন অর্থোপার্জনের কথা চিন্তা করলাম। একটা গ্রুপ তৈরি করলাম, নাম দিলাম ‘I am Possible’, যেখানে আমি ম্যাজিক শো করতাম। কিন্তু ম্যাজিকের মাধ্যমে আসলে আমি দর্শকদের প্রতি অনুপ্রেরণা ও আশাবাদের মেসেজ দেবার চেষ্টা করতাম। এইভাবে আমি বুঝতে পারলাম যে কেবল অর্থ নয়, সময়, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা দিয়েও আত্মিক আনন্দ লাভ করা যায়। আর এই দানের জন্য আপনাকে অগাধ সম্পদশালী হতে হবে এমন নয়, বরং কিছু না থেকেও যখন আপনি ভালোবাসা বিলতে পারবেন তখন জানবেন যে দুনিয়ায় আপনার থেকে ধনী আর কেউ নেই।

দুঃখ-কষ্টে ভরা এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকা ভাগ্যবান মানুষদেরকে তাদের প্রতি ঈশ্বরের আশীর্বাদের কথা মাঝেমাঝে মনে করিয়ে দিতে হয়।

২৭ বছর বয়সে অবশেষে আমার জীবনের প্রায় সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। ‘জয়পুর ফুটস’ এর পক্ষ থেকে আমাকে বিনা অর্থে একটি প্রস্থেটিক পা দান করা হল। কতদিন আমি শুয়ে শুয়ে হাঁটার স্বপ্ন দেখেছি, দৌড়নোর স্বপ্ন, বাইকে চড়ার স্বপ্ন, পাহাড়ে চড়ার স্বপ্ন, শরীরচর্চা করে আমার চেহারাকে আরও সুন্দর করে তোলার স্বপ্ন। ক্র্যাচের অভিশাপ মুক্ত হয়ে এবার আমার ভাগ্য আমার নিজের আয়ত্তে এসে গেল, আর আমি আচমকাই আমার আজীবন লালিত সেই সব স্বপ্নের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালাম।

এক মুহূর্ত দেরী না করে আমি তৎক্ষণাৎ ট্রেনিং শুরু করে দিলাম। আর সহজেই অ্যাথলেটিকসে পারদর্শী হয়ে উঠলাম। খুব দ্রুত আমি বিভিন্ন খেলাধুলোয় সাবলীল এবং এমনকি রীতিমত দক্ষ হয়ে উঠলাম।

কিন্তু তখনও আমার আরেকটা স্বপ্ন অপূর্ণ ছিল। আমি চিরকাল চেয়েছিলাম কারুর প্রেমে পড়তে। আর সুখের কথা, সেই স্বপ্ন পূরণেও আমার বেশীদিন অপেক্ষা করতে হলনা। এই এনজিও তে এসেই আমি খুঁজে পেলাম আমার স্বপ্নের রাজকন্যাকে। অধিকাংশ পাঠক নিশ্চয়ই ভাবছেন যে আমার স্ত্রীও নির্ঘাত আমার মতোই বিকলাঙ্গ বা অক্ষম, তাইতো? এই মানসিকতাটাকে আমি ঘৃণা করি। আমার অঙ্গ বিকল হলেও ভিতরে ভিতরে কিন্তু আমি আপনাদের মতোই একজন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানুষ। আমার স্ত্রী একজন স্বাভাবিক মানুষ, আর আমিও তাই। অন্তত আমি তো সেটাই মনে করি।

তো যাই হোক, আমরা দুজনে মিলে সুখের সংসার পাতলাম আর কিছুদিনের মধ্যে আমাদের দুটি ফুটফুটে সন্তান লাভ হল। এইসব কিছু আর তার সঙ্গে হাজার একটা কর্মকাণ্ডে আমার অতি-সক্রিয়তা - সব মিলিয়ে জীবনের একটা নতুন মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম।

মুম্বাই ম্যারাথনের কথা আমি প্রথম শুনি ২০০৪ সাল নাগাদ, আর শোনা মাত্র ব্যাপারটা আমাকে আকর্ষণ করে। ওরলির সমুদ্রের ধারে আমি দিন রাত এক করে প্র্যাকটিস শুরু করলাম। প্রতিবেশীরা আমাকে নিয়ে মজা করতে শুরু করলো, “এমন দৌড়োদৌড়ি শুরু করেছিস যেন খবরের কাগজে তোর নাম বেরোচ্ছে”। আর ঠিক তার পরের দিনই আমি আমার মনের সব রকম বাধা পেরতে সক্ষম হলাম।

আমি নিজের মধ্যে একটা সম্ভাবনা দেখতে পেলাম আর সেই মত এমন প্র্যাকটিস শুরু করলাম যাতে শুধুমাত্র পারফর্মের দিনটির জন্য নয়, বরং বাকি অন্য সময়ের প্রাত্যহিক কাজকর্মের ক্ষেত্রেও কোনও সমস্যা না হয়। এইভাবে আমার ফিটনেসকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেলাম যে যেকোনো স্বাভাবিক ফিট মানুষকেও হার মানাবে। এইভাবে নানা ট্রেনিং এর শেষে অবশেষে আমি আমার জীবনের স্বপ্নযাত্রায় অবতীর্ণ হলাম। প্রথমে হিমালয়ের একটি ২০,০০০ ফিট শৃঙ্গে উঠলাম ও তারপর মহারাষ্ট্রের কালসুবাই পর্বতে উঠলাম।

সাইকেলিং আর বাইকিং হয়ে উঠলো আমার জীবনের অক্সিজেন।

আর এখানেই শেষ নয়, যখন আমি শুনলাম যে রোডিস এর টিম শহরে আসছে, আমি ওখানে গিয়ে দিনরাত এক করে হত্যে দিয়ে পড়ে রইলাম। ওদের দরজা প্রায় বন্ধই হয়ে গেছিল, কিন্তু একদিন শো এর হোস্ট আচমকা আমার বাইক স্টান্ট দেখে ফেললেন। ব্যাস, টিকিট পেয়ে গেলাম। নিজেকে আবিষ্কার করলাম রঘু আর রনবিজয়ের মুখোমুখি। আমি ওদেরকে আমার পায়ের ব্যাপারে কিছু বলিনি। আমি চাইনি যে ওরা আমাকে অন্যরকম চোখে দেখুক। কিন্তু ওরা কোনোভাবে ব্যাপারটা জানতে পেরে গেল আর নিজেদের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছিলনা। আমি ফাইনালিস্ট পড়বে পৌঁছলাম, আর জনতার ভোটে বাদ চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত ছিলাম। হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। কিন্তু কয়েকদিন পরেই দেখি বাড়িতে আমার জন্য একটা ক্যারিজমা গাড়ি এসে পৌঁছল, রঘুর তরফ থেকে ব্যক্তিগত উপহার হিসাবে।

বাইক পেয়েই বিশ্রামের চিন্তা আমার মাথা থেকে উড়ে গেল। একটা বাইকার গ্রুপের সঙ্গে ভিড়ে গিয়ে লাদাখ এর পথে রওনা দিয়ে দিলাম। কিন্তু একদিন ক্যাম্পফায়ারের সময় ওরা আমার নকল পা টা দেখতে পেয়ে আমাকে দল থেকে বের করে দিল কেননা ওরা কেউই একজন শারীরিক প্রতিবন্ধীর দায়িত্ব নিতে রাজী নয়। তবে আমি ওদের ধন্যবাদই দিয়েছিলাম, কারণ এতে করে লোকসান যদি কারুর হয়ে থাকে তাহলে সেটা আমার নয়, ওদেরই।

আমি আমার নিজের ক্লাব প্রতিষ্ঠা করলাম। আমাদের দেশে বিনোদদের অভাব নেই, যারা এই ধরণের বিভিন্ন কারণে বারবার বঞ্চনার শিকার হয়ে এসেছে। অথচ প্রকৃত সুযোগ পেলে এরা একজন স্বাভাবিক মানুষের চেয়েও ভালো কাজ করতে সক্ষম। আমি এই ধরণের লোকদের খুঁজে খুঁজে দলে ভিড়ালাম আর একটা অন্যরকম কিছু করবার চেষ্টা করলাম – আরও চ্যালেঞ্জিং, আরও ভালো একটা বাইক চালাতে হবে। আর এইসব সাত পাঁচ ভেবেই কিনে ফেললাম ইন্ডিয়ান হার্লি- রয়্যাল এনফিল্ড। তবে শুধু বাইক চড়ার জন্যই চড়া নয়, একটা কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বাইক চড়াই আমার উদ্দেশ্য ছিল।

আর আমরা সেটা করে দেখিয়েছি। লাদাখে ২০১০ সালে একটা ভয়ঙ্কর মেঘ ভাঙা বৃষ্টি হয়েছিল। হ্যাবিট্যাট ফর হিউম্যানিটি নামে একটা এনজিও ওখানে ত্রাণের কাজ করছিল। পুনর্বাসনের জন্য প্রত্যেক বাড়ি পিছু ২ লক্ষ টাকা দরকার ছিল। তাই আমি ঠিক করলাম সুদূর মুম্বাই থেকে লাদাখ পর্যন্ত বাইকে যাবো ও ফিরে আসবো আর এর ফলে যে টাকা উঠবে তা ত্রাণের কাজে তুলে দেব। আমাদের কিছু দূর অন্তর অন্তর একটা করে নির্দিষ্ট পিট স্টপ ঠিক করা ছিল যেখানে আমি এই সমস্ত সমস্যা নিয়ে বক্তৃতা দিতাম ও বিভিন্ন মানুষকে সচেতন করতাম ও আমাদের প্রচেষ্টায় সংযুক্ত করতাম। এইভাবে আমরা “বেয়ন্ড দা অড” এর ব্যানারে প্রায় ১৮ লাখ টাকা সংগ্রহ করলাম। জম্মু কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী এ জন্য আমাকে একটি বিশেষ পুরষ্কারে সম্মানিত করেন। দিনটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের একটা দিন।

আমি যখন আমার স্ত্রী কে ফোন করে জানালাম যে আমরা পেরেছি, তখন সে বলল, খুব হয়েছে, এবার বাড়ি চলে এসো। দু মাস বাড়ির ভাড়া বাকি আছে, এবার না দিতে পারলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে। দুনিয়ার সমস্যা নিয়ে আমি এমন বিভোর হয়ে ছিলাম যে নিজের প্রিয়জনেরা কত কষ্টে আছে সেই দিকে নজর দিতেই ভুলে গেছিলাম। কিন্তু এটা চলতেই থাকলো, কারণ আমার স্ত্রী এর মনে হয়েছিল যে আমার প্রায়োরিটিতে গোলমাল আছে, আমি কেবল কমিউনিটির কাজ নিয়েই চিন্তা করি। মতবিরোধ ক্রমে কলহের জায়গায় পৌঁছল, আর অবশেষে একদিন ও আমার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

আমি ওকে ভালোবাসি, এখনও একই রকম। আমার সমস্ত হৃদয় দিয়ে এখনও ওকেই চাই, আর আমি জানি যে ওকে আবার আমি ফিরে পাবোই।

আমি তো একটা গোল্লা ছিলাম। এইতো মাত্র কয়েক বছর আগেও আমি ছিলাম একটা হারিয়ে যাওয়া আধুলির মতই অকিঞ্চিৎকর। আর আজ আমি ভালোবাসা পেয়েছি, আনন্দ পেয়েছি, জীবনে সাফল্য আর প্রত্যয় ফিরে পেয়েছি। এখন আমি ৯০০ জন স্যুট বুট পরা আমেরিকানের সামনে দৃপ্তকন্ঠে কথা বলি আর তাদের চোখে চোখ রেখে সরাসরি তাকাতে পারি। 

ইদানীং আমি একটা মার্কেটিং এর কাজে যুক্ত হয়েছি এবং সেই সঙ্গে আমি একজন অ্যাথলিটও। আমার স্ত্রী পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ। যখনই আমার সঙ্গে এমন লোকেদের দেখা হয় যাঁরা নিজেদের জীবন নিয়ে বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট, আমি কেবল তাঁদের এটুকুই বলি যে সকলের জন্যই ঈশ্বরের অনেক বড় ও মহৎ পরিকল্পনা রয়েছে। যে সুখকে আপনি খুঁজে চলেছেন বাইরের জগতে সেই সুখের ঠিকানা কিন্তু লেখা আছে আপনার নিজের হৃদয়ের গভীরেই। সেখানে উঁকি দিয়ে দেখুন, সন্ধান পেয়ে যাবেন।

লেখা-বিঞ্জাল শাহ, অনুবাদ - শঙ্খশুভ্র গাঙ্গুলি